আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৬৬ বার

বেনাপোল সীমান্তের দশ গজ পার হতে লাগে দশ ঘণ্টা

ফখরে আলম, যশোর  : বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের দশ গজ পথ পার হতে যাত্রীদের দশ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে বন্দর দুটিতে বেশ কিছুদিন ধরেই সৃষ্টি হয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়। পাসপোর্টধারী হাজার হাজার যাত্রীকে প্রখর রোদে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। মাত্র কয়েক গজ পথ অতিক্রম করার জন্য ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শুধু পানি পান করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের কেউ কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে অসুস্থ রোগী, নারী ও শিশুরা। তাদের রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ফলে প্রায় প্রতিদিনই ক্ষুব্ধ যাত্রীদের সঙ্গে বিএসএফের বচসা, হাতাহাতি হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার নাগরিককে পরস্পরের দেশে আসা-যাওয়ার জন্য ভিসা প্রদান করলেও নির্বিঘ্নে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে পালা-পার্বণে পাসপোর্টধারী যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকছে না।

সরেজমিনে বেনাপোল সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের এপারে ভারতে প্রবেশের জন্য হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে পেট্রাপোলে সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে যশোর রোডে তপ্ত রোদে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে রাতে সীমান্ত পার হতে পারছে। দুই দেশের মধ্যে ইমিগ্রেশনের লোকবল সংকট, যাতায়াতে দুই দফা ছবি তোলা আর পাসপোর্টধারী যাত্রীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের ইমামুল ইসলাম অসুস্থ বাবা আব্দুল মজিদকে নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতে গিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় সীমান্ত পার হতে তাঁর চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি সকাল ১১টায় পেট্রাপোল আসেন। যশোর রোডে লাইনে দাঁড়ান। ইমামুল বললেন, ‘আমার লাইনে জায়গা হয় দুই কিলোমিটার পেছনে। শুধু পানি খেয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। বিকেলের দিকে পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন এলাকার একটি টিনের গুদামে আমাদের বিএসএফ দাঁড় করায়। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় আমি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে পারি। সব মিলিয়ে সীমান্ত পার হতে আমার ১০ ঘণ্টা সময় লেগেছে। ’ খুলনার চুকনগর এলাকার অজয় সরকার ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনিও ৮ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছেন। অজয় সরকার বললেন, “সীমান্ত পার হতে আমার ১১ ঘণ্টা লেগেছে। রোদে শসা আর পানি খেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। ভিসা পদ্ধতি সহজ করা হলেও সীমান্ত পার হওয়ার পদ্ধতি এখনো ‘দুর্গমই’ রয়ে গেল। ”  কুমিল্লার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী সালাউদ্দিন আহমেদ চিকিৎসার জন্য গত ৪ সেপ্টেম্বর ভারতে গিয়েছিলেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি ফিরে এসেছেন। সালাউদ্দিন বললেন, ‘ভারতে যাওয়ার সময় আমি সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। রাত ৯টায় আমি সীমান্ত পার হই। কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে যাওয়ার কথা থাকলেও ওই রাতে অসুস্থ হয়ে আমি বনগাঁর একটি হোটেলে থাকি। এ জন্য আমাকে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক ধকল সহ্য করতে হয়েছে। কান ধরছি, আর ভারতে যাব না। ’ 

বেনাপোলের শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপক গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে ১০ থেকে ১২ হাজার পাসপোর্টধারী যাত্রী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করছে। এ জন্য সীমান্ত পারাপারে বিলম্ব হচ্ছে। ভারতের ইমিগ্রেশনে লোকবল সংকট রয়েছে। সেখানে যাওয়া ও আসার পথে প্রতিটি যাত্রীর ছবি তোলা হয়। তাতে অনেক সময় চলে যায়। ফলে যাত্রীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ছে। ’

এ ব্যাপারে বেনাপোল চেকপোস্টের দায়িত্বরত রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য ১০ শতাংশ লাগেজ চেক করি। বাকি লাগেজ স্ক্যান করে ছেড়ে দিই। কিন্তু হাজার হাজার যাত্রীর এই চাপ ম্যানুয়ালি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর ১২ হাজার যাত্রী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেছে। যে কারণে রাতেও সীমান্ত খোলা রাখতে হয়েছে। এতসংখ্যক যাত্রীর চাপের জন্য নতুন ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। আমরা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ওপারে বিএসএফ বৃষ্টির মধ্যেও যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করছে। এ নিয়ে অবাঞ্ছিত ঘটনাও ঘটছে। ’ এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ওসি ওমর শরীফ বলেন, ‘যাত্রীদের সুবিধার জন্য আমরা আটটি থেকে আমাদের ডেস্কের সংখ্যা বাড়িয়ে ২২টি করেছি। আমাদের এপারে দেরি হচ্ছে না। আমরা রাতেও যাত্রীদের সেবা দিচ্ছি। কিন্তু ওপারে ডেস্কের সংখ্যা কম হওয়ায় সীমান্ত পার হতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। ’

তথ্যসূত্রঃ Kaler-Kontho