আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৮৫ বার

গাড়ির চাকায় প্রাণ গেল লড়াকু ছেলেটির

আজাদ রহমান, ঝিনাইদহ: প্রান্ত সাহাসকালে চা বিক্রি, দুপুরে ক্লাস, বিকেলে গৃহশিক্ষক আর রাতে নিজের পড়া। এভাবে কষ্ট করে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন অদম্য মেধাবী ছাত্র প্রান্ত সাহা (২১)। যশোর বিসিএমসি কলেজের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র প্রান্ত সাহা ছিলেন বাবা প্রকাশ সাহা ও মা পলি রানী সাহার একমাত্র সন্তান।

গত শনিবার রাতে প্রান্ত সাহা ওষুধ কিনতে দুই বন্ধুর সঙ্গে মোটরসাইকেলে শহরে গেলে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের কালীগঞ্জের বৈশাখী পেট্রলপাম্পের কাছে দুর্ঘটনার শিকার হন। মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পড়ে গেলে অজ্ঞাতনামা একটি যান তাঁকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই প্রান্ত মারা যান।

প্রান্ত সাহা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। বাবা প্রকাশ সাহা শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। ঋণ করে কেনা একটি ইজিবাইক চালিয়ে সামান্য কিছু পয়সা উপার্জন করেন, তাও সব দিন পারেন না। এ অবস্থায় একমাত্র ছেলে প্রান্ত সাহা পরিবারের হাল ধরেন। নিজে আয় করে পড়ালেখার খরচ আর ইজিবাইক কেনার জন্য নেওয়া এনজিওর ঋণ পরিশোধ করতেন।

বাবা প্রকাশ সাহা জানান, তাঁর ছেলে পড়ালেখায় খুবই ভালো ছিলেন। কিন্তু তিনি ঠিকমতো পড়ার খরচ দিতে না পারায় প্রান্তকে পড়ালেখার পাশাপাশি সব সময় কাজ করতে হয়েছে। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে চায়ের দোকানে চলে যান। সকাল আটটা পর্যন্ত চা বিক্রি করে বাড়ি ফেরেন। এরপর চলে যেতেন কলেজে। দুপুরে কলেজ থেকে এসে খাবার খেয়ে মানুষের বাড়িতে বাচ্চা পড়াতে যেতেন। তিনটি বাড়িতে বাচ্চাদের পড়ানোর পর সন্ধ্যায় আবারও চায়ের দোকান খুলে বসতেন। রাতে কখনো ৯টা, কখনো ১০টায় বাড়ি ফিরতেন। তারপর খাবার খেয়ে নিজের পড়ায় মন দিতেন, অনেক রাত পর্যন্ত পড়ালেখা করতেন।

প্রকাশ সাহা জানান, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর একটি ওষুধের প্রয়োজন হয়। এ সময় প্রান্ত বন্ধু কাজী রুবেল আর বিকাশ বিশ্বাসের মোটরসাইকেলে ওষুধ কিনতে যান। বাজারের কয়েকটি সড়কে কোনো দোকান খোলা না পেয়ে বৈশাখী পেট্রলপাম্প এলাকা হয়ে আরেকটি সড়কে যাচ্ছিলেন তাঁরা। তাঁদের মোটরসাইকেলটি ওই মোড়ে একটি গর্তে পড়ে গেলে পেছন থেকে ছিটকে পড়েন প্রান্ত। এ সময় যশোর-ঝিনাইদহ সড়কে চলাচলকারী অজ্ঞাতনামা একটি যান তাঁকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান প্রান্ত।

প্রতিবেশী শিপন সাহা জানান, প্রান্ত সাহা ছিলেন নম্র-ভদ্র। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে বড় হচ্ছিলেন। তারপরও পড়ালেখা ছাড়েননি। নিজের পড়ার খরচের পাশাপাশি সপ্তাহে চার হাজার টাকা ঋণের কিস্তি চালাতেন। একমাত্র ছেলে হারিয়ে পাগলপ্রায় তাঁর বাবা-মা। পাশাপাশি তাঁরা জানেন না কীভাবে তাঁদের বাকি দিনগুলো কাটবে, আর কীভাবে ঋণমুক্ত হবেন। তিনি জানান, প্রান্ত সাহার মৃত্যুতে পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষের মাঝে শোক বইছে।

এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, মৃত ছেলেটির পরিবার থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। যে কারণে তাঁরা কোনো ব্যবস্থা নেননি। ফলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই সমাহিত করা হয়েছে। 

তথ্যসূত্রঃ prothom-alo