আপডেট: ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৮   ||   ||   মোট পঠিত ২০৭ বার

যশোরের সব রাস্তা সংষ্কার না করলে গাড়ি বন্ধ

এস এম আরিফ : ২৮ দিনের আল্টিমেটামহোয়াংহো যেমন চীনের দুঃখ, তেমনি যশোরের দুঃখ সড়ক। দেশের অন্যতম এ প্রাচীন জেলা শহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা সংষ্কৃতি, ডিজিটাল কর্মকান্ডে অগ্রগামী হলেও চলাচলের জন্য সড়ক পথ সবার পেছনে। সড়ক যেন মড়কে পরিণত হয়েছে। রাস্তা সংষ্কারে নানা কর্মসূচি, আবেদন দাখিল, চিঠি চালাচালি করা হলেও কোন সুরাহা হয়নি অদ্যাবধি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের আশ্বাস সর্বোপরি খোদ সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে যশোরে।
আর আশু সড়ক সংষ্কারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি। সম্মেলনে জানানো হয়েছে, যদি এক মাস ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যশোরের সড়কগুলি সংষ্কারের কোন উদ্যোগ না নিলে যশোর থেকে দক্ষিণবঙ্গের ১৮ টি রুটে সকল ধরণের মোটরযান চলাচল বন্ধ থাকবে।
গতকাল বেলা সাড়ে এগারটায় যশোর মিনিবাস মালিক সমিতির কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহবায়ক আলী আকবর।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জোনের আওতায় ১২৭টি রুটে জাতীয়, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে দুই হাজার ৭৩৪ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ৩৮৫, বাগেরহাটে ৩৯৭, সাতক্ষীরায় ২৫৩, চুয়াডাঙ্গায় ১৪১, যশোর ৩৫৬, ঝিনাইদহ ৩৯৮, কুষ্টিয়ায় ২৬১, মাগুরায় ২৫১, মেহেরপুরে ১৩৯ এবং নড়াইলে ১৫৩ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এসব সড়কের ৪৫ শতাংশেই খানাখন্দ ও ছোট বড় গর্ত। খাতা কলমে ৪৫ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে এর পরিমান আরো অনেক বেশী।
যশোর-নওয়াপাড়া সড়কের রাজঘাট পর্যন্ত ৩৯ কিঃমিঃ, যশোর- বেনাপোল সড়কে ৩৮ কিঃমিঃ, নাভারণ-সাতক্ষীরা সড়কে ইলিশপুর পর্যন্ত ১৫ কিঃমিঃ, যশোর-নড়াইল সড়কের ভাঙ্গুড়া পর্যন্ত ২২ কিঃমিঃ, যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের মান্দারতলা পর্যন্ত ১৭ কিঃমিঃ, যশোর-মাগুরা সড়কের সীমাখালী ব্রীজের আগ পর্যন্ত ২২.৫ কিঃমিঃ রাস্তা চলাচলে নাকাল যাত্রীরা। নিতান্ত নিরুপায় না হলে কেউ এখন পথে বের হতে চান না।
যশোর-নওয়াপাড়া সড়কের বকচর থেকে মুড়লী মোড়, মুড়লী মোড় থেকে রাজারহাট, রুপদিয়া থেকে বসুন্দিয়া হয়ে প্রেমবাগ, চেঙ্গুটিয়া ও ভাঙ্গাগেট পর্যন্ত রাস্তার মাঝে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যশোর-বেনাপোল সড়কের পুলেরহাট বাজারের পর থেকে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাবের সামনের বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত কিছুটা চলার মতো হলেও বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিকরগাছা ব্রীজের আগে পিচের রাস্তায় ইটের সোলিং হয়ে নাভারণ পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কের অবস্থা ভয়াবহ। এ সড়কে গত্তগাড়ার সাথে ঝিকরগাছা ব্রীজে যানজটে নাকাল হচ্ছেন পথচারীরা। কখনো কখনো এখানে যানজটের মাত্রা এতটাই অসহনীয় হয়ে পড়ে, অপেক্ষমান দীর্ঘ গাড়ির সারিতে ঝিকরগাছা ব্রীজটি সড়কে পরিণত হয়। ভারী যানবাহন একসাথে ব্রীজের উপর অবস্থান করায় যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে ব্রীজটি। যশোর-নড়াইল সড়কে মণিহার থেকে হামিদপুর অংশের পর থেকে বাউলিয়া থেকে দায়তলা, ফতেপুর সন্যাসী বটতলা থেকে তারাগঞ্জ, ছাতিয়ানতলা থেকে রোস্তমপুর, চাড়াভিটা থেকে ধলগ্রাম রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। যদিও কোথাও কোথাও ছিটেফোটা কাজ চলছে। তবে সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা চান পুরো সড়কের সংষ্কার। যশোর-মাগুরা সড়কে রজনীগন্ধ্যা ফিলিং স্টেশনের পর থেকে হাশিপুর বাজার, লেবুতলা বাজার থেকে খাজুরা বাজার হয়ে গাইদঘাট, তেতুলতলা, পুলেরহাট হয়ে সীমাখালী ব্রীজ পর্যন্ত সড়কের বেহাল দশা। প্রতিটি ভাঙ্গা সড়কের সাথে উড়তে থাকা ধুলোবালিতে দিশেহারা পথচারীরা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছোট বড় ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ সব সড়ক দূর্ঘটনায় সর্বমোট ২৩ হাজার ৫শ’৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩’শ৯৭ জন, আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১’শ৯৩ জন। এর মধ্যে হাত পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু হয়েছেন ১ হাজার ৭’শ ২২ জন। দূর্ঘটনায় পতিত হয়েছে ১ হাজার ২’শ ৪৯টি বাস, ১ হাজার ৬’শ ৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ২’শ৭৬টি হিউম্যান হলার, ২’শ ৬২টি কার, জিপ, মাইক্রোবাস, ১ হাজার ৭৪টি অটোরিকশা, ১ হাজার ৪’শ৭৫টি মোটরসাইকেল, ৩’শ২২টি ব্যাটারি চালিত রিকশা, ৮’শ২৪টি নছিমন করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বছরে গড়ে সড়কে ৫ হাজার ৯’শ ২৮টি দূর্ঘটনা ঘটছে, যার মধ্যে গড়ে নিহত হচ্ছে ৮ হাজার ৫’শ ৮৯ জন, আহত ১৭ হাজার ৫’শ২৪ জন। চলাচলের অনুপযোগী সড়ক এসব দূর্ঘটনায় অন্যতম কারণ।
সংবাদ সম্মেলনে যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহবায়ক আলী আকবর বলেন, সারা দেশের রাস্তঘাটের মধ্যে যশোরের অবস্থা শোচনীয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত রেজুলেশনসহ সড়ক ও সেতু মন্ত্রী, যশোর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে প্রদান করবেন। আজ ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যশোরের সড়কগুলি সংষ্কারের কোন উদ্যোগ না নিলে যশোর থেকে দক্ষিণবঙ্গের ১৮ টি রুটে সকল ধরণের মোটরযান চলাচল বন্ধ থাকবে।
যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অসীম কুন্ডু বলেন, চলাচলের উপযোগী সড়ক শুধু মোটরযান সংশ্লিষ্টদের নয়, গোটা যশোরবাসীর দাবি। দেশে নানাবিধ উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু সড়কের ক্ষেত্রে কেন উল্টোপথে হাঁটা তা বোধগম্য নয়। সড়কে দূর্ঘটনা হলে শুধু যাত্রী বা পথচারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হন না, তাদের সাথে যানবাহনসহ মালিক শ্রমিক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিবহণ সংস্থা শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাক মোর্ত্তজা হোসেন জানিয়েছেন, যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি সড়ক সংস্কারে জন্য যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তারা সে কর্মসূচিতে একাত্মতা ঘোষনা করেছেন। সড়ক সংস্কার না হলে জীবন হাতে নিয়ে শ্রমিকরাও পথে নামবে না।
সম্মেলনে যশোর জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রমেন্দ্রনাথ মন্ডল, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন কবীর, কোষাধ্যক্ষ শফিউল আলম, বাংলাদেশ পরিবহণ সংস্থা শ্রমিক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চুসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj