আপডেট: ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০১৮   ||   ||   মোট পঠিত ২০২ বার

ভৈরব খনন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পূরণ

রুকুনউদ্দৌলাহ: বেশ কিছু দিন গ্রাম-গ্রমান্তরে কলামে অনুপস্থিত ছিলাম। আগের কিছু লেখা নাকি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। হিতাকাক্সক্ষী পাঠকরা ফোন করে ওই ধরনের লেখা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন। এ সব নানাবিধ কারণে আমার লেখালেখি বন্ধ ছিল। এ জন্যও প্রতিনিয়ত পাঠকদের কাছ থেকে ফোন পেয়েছি বারবার। তাদের প্রশ্ন, আপনার লেখা পাচ্ছি না কেন? অনেক দিন পর আজ একটি সুখবর নিয়ে পাঠকদের সামনে আসলাম। এ লেখাটিতে কোন ঝুঁকি নেই। সুখবরটি হলো, অবশেষে ভৈরব খননের দৃশ্যমান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ছয় বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক যশোরের ভৈরব নদের খনন কাজ শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে ৩০ জুনের মধ্যে পুরো খনন কাজ শেষ হবার কথা এ জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। প্রথম পর্যায়ে তিন প্যাকেজে ১০ কিলোমিটার খননের কাজে হাত দেয়া হয়েছে। এছাড়া পাঁচ প্যাকেজে ১৭ কিলোমিটার খননের দরপত্র গ্রহণ শেষে তা মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খনন প্রকল্পের মূল অঙ্গসমূহের মধ্যে রয়েছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহিরপুর থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার পুনঃখনন, বসুন্দিয়া থেকে আফ্রাঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার ড্রেজিং ও বুড়ি ভৈরবের সঙ্গে মাথাভাঙা নদের সংযোগ স্থাপনের জন্য ৩৩ কিলোমিটার খনন, দায়তলা খালের ২০ কিলোমিটার পুনঃখনন, চৌগাছা খাল, শাহবাজপুরখাল, কাচারিবাড়ি খাল ও সত্যরাম খাল পুনঃখননসহ যশোর শহর এলাকায় ভৈরব নদের দুই তীরে ১০ কিলোমিটার হেরিং বোন বন্ড রাস্তা নির্মাণ।

২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উদ্বোধন করার সময় ১২টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে ভৈরব নদ খনন ছিল অন্যতম। এরপর ভৈরব নদ সংস্কার কার্যক্রমের তোড়জোড় শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সরকার প্রধানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। এর প্রেক্ষিতে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভৈরব নদ খননে সমীক্ষা করা হয়।

গত ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পনি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্পে ২৭২ কোটি ৮২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। খনন কাজ শেষ হলে দর্শনার মাথাভাঙা নদীর সঙ্গে সংযোগ হবে। ফলে নাব্যতা ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি ভৈরব পাড়ের এলাকার জলাবদ্ধতা দূর হবে। নদটি দিয়ে নৌযান চলাচলের উপযোগী হবে। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি আসবে।

চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় ভৈরবের উৎসমুখ মাথাভাঙ্গা নদে বাঁধ দেয়ায় ভৈরব-কপোতাক্ষে ১৫০ বছর ধরে পদ্মার পানি আসে না। ১৮৬১ সালে বেঙ্গল-আসাম রেলপথ স্থাপন ও ১৯৩৮ সালে দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনি কল প্রতিষ্ঠা করার সময় মাথাভাঙ্গা নদ থেকে ভৈরবকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই উৎসমুখ থেকে খুলনার শিবসা নদীর খুলনা হার্ডবোর্ড মিল ঘাট পর্যন্ত ভৈরব নদের দৈর্ঘ্য ১৩৩ কিলোমিটার। সেই থেকে ১৫০ বছর ধরে ভৈরবসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোন নদ-নদীতে আর পদ্মার পানি আসতে পারে না। কারণ এই এলাকার সব নদ-নদী ভৈরব নদের শাখা। এর মধ্যে প্রধান শাখা হলো কপোতাক্ষ। বাঁধের অশুভ প্রভাবে এই এলাকায় জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, আর্সেনিকের বিষক্রিয়া এবং সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভৈরব নদ সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে যশোর অঞ্চলের মানুষ। নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায় ভৈরবকে বাঁচাতে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট একনেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এক সভায় ভৈরব নদ সংস্কারের জন্য ২৭২ কোটি ৮২ লাখ টাকা অনুমোদন দেয়া হয়।

মাথাভাঙ্গা নদের সঙ্গে যুক্ত করলে ভৈরবসহ কপোতাক্ষ, বেত্রাবতী, মুক্তেশ্বরী, চিত্রা এবং বেগবতী হারানো প্রবাহ ফিরে পাবে। ভৈরব-কপোতাক্ষ স্রোতধারা ফিরে পেলে প্রাকৃতিকভাবেই স্রোতের টানে নদ গভীর হবে। প্রবাহ থাকায় পলি আর নদের বুকে জমতে পাবে না। সঙ্গত কারণেই ওই পলি নিম্নভূমিতে প্রবেশ করে উর্বর ভূমি গঠন করবে। এর সুফল হিসেবে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও আর্সেনিক বিষক্রিয়া দূর হবে। সেই সঙ্গে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে সুন্দরবনও।

ভৈরব খননের ব্যাপরে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন ও জনউদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। দৈনিক সংবাদ বিষয়টি নিয়ে যশোরে গোলটেবিল বৈঠকও করে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ভৈরবের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং দর্শনার মাথাভাঙা নদীর সঙ্গে সংযোগ করে দেয়ার জন্য এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে ভৈরবের ৯৬ কিলোমিটার সাড়ে তিন থেকে চার মিটার গভীর করে খনন করা হবে। এর ফলে নদটি নাব্যতা ফিরে পাবে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণের পাশাপাশি নদটি দিয়ে নৌযানও চলাচল করতে পারবে। একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে। চলতি মাসে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর চলতি বছরের শেষের দিকে ভৈরবের যশোর শহর অংশের খনন কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নওয়াপাড়ার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভৈরব খনন না করায় নওয়াপাড়ায় পণ্যবাহী বার্জ ও কার্গো ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারছে না। শুধুমাত্র জোয়ারের সময় এসব বার্জ ও কার্গো নওয়াপাড়ায় প্রবেশ করে। সরকার এ বন্দর থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন।

আশার কথা হলো প্রবাহহারা ভৈরব নদের বুকে আবার প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক খননের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এর দখলদার উচ্ছেদে কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। সার কথা হলো ভৈরব খনন করতে হলে এর প্রধান বাধা ১১৮ দখলদারের ২৯৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং অপসারণ করতে হবে নদভুক ২১টি অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট। জনসাধারণের হৃদয় উৎসারিত এই কথা দেরিতে হলেও কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং দখলদার উচ্ছেদ ও ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণে নোটিস দেয়া হয়েছে জেনে আরও একটু আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

১৯৬২ সালের ভূমি জরিপে ভৈরব নদের প্রশস্ততা কোনখানেই ৫০০ ফুটের কম ছিল না। কিন্তু ১৯৯২ সালের জরিপে সে প্রশস্ততা ১২০ ফুটের নেমে আসে। বাকি ৩৮০ ফুট ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে।

যশোরবাসীর বাঁচা-মরার সঙ্গে যুক্ত ভৈরব খননের স্বার্থে জেলাবাসীর এ পদক্ষেপ সন্দেহাতীতভাবে প্রশংসনীয়। কোন অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় জনহিতকর এ সিদ্ধান্ত যাতে থেমে না যায় সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন দৃঢ় থাকবে এ আশা জনগণের। গ্রাম্য প্রবাদ কথা ‘গুড় আর গুঁড়ো বাদে পিঠের সব রেডি’ এর মতো সব রেডি হলেও দখলমুক্ত না হলে খননটা হবে কোথায়। আর তাই সব দখলদার তাদের দখল ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে তাদের স্থাপনা। সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, এবং ত্রাণ পুনর্বাসন অধিদফতরকে ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে ভৈরব দখলমুক্ত এবং ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণ ছাড়া কোন বিকল্প নইে। কেউ এই নির্দেশ না মানলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইতোমধ্যে যশোর শহরের অংশে তিনটি প্যাকেজে ১০ কিলোমিটার খননের যে কাজ শুরু হয়েছে তা থেমে যেতে দেয়া যাবে না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইতোমধ্যে যশোর শহরের অংশে তিনটি প্যাকেজে ১০ কিলোমিটার খননের যে কাজ শুরু হয়েছে তা থেমে যেতে দেয়া যাবে না।

ভৈরব খনন সফলভাবে শেষ হবার পরও সমস্যা একটা থেকে যেতে পারে। প্রচুর পরিমাণ যে মাটি উঠছে তা কিন্তু রাখার তেমন কোন জায়গা নেই। অগত্যা নদের দুপাড়ের ঢালু স্থানেই ওই মাটি রাখতে হচ্ছে। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেছেন, খননকৃত মাটি অপসারণ করা না হলে দু-এক বছরের মধ্যে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদের ভেতর পড়ে অতিদ্রুত আবার ভরাট হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে এই মাটি যে কোন শর্তে ইট ভাটাগুলোকে দেয়া যেতে পারে। এ অবস্থায় এই মাটি ইটভাটায় দিয়ে সম্পদে পরিণত করা যেতে পারে।

ভাটাগুলো আইন উপেক্ষা করে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে নিচ্ছে। মটির উপরিভাগ থেকে ১০-১৫ সেন্টিমিটারকে টপ সয়েল বলা হয। এই মাটি থেকে গাছ তার খাদ্য গ্রহণ করে। এর নিচে গাছের খাদ্য উপযোগী খাদ্য থাকে না। অথচ এই টপ সয়েল ফসল উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভাটা মালিকরা ফসল উৎপাদনের কথার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে অবাধে তা কেটে নিচ্ছে। এই টপ সয়েল রক্ষা করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে ভাটা এলাকায় ফসল উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তখন দেখা যাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার আর কোন ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। আইন উপেক্ষা করে যে টপ সয়েল কেটে নিচ্ছে মাটি বিজ্ঞানীদের মতে ওই টপ সয়েল তৈরি হতে হাজার হাজার বছর সময় লাগে। দেশে বর্তমানে যেহারে নদ-নদী খনন করা হচ্ছে তার মাটি যদি ভাটায় যায় তাহলে টপ সয়েল কাটার প্রয়োজন পড়বে না। আর যদি খননের বিকল্প হিসেবে ভাটা মালিককে নদ-নদীর মাটি কেটে নিতে বলা হয় তাহলে খনন কাজে সরকারের ২৫ শতাংশ ব্য সাশ্রয় হবে। প্রশাসনের এ ব্যাপারে উদ্যোগ থাকলেও ভাটা মালিকদের নাকি নদ-নদীর মাটি নিতে অনীহা আছে। আইন ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে টপ সয়েল কাটার ব্যাপারে আইনের প্রয়োগ যথযথভাবে হলে ভাটা মালিকরা বাধ্য হবে নদ-নদীর খননকৃত এই মাটি নিতে।

তথ্যসূত্রঃ sangbad