আপডেট: অক্টোবর ৩০, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১২৫ বার

যশোরে ইজিবাইক খাত থেকে কোটি টাকা চাঁদা আদায়, ভাগ পাচ্ছেন অনেকে

মীর মঈন হোসেন মুসা॥ যশোরে ইজিবাইক খাত থেকে প্রতিবছর এক কোটির বেশি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে চলছে এই চাঁদাবাজি। বছরের পর বছর বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নামে চাঁদা আদায় করা হলেও রহস্যজনক কারণে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে প্রশাসন। বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান সুমন হলেও এর নেপথ্যে থেকে পরিচালনায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী পরিবহন শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত ওয়াহেদুজ্জামান। তিনি আবার সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান সুমনের পিতা। এদিকে বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নামে তোলা চাঁদা থেকে প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তি ও ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা ছাড়াও সন্ত্রাসীদের অনেকে ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কেউ টুÑশব্দ করতে সাহস পাননা। অপরদিকে যাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয় সেইসব ইজিবাইকচালক কার্যত কোন সুবিধা পাননা বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটি থেকে। শ্রমিকদের সুবিধা দেওয়ার নামে করা হয় আইওয়াশ। ফলে এনিয়ে ইজিবাইকচালকদের বহু অভিযোগ রয়েছে সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে।
যশোরে কয়েক বছর আগে ইজিবাইক চলাচল শুরু হয়। মূলত যাত্রী বাহনের জন্য চীন থেকে ব্যাটারিচালিত এই বাইক আমদানি করা হয়। কিন্তু প্রথম থেকেই সারাদেশের মতো যশোরেও ইজিবাইক চলাচল নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট দফতরের বাধার কারণে যশোরে পৌর কর্তৃপক্ষ ইজিবাইক চলাচলের জন্য বৈধতা দিতে পারেননি। তারপরও যশোর শহর ও শহরতলীতে ইজিবাইক চলাচল করতে থাকে এবং এর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। শহরে ইজিবাইক চলাচল করলেও বৈধতা (লাইসেন্স) না থাকায় বিভিন্ন সময় প্রশাসন বাধাও প্রদান করে। কিন্তু তারপরও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের কারণে ইজিবাইকের স্রোত থামাতে পারেনি কেউ। এরই মধ্যে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী মানুষ ও পুলিশের কেউ কেউ লাইসেন্স না থাকায় ইজিবাইক চালকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বখরা আদায়ও শুরু করেন। তবে এই খাত থেকে চাঁদা আদায়ের উপায় বের করে ফেলেন পরিবহন সেক্টরের আলোচিত ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক নেতা ওয়াহেদুজ্জামান। নানাভাবে তৎপরতা চালিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ‘বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নিতে সক্ষম হন। কিন্তু সেই সময় কাগজে কলমে নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক সদস্যের নাম ওই দফতরে জমা দিলেও বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব ছিলো কি-না এ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। তবে শ্রমিক নেতা ওয়াহেদুজ্জামান রেজিস্ট্রেশন লাভের পর শ্রমিকদের কল্যাণের কথা বলে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে দৈনিক চাঁদা আদায়ের ব্যবস্থা করেন। নিজ ছেলে আসাদুজ্জামান সুমনকে করা হয় এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি ওয়াহেদুজ্জামানকে। তিনি নেপথ্যে থেকে ছেলে আসাদুজ্জামান সুমনকে বিশাল ক্ষমতা দিয়ে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে জবরদস্তি করে দৈনিক ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় শুরু করা হয়। শ্রমিকরা চাঁদা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তাদের নানাভাবে শায়েস্তা করা হতো। ফলে এক পর্যায়ে ইজিবাইক চালকেরা দৈনিক ১০ টাকা করে চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হন। যা এখন তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যশোরে শহরে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির দৈনিক ১০ টাকা করে চাঁদা না দিয়ে কেউ ইজিবাইক চালাতে পারেন না। এমনকী এই সংগঠনের লোকজন এখন রীতিমতো ব্যাটারিচালিত ভ্যান থেকেও রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের এক নেতা জানান, দৈনিক প্রায় ৩ হাজার রশিদ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সংগঠনের নির্দিষ্ট লোকের কাছে পাঠানো হয়। যা থেকে প্রতিদিন আয় হয় ৩০ হাজার টাকা। অবশ্য যারা রশিদ বিক্রি করে থাকেন তারা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান। সূত্র জানায়, প্রতিমাসে ইজিবাইক খাত থেকে বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নামে প্রায় ৯ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। বছরে যার পরিমান দাঁড়ায় এক কোটি ৮ লাখ টাকা। চাঁদার এই টাকা থেকে প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তি ছাড়াও রাজনৈতিক অনেক নেতা এবং পুলিশের কোন কোন কর্মকর্তা ভাগ পেয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসীরাও ওই চাঁদার ভাগ পেয়ে থাকে। যে কারণে ইজিবাইক শ্রমিকেরা বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নেতাদের হাতে জিম্মি হয়ে রয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন সময় শ্রমিকেরা জিম্মিদশা থেকে বের হওয়ার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। বরং প্রতিবাদকারীরা পুলিশ কর্তৃক মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি এবং সন্ত্রাসীদের হাতে প্রহৃত হয়েছেন। সূত্রটি আরো জানায়, সংগঠনের নামে ওঠা চাঁদার টাকা ভাগবাটোয়ার দায়িত্ব পালন করেন সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান সুমন। একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না টাকার ভাগ কারা পান। অপর একটি সূত্র জানায়, কোন ইজিবাইক চালক সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে নামকাওয়াস্তে অনুদান দেয়া হয়। দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে সংগঠনে সাহায্যের আবেদন করলে যৎসামান্য তাকে আর্থিক সহায়তা করা হয়। এছাড়া বছরে ঈদের সময় নিজেদের পছন্দের শ্রমিকদের মাঝে চিনি ও সেমাই বিতরণ করা হয়ে থাকে। যা শ্রমিকদের আইওয়াশ বলে ক্ষুব্ধ অনেক চালক অভিযোগ করেছেন। ইজিবাইক চালকের অভিযোগ, দৈনিক তাদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হলেও এর বিনিময়ে মূলত তারা কোন সুবিধা পাননা। এদিকে ১০ টাকার রশিদের বাইরেও ইজিবাইক চালকদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। বিভিন্ন প্রবেশ মুখ থেকে দড়াটানায় ঢুকতে হলে ট্রাফিক পুলিশের নামে চাঁদা দিতে হয়। বহিরাগত কতিপয় যুবক এই চাঁদা আদায় করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে সিরিয়ালের নামেও শ্রমিকদের চাঁদা দিতে হয়।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj