আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৬২ বার

যশোরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে দোকানি নিহত, হামলা বোমাবাজি ভাঙচুর

শামীম রেজা ॥ যশোর শহরের বেজপাড়া রেল রোড টিবি কিনিক মোড়ে গতকাল শনিবার দিনদুপুরে আওয়ামী লীগ আশ্রিত সন্ত্রাসীদের গুলিতে টিপু সুলতান (২২) নামে একজন দোকানি নিহত হয়েছেন। ঘটনার সময় আওয়ামী লীগের এমপি গ্রুপের সন্ত্রাসী শুভ-শিশির গং সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী ট্যাবলেট সোহেলকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই দোকানির বুকে বিদ্ধ হলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এর পরপরই সন্ত্রাসী শুভ-শিশির গং মোটরসাইকেলে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ট্যাবলেট সোহেলকে ধাওয়া করে। খবর পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে ট্যাবলেট সোহেলের ওপর হামলার জের ধরে ষষ্ঠীতলায় দুদল সন্ত্রাসীর মধ্যে বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে সন্ত্রাসী শিশির ঘোষের বাড়িঘর। তার মা চায়না ঘোষকেও ট্যাবলেট সোহেলের অনুসারী সন্ত্রাসীরা মারধর করে। অন্যদিকে এলাকার নিশান ও মানিকের বাড়ি এবং জনৈক হাজীর ভাড়া দেয়া চারতলার একটি মেস ভাঙচুর করেছে শুভ-শিশির গং। এদিকে বেজপাড়া টিবি কিনিক এলাকার আলোচিত সন্ত্রাসী ট্যাবলেট সোহেলকে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ লালন করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার ও সম্প্রতি শুভ-শিশিরকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার জের ধরে শনিবার ট্যাবলেট সোহেলের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছিলো। বর্তমানে ষষ্ঠীতলায় আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী জড়ো করছে এমন অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানায়, বেজপাড়া টিবি কিনিক এলাকার মানিক মুন্সীর ছেলে পুলিশের ওপর হামলা ও অস্ত্র-মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি ট্যাবলেট সোহেল। গতকাল বেলা সোয়া এগারটার দিকে সে বেজপাড়া রেল রোড টিবি কিনিক মোড়ের রাণী ভিলার পাশে (বিপরীতে ষষ্ঠীতলায় সংসদ সদস্য রনজিৎ রায়ের বাড়ি) সবেমাত্র এসে দাঁড়ায়। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে কয়েকজন সন্ত্রাসী সেখানে যায়। একটি মোটরসাইকেলে বেজপাড়া ফুড গোডাউনের পেছন এলাকার রবিউল ইসলাম রবির ছেলে কুখ্যাত সন্ত্রাসী রাব্বি ইসলাম শুভ এবং ষষ্ঠীতলা এলাকার নিত্য ঘোষের ছেলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী শিশির ঘোষ ছিলো। প্রত্যক্ষদর্শী এক মহিলা জানান, ট্যাবলেট সোহেল সবেমাত্র এসে দাঁড়ানোর সাথে সাথে আচমকা তার ওপর হামলা চালনো হয়। তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসী শুভ। কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ট্যাবলেট সোহেল যেখানে দাঁড়িয়েছিলো তার পাশে রাণী ভিলা লাগোয়া সিঙ্গারা-পুরি’র দোকানি টিপু সুলতানের বুকে বিদ্ধ হয়। সাথে সাথে টিপু সুলতান মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অপরদিকে বিপদ বুঝতে পেরে ট্যাবলেট সোহেল টিবি কিনিক এলাকার দিকে দৌড় দেয়। প্রতিপক্ষ শুভ-শিশিরও মোটরসাইকেলে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে তাকে ধাওয়া করে। কিন্তু ট্যাবলেট সোহেলকে বাগে না পেয়ে তারা আবার মোটরসাইকেলে ফিরে এসে ষষ্ঠীতলার দিকে চলে যায়। খবর পেয়ে প্রথমে কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশের ইনস্পেক্টর (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কমিউনিটি পুলিশিং) আলমগীর হোসেন এবং পরে অতিরিক্তি পুলিশ সুপার সালাহউদ্দিন শিকদার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাঈমুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ অফিসার ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশের ইনস্পেক্টর (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কমিউনিটি পুলিশিং) আলমগীর হোসেন ঘটনাস্থল থেকে গুলির একটি খোসা উদ্ধার করেন।
এদিকে সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পরপরই স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ দোকানি টিপু সুলতানকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কল্লোল কুমার সাহা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত টিপু সুলতান বেজপাড়া টিবি কিনিক এলাকার জনৈক সুভাষ কুমারের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। সেখানে তিনি মা ডালিয়া খাতুন এবং স্ত্রী সুমি খাতুন ও সাড়ে ৩ বছরের ছেলে তাজিমকে নিয়ে থাকতেন। তার পিতা মোহাম্মদ আলী তসবির সিনেমা হলের সামনে পিঁয়াজু, পুরি, চপ ইত্যাদি বানিয়ে ব্যবসা করেন। কিন্তু তিনি স্ত্রী থেকে আলাদা থাকেন। ডালিয়া খাতুনের এক ছেলে ও এক মেয়ে। উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তিনি নির্বাক হয়ে পড়েছেন।
অপরদিকে ওই ঘটনার পর দুপুর দেড়টার দিকে ষষ্ঠীতলা বসন্ত কুমার রোড বাইলেন এলাকায় বেশ কয়েকটি বোমা বিষ্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এলাকাবাসী জানান, ট্যাবলেট সোহেলের ওপর আক্রমণের জের ধরে সেখানে দুদল সন্ত্রাসীর মধ্যে বোমাবাজি হয়। ট্যাবলেট সোহেলের অনুসারী সন্ত্রাসীরা প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী শিশির ঘোষের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। তার মা চায়না ঘোষকেও মারধর করা হয়। এছাড়া শুভ-শিশির গং ষষ্ঠীতলার মানিক, নিশান ও জনৈক হাজির ভাড়া দেয়া চারতলার একটি মেস ভাঙচুর চালায়। এ বিষয়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর হাজী আলমগীর কবির সুমন বলেন, সন্ত্রাসী শুভ ও শিশিরসহ আরো অনেকে মানিক ও নিশানের বাড়ি ভাঙচুর করেছে। কী কারণে এই দুজনের বাড়ি শুভ-শিশির গং ভাঙচুর করেছে তা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে নিহত টিপু সুলতানের লাশের ময়না তদন্ত দুপুরে যশোর হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। পরে তার লাশ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। তবে মিছিলে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের লোকজনকে দেখা গেছে। লাশ নিয়ে প্রথমে প্রেস কাব যশোরের সামনে অবস্থান নেয়া হয়। এখানে বিক্ষুব্ধ লোকজন হত্যাকারীদের আটক ও শাস্তির দাবি জানান। এরপর বিকেল তিনটার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন টিপু সুলতানের লাশ নিয়ে কোতয়ালি মডেল থানায় নিয়ে যান। সেখানে লাশ নিয়ে কিছুক্ষণ করা হয়। এ সময় খুনিদের আটকের দাবি জানান জনতা।
এদিকে টিপু সুলতান গুলিতে নিহতের ঘটনায় কোতয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। সন্ধ্যায় শুভ ও শিশিরসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি লিখিত এজাহার দাখিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সময় নিহতের মা ডালিয়া খাতুন ও স্ত্রী সুমি খাতুনসহ স্বজনরা থানায় উপস্থিত ছিলেন।
অপরদিকে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহউদ্দিন শিকদার সাংবাদিকদের জানান, কয়েকজন সন্ত্রাসী প্রতিপক্ষ এক সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলো। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দোকানির বুকে লাগার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশের ইনস্পেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) আলমগীর হোসেন জানান, সন্ত্রাসীদের আটকের জন্য পুলিশের একাধিক টিম সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, যেখানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেখানকার একটি বাড়িতে কোজ সার্কিট ক্যামেরা রয়েছে। দুটি ক্যামেরা রয়েছে বাইরে। এই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখলে অপরাধীদের শনাক্ত করা যেতে পারে। অন্যদিকে টিবি কিনিক এলাকার একটি সূত্র জানায়, ট্যাবলেট সোহেল এবং শুভ-শিশির গং আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপ আশ্রিত সন্ত্রাসী। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। সম্প্রতি শহরের ভোলাট্যাঙ্ক রোডে শুভ-শিশিরের উপর গুলিবর্ষণ করা হলে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এ জন্য ট্যাবলেট সোহেলকে দায়ী করা হয়। এর জের ধরে সন্ত্রাসী শুভ ও শিশির গং প্রতিপক্ষ ট্যাবলেট সোহেলকে গতকাল হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj