আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৯৭ বার

ভৈরব খননে বাধা ঠিকাদারদের উচ্চদর

দেওয়ান মোর্শেদ আলম : ভৈরব খননে বাধা ঠিকাদারদের উচ্চদরপ্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্প “জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদের যশোরের ৯৬ কিলোমিটার পুনঃখননে ২৭২ কেটি টাকা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত থাকলেও ঠিকাদারদের উচ্চ দরের কারণে অগ্রগতি হোঁচট খাচ্ছে। ১০টি মৌসুমে ভাগ করে প্রতি ৩ কিলোমিটারে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও প্রথম টেন্ডারের কাজই থমকে দিয়েছে ঠিকাদাররা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যশোরের বাবলাতলা ব্রিজ থেকে ভাটির দিকে শহরের অংশ ৬ কিলোমিটারের জন্য দুটি টেন্ডার আহবান করা হলে ১২ কোটির জায়গায় ঠিকাদাররা দরপত্রে কাজের দাম হাকিয়েছেন ১০ কোটি করে ২০ কোটি। প্রায় দ্বিগুন দর হাঁকানোই কোন দরপত্রই গৃহিত হয়নি। শেষমেশ পুন টেন্ডারের প্রস্তুতি নিয়ে পাউবো যশোরের কর্মকর্তারা এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। পুনটেন্ডারে সরকারি বরাদ্দের কাছাকাছি দর পেলেই দ্রুতই শুরু হবে খনন কাজ। আর ভৈরব পাড়ের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে সরকারি উদ্যোগ এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে নদের অংশের ৩৬ মৌজার বেদখলীয় সম্পত্তি সরকারের অনকূলে আনতে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ভৈরব খনন প্রশ্নে এখন নাখোশ ভৈরব পাড়ের অবৈধ দখলদার চক্রটি। তারা এখন দৌড়ঝাঁপে মরিয়া।
ভৈরব নদের গভীরতা কমে যাওয়া, নাব্যতা না থাকা, দু’পাশের অবৈধ দখলদারদের কারণে নদী খালে পরিণত হওয়ায় দীর্ঘদিন ¯্রােতধারা বিঘিœত হয়ে আসছে। এ কারণে যশোরাঞ্চলের শহর পাড়া-মহল্লা ও লোকালয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আসছে। এ নিয়ে এ অঞ্চলের গণমানুষের দাবি ছিল ভৈরব পুনখনন। বিষয়টি একনেকেও আলোচিত হয়। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভৈরব নদের দৈনদশা উপলদ্ধি করে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন করেন। “জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন” প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ পুনখননে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্যোগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব নদী পুনঃখননের লক্ষ্যে ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে নদী খননের কাজ শুরুর টার্গেট হাতে নেয়া হয়। খনন কাজ ১ জুলাই ২০১৭ থেকে শুরু করে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে শেষ করার টার্গেট গৃহিত হয়। এ লক্ষ্যে সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পানি উন্ন্য়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে (পাউবো) টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু করে। যশোরের চৌগাছার তাহেরপুর থেকে অভয়নগরের আফ্রাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার ভৈরব নদ খনন ও ড্রেজিং করার প্রকল্প স্থির হয়। এর মধ্যে বসুন্দিয়া থেকে আফ্রাঘাট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার নদের ড্রেজিংও রয়েছে। প্রকল্পটি গত বছরের ১৬ আগস্ট একনেকের সভায় অনুমোদনও দেয়া হয়। যার প্রশানসিক অনুমোদন দেয়া হয় ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর।
সূত্র আরো জানায়, টেকসই ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে, ভৈরব নদের রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দুরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এ প্রকল্পটি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তাহেরপুর থেকে আফ্রাঘাট পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার ভৈরব নদ পুনখনন বাবদ ১৯৫৮১.০৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া আফ্রাঘাট থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করা বাবদ ১৩৯২.৩৬ লাখ টাকা, চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা জীবননগর বুড়ি ভৈরব নদের সাথে মাথাভাঙ্গা নদীর সংযোগ স্থাপনের জন্য ৩৩ কিলোমিটার নদী খনন বাবদ ২৮৭৯.৯৬ লাখ টাকা, ২০ কিলোমিটার দাইতলা খাল পুনখনন বাবদ ২৩২৫.৫৮ লাখ টাকা, ৪টি সংযোগ খাল পুনখনন বাবদ ১৭৬.৯৬ লাখ টাকা ও যশোর শহর এলাকার ভৈরব নদের দুইতীরে ১০ কিলোমিটার হেরিংবন্ড রাস্তা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৭২.১৯ লাখ টাকা। চলতি অর্থ বছরের শুরুতেই যশোর শহর অংশের বাবলাতলা ব্রিজ থেকে ভাটির দিকে ৬ কিঃমিঃ খননের জন্য দুটি টেন্ডার আহবান করা হয়। ৩ কিঃমিঃ খননের জন্য সরকারি খরচের টার্গেট ৬ কোটি টাকা। আর ৬ কিঃমির জন্য ১২ কোটি টাকা। টেন্ডারে ৪ টি বড় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিলেও তারা দর দেয় প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৩ কিলোর জন্য তারা দর হাঁকিয়েছে ১০ কোটি টাকা করে। এতে করে ওই দরপত্র পাউবো গ্রহণ করতে পারেনি। ওই দরপত্র গ্রহণ করলে প্রকল্পে খরচ বাড়বে আরও দুশো কোটি টাকার বেশি। তাই মূল বরাদ্দে কাজ নামাতে পুনটেন্ডার আহবান করবে পাউবো। এ লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা এখন ঢাকায় রয়েছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চলছে আলোচনা।
তথ্যমতে, যশোরের তাহেরপুর পুরাতন ভৈরব নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভৈরব নদটি যশোর-খুলনা জেলা দিয়ে প্রবাহিত। শেষ পর্যন্ত পুরাতন ওই নদীটি খুলনার রূপসা নদীতে পতিত হয়েছে। বেশ আগে এ নদটি এ অঞ্চলের মানুষের কৃষি, মৎস্যচাষ, যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হত।
অপরদিকে, চুয়ডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলা হতে যশোর জেলার চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ কিলোমিটার মাথাভাঙ্গা নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে ভৈরব নদের উৎসে প্রবাহ বন্ধ হয়। এতে ওই নদীতে জোয়ার বাহিত পলি জমে এর নাব্যতাও হারিয়ে যায়। নদটি ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তার প্রশস্ততাও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নদটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য তার নির্দেশে নদের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী পুনঃখনন কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়া হয়। কাজ তরান্বিত করতে আরও কিছু কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে নদের দু’পাড়ের ভূমি দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভৈরব নদ দখল করে যারা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে তুলেছে এবং প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গিয়ে ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছে তাদের অপতৎপরতাও রুখে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভৈরব পাড় ঘেঁষা গরীব শাহ রোডের কয়েকটি বইয়ের দোকান, কয়েকটি হাসপাতাল ও খাবার হোটেল এ তালিকায় রয়েছে বলেও তথ্য মিলেছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোশ্বামী গ্রামের কাগজকে জানান, “ভৈরব নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন” প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদের ৬ কিলোমিটার কাজের টেন্ডার আহবান করা হয়েছিল। কিন্তু দরপত্র সরকারের প্রতিকুলে গেলে পুনটেন্ডারের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। নতুন এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিনিসহ কয়েকজন এখন ঢাকাতে রয়েছেন। দ্রুতই কাজ শুরু হবে নতুন টেন্ডারে। আগামী ৫ বছরে কাজ শেষ করার টার্গেট রয়েছে। ১০ মৌসুমে ৩ কিলো করে গ্রুপ করে টেন্ডার ডাকা হচ্ছে। দরপত্র মোটামুটি গ্রহনযোগ্য হলেই কাজ শুরু হবে। তিনি আশা করেন, সফলভাবে ৯৬ কিঃমিঃ পুনখনন সম্পন্ন হবে। এব্যাপারে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj