আপডেট: ডিসেম্বর ৬, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ২৯ বার

ব্লাস্ট সম্পর্কে অজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তারা

এম.আইউব : ব্লাস্ট সম্পর্কে অজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তারাব্লাস্ট ভাইরাস প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গম চাষ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আর বিআর-২৮ ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষক। গম চাষ নিষিদ্ধের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরাঞ্চলে পাঁচটি জেলা রয়েছে। এতকিছুর পরও ব্লাস্ট সম্পর্কে তেমন কিছুই বলতে পারছেন না কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একেবারেই মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ এলাকায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কিংবা কৃষকের কাছে যান না। ফলে, কৃষক ফসল ধ্বংসকারী এই ভাইরাস সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারছেন না।
বিগত তিন চার বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গম ও ধানে ব্লাস্ট ভাইরাসের আক্রমণ দেখা দেয়। ভাইরাসের কারণে হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। শুকিয়ে গেছে মাঠের পর মাঠ গম ও বিআর-২৮ ধান। এ নিয়ে কৃষক মহাচিন্তায় পড়ে যায়। একইসাথে ব্লাস্ট মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দেয়। এ অবস্থায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারাদেশে ব্লাস্ট আক্রান্ত অঞ্চল চিহ্নিত করে। এরমধ্যে যশোরাঞ্চলের পাঁচটি জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর। ব্লাস্ট যাতে মহামারি আকারে ছড়িয়ে না পড়ে এ কারণে যশোর জোনের আওতাধীন এই পাঁচটি জেলায় গম চাষ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যে জানাগেছে, প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি করে ব্লক রয়েছে। সেই হিসেবে উল্লেখিত পাঁচ জেলায় রয়েছে মোট ৯শ’৭৭টি ব্লক। এরমধ্যে যশোরে ২শ’৮৭, ঝিনাইদহে ২শ’৭, মাগুরায় ১শ’৯, কুষ্টিয়ায় ২শ’৬, চুয়াডাঙ্গায় ১শ’১২ এবং মেহেরপুরে ৫৬ টি আছে।
সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি ব্লকে একজন করে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা থাকার কথা। এ হিসেবে ৯শ’ ৭৭ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন ব্লকগুলোতে। কিন্তু রয়েছে ৮শ’ ৭৩ জন। খালি রয়েছে ১শ’ ৪টি পদ।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, যশোর জোনে আট শতাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা থাকলেও বর্তমান সময়ে আলোচিত ব্লাস্ট ভাইরাস সম্পর্কে তাদের অধিকাংশ তেমন কিছুই জানেন না বলে কৃষকরা বলছেন। তাদের বক্তব্য, ব্লাস্ট সম্পর্কে বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি আজো পর্যন্ত। তবে, অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা কৃষি অফিসে মাসে দু’বার সভা হয়। সেখানে ব্লাস্ট নিয়ে কিছু আলোচনা হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জেলা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেন। আর তারাই প্রশিক্ষণ দেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের। যেটি প্রশিক্ষণ হিসেবে মানতে নারাজ তারা। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ভায়া না করে সরাসরি তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিলে উপকৃত হবে কৃষক। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না।
ব্লাস্ট ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে গত তিন চার বছর আগে। এই ভাইরাসের কারণে কোথাও কোথাও গম ও বিআর-২৮ ধানে মহামারি আকার ধারণ করে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ব্লাস্ট আক্রমণের কারণে পাতায় কালো দাগ পড়ে। গাছ ভেঙে যায়। গম ও ধানের গাছ শুকিয়ে যায়। চিটে হয়ে যায় শীষ। গাছ সোজা হয়ে থাকতে পারে না।
ব্লাস্ট সম্পর্কে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি থেকে রক্ষা পেতে হলে ব্লাস্ট প্রতিরোধক জাত লাগাতে হবে। তা ছাড়া, যেকোনো বীজ লাগানোর আগে প্রতি কেজিতে তিন গ্রাম প্রোভেক্স কিংবা ভিটাভেক্স পাউডার দিয়ে ১৬-১৮ ঘণ্টা ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। এটি করতে পারলে ওই বীজ শোধন হয়ে ব্লাস্ট প্রতিরোধক হতে পারে।
এদিকে কৃষকরা বলছেন, গত বছরও যশোরসহ নিষিদ্ধ জেলাগুলোতে গমের ভালো ফলন হয়েছে। এ কারণে তারা এবার গম চাষ করতে আগ্রহী। কিন্তু বিএডিসি থেকে গমের বীজ বিক্রি করা হচ্ছে না। বাইরেও গমের বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, চাইলেও তারা গম চাষ করতে পারছে না। কেউ তাদের বুঝিয়েও বলছে না ব্লাস্ট কী জিনিস।
একইসাথে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিআর-২৮ ধানেও ব্লাস্ট আক্রমণ হচ্ছে। অনেক এলাকায় এই ধান চাষ কমে গেছে আশংকাজনকহারে। অথচ এটি একটি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। দিন দিন এই জাতের ধান চাষ কমে গেলেও কৃষি বিভাগের কোনো মাথাব্যাথা নেই। কৃষি বিভাগের এই ধরনের নির্লিপ্ততায় হতাশ কৃষক। তারা একেবারেই মাঠে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী হাবিবুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, গত বছর থেকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ব্লাস্ট সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে একবার করে এই প্রশিক্ষণ হয় উপজেলা অফিসে। তারপরও দু’একজন অনভিজ্ঞ থাকতে পারেন।
তিনি আরো বলেন, ব্লাস্ট সাধারণত প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা পড়লে ব্লাস্ট আক্রমণের আশংকা বেশি থাকে। যা গত বছর হয়েছিল। কারণ গত বছর এপ্রিল মাসে এ ধরনের আবহাওয়া ছিল। এসব বিষয় মাথায় রেখে এ বছর মৌসুমের শুরুতেই কৃষককে সচেতন করা হচ্ছে। ব্লাস্টের আক্রমণ হচ্ছে যদি বোঝা যায়, তা হলে কৃষককে ¯েপ্র করার পরামর্শ দেয়া হবে। ¯েপ্র করতে পারলে ব্লাস্ট প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
এ নিয়ে কথা হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক চন্ডিদাস কুন্ডুর সাথে। তিনি বলেন, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের জানা উচিত। তবে, শতভাগ উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা যে জানেন সেটি আমি দাবি করবো না। তারপরও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের বলে দেব যাতে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ব্লাস্ট সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj