আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৪৪ বার

একাত্তরের কন্যাশিশু সরস্বতী-সুফিয়া ৪৬ বছরেও পাননি মা-বাবার খোঁজ

ইন্দ্রজিৎ রায়    |    বয়স সাতচল্লিশ পেরিয়েছেন সরস্বতী ওরফে সুফিয়া। কিন্তু এখনও তিনি জানেন না তার প্রকৃত বাবা-মায়ের খোঁজ। একাত্তর থেকে তিনি কখনও হিন্দু, কখনও মুসলিম পরিবারের আশ্রয়ে বেড়ে উঠেন। এজন্য তার নাম কখনও সরস্বতী কখনও সুফিয়া। জীবন সংগ্রামে বারবার তার নাম আর ধর্মীয় পরিচয় বদল হয়েছে। নতুন নতুন মা-বাবাও পেয়েছেন। নিজের বাবা-মায়ের সন্ধান পাননি এখনও। মানবতার জয় হয়েছে বরাবরই। জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা ও ভালোবাসা। অবশেষে তার ঠিকানা হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর চলে আসেন।

একাত্তরের মে মাসে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার এলাকায় বাগানে কুড়িয়ে পাওয়া যায় দেড় বছরের এক মেয়েশিশুকে। সেই শিশুই আজকের সরস্বতী ওরফে সুফিয়া। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তার স্বজনদের সন্ধান মেলেনি। যখন যাদের কাছে আশ্রয় পেয়েছেন, তারাই হয়ে উঠেছেন তার আপনজন। সর্বশেষ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) নেতারা তার সন্ধান পেয়েছেন। সরস্বতী ওরফে সুফিয়াকে পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়েছিল সংগঠনটি। সম্প্র্রতি প্রেস ক্লাব যশোরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতারা সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার হাতে উপহার সামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি থাকেননি।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, সরস্বতী ওরফে সুফিয়া ৪৬ বছরেও তার আত্মীয়-স্বজনের পরিচয় পাননি। বড় হওয়ার পর এই শহিদ সন্তানের দায়িত্ব নেয়ার সামর্থ্য দরিদ্র পরিবারটির ছিল না। যার ফলে সরস্বতী গাছতলা, রাস্তায় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ৭১ সর্বহারা এ নারী ৪৬ বছরে বহু নির্যাতন ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য তা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যশোরের রোটারি কেনায়েত আলী ও আনোয়ারা বেগম ওল্ড হোম কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সরস্বতী ওরফে সুফিয়া জানান, বাবা-মায়ের কথা তার মনে নেই। ছোটবেলায় হিন্দু বাড়িতে ছিলাম। তখন নাম ছিল সরস্বতী। পরে মুসলমান বাড়িতে কাজ নিয়েছি। তখন থেকে আমার নাম সুফিয়া। যখন যাদের কাছে থেকেছি তারাই আমার বাবা-মা। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করায় মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়েছিল। তবে যাদের আশ্রয়ে বড় হয়েছেন তাদের ছেড়ে থাকতে ভালো লাগছিল না।

স্থানীয় এলাকাবাসীর মতে, ১৯৭১ সালের ২২ মে ঝিনাইদহ, শৈলকুপা ও কালিগঞ্জ এলাকার হাজার হাজার মানুষ তাদের সহায়-সম্বল ফেলে ভারতে আশ্রয়ের জন্য ঝিনাইদহের বারোবাজার হয়ে চৌগাছার মাশিলা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। শরণার্থী মিছিলে নারী-শিশু ও পুরুষসহ দুই-তিন হাজার মানুষ ছিল। হানাদারবাহিনী এ খবর পেয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে চার-পাঁচটি গাড়ির বহর নিয়ে বারোবাজার অভিমুখে গুলি ছুড়তে ছুড়তে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী শরণার্থীদের অনেক নারী-পুরুষকে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে হাত-মুখ বেঁধে ফেলে। স্থানীয়দের ধারণা সরস্বতীর বাবা-মাকেও পাক হানাদারবাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। অথবা সরস্বতীকে ফেলে তার বাবা-মা ভারতে পালিয়ে যায়। বারোবাজারের চা দোকানদার বানছারাম পাল রেললাইনের পাশ থেকে সরস্বতীকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর বানছারাম পাল শিশুটিকে তার বোন যশোদা রাণীর কাছে তুলে দেন। যশোদা রানী শিশুটির নাম দেন সরস্বতী। নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। যশোদা হয়ে ওঠেন সরস্বতীর মা। পাঁচ বছর পর সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। এরপর দুই পরিবারে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী ইদু জোয়ার্দারের স্ত্রী আছিয়া বেগম সরস্বতীর দায়িত্ব নেন। এরপর তার নাম রাখা হয় সুফিয়া। সেই থেকে আছিয়া হয়ে ওঠেন ওর মা। সেখানেও প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন তিনি। এরপর বারোবাজারের ব্যবসায়ী রফিউদ্দিন মুন্সীর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন কিশোরী সুফিয়া। সেখানেও প্রায় দশ বছর ছিলেন। একপর্যায়ে সুফিয়া তার বাবা-মায়ের সন্ধানে রাজপথে নামেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন স্বজনদের সন্ধানে। কিন্তু সন্ধান মেলেনি। বারোবাজার এলাকার বেলার্ডবাড়ি মিঠাপুকুর ফুলছুড়ি, হালিমবাগ ও পিরোজপুর গ্রামে তার বসবাস। যখন যেখানে থাকেন, সেটাই তার গ্রাম। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছর পার হলেও সুফিয়ার সন্ধানে এখানে কেউ আসেনি। এলাকার সবার কাছে প্রিয় সুফিয়া। এলাকার বৃদ্ধ লোকদের আব্বা ও বাবা বলে ডাকেন তিনি। হিন্দু বাড়ি থাকলে হিন্দু আর মুসলিম পরিবারে থাকলে ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলেন। স্থানীয় পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীরের নজরে আসেন সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার সংগ্রামের গল্প। তিনি সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেন। এরপর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদকে নির্দেশ দেন।

হারুন অর রশিদ বলেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীরের নির্দেশে সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুনর্বাসনের জন্য বারোবাজারে গিয়ে তার মতামত নেয়া হয়। সুফিয়া প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। তার মতামতের ভিত্তিতে বৃদ্ধাশ্রমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তথ্যসূত্রঃ Jugantor