আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১২০ বার

অভিশপ্ত ভবদহ, টিআরএম-ই একমাত্র ভরসা

তাজাম্মূল হুসাইন, মণিরামপুরর (যশোর) : অভিশপ্ত ভবদহ, টিআরএম-ই একমাত্র ভরসা যশোরের দুঃখ ভবদহ। এই দুঃখ ঘুচবে কবে কেউ তা বলতে পারেন না। জেলার অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা নিয়ে ভবদহ এলাকা। নির্বাচনের পূর্বে জনপ্রতিনিধিরা তাদের দুঃখ ঘোচানোর স্বপ্ন দেখালেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না। এখানকার দুঃখ নিয়ে সব সময় ব্যবসা হয়েছে। নদীগুলো পলি দ্বারা ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। পলি জমে নদীর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটিতে নামছেনা নদী সংযুক্ত বিলের পানি। ফলে বিলে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। শংকিত হয়ে পড়েছেন ভবদহ অঞ্চলের মানুষ। চলতি বোরো আবাদ নিয়ে দেখা দিচ্ছে সংশয়। একদিকে বিল খুকশিয়ার টিআরএম বন্ধ, অন্যদিকে বিল কপালিয়ার টিআর এম বাস্তবায়নে নানা জটিলতা ও সহিংস ঘটনার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দুঃখ হিসেবে খ্যাত ভবদহ জলাবদ্ধতা এলাকার দুঃখই রয়ে গেল। এবারও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে অন্তত: দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
মুক্তেশ্বরী, শ্রী, হরি এই তিন নদীর মিলনস্থলের অদূরেই ভবদহ অর্থাৎ যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে ভবদহ এলাকা বিস্তৃত। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে (১৯৬০-১৯৬৪) কোস্টাল ইমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট-সিইপি এর আওতায় ভবদহে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ওয়াটার এন্ড পাওয়ার ডেভলপমেন্ট অথরিটি (ইপি-ওয়াপদা) ভবদহের কুলিশাকূল এলাকায় ২২ ভেন্টের স্লুইস গেট নির্মাণ করেন, যা “ভবদহ স্লুইস গেট” নামে পরিচিত। ভবদহের উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণের দুই দশক পর্যন্ত তীরবর্তী এলাকায় ভালো ফসল ফলে। বিধিবাম, আশির দশকের (১৯৮৪) দিকে এই অঞ্চলের নদ-নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া পলি নদী-খাল নালা বেয়ে কৃষি জমিতে যেতে না পেরে নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে। একপর্যায়ে বাঁধের বাইরের নদীর অংশ জমির চেয়ে উঁচু হয়ে যায়। কৃষি জমি পরিণত হয় জলাধারে। দেখা দেয় দীর্ঘ মেয়াদী জলাবদ্ধতা।
১৯৯০ সালের দিকে স্থানীয় স্কুল কলেজের ছাত্র ও জনতা স্বেচ্ছাশ্রমে নদী-খাল-বিলের জমাকৃত পলি ঘুলাইয়ে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে জোয়ারভাটা চালু করে। ১৯৯৩-৯৪ অর্থ বছরে বিল ডাকাতিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পুনর্বাসন প্রকল্প হিসেবে কেজিডিআরপি (খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহ্যবিলিটেশন প্রজেক্ট) বাস্তবায়ন করা হয়, যা ১৯৯৭ সালে সমাপ্ত হয়। কিন্তু এ প্রকল্পের ফলে বিল ডাকাতিয়া এলাকায় জলাবদ্ধতা কিছুটা নিরসন হলেও ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা বা বন্যা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় অর্থাৎ ওই সময়ই জলাবদ্ধতার সমস্যা তীব্র ও জটিল আকার ধারণ করে। ১৯৯৭ সালে ভবদহ অঞ্চলে তথা হরি, মুক্তেশ্বরী অববাহিকায় জলাবদ্ধতার ভয়ংকর রূপ নেয়। এলাকায় জনপদ ও জনবসতি গ্রাস করে ফেলে। বাঁচার তাগিদে ভুক্তভোগী মানুষ “পানি কমিটি” গঠন করে। আর এই কমিটির নেতৃত্ব ভায়না বিলে বাঁধ কেটে জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থা চালু করে।
পুনর্বাসন প্রকল্পের কেজিডিআরপি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় ২০০০, ২০০২ ও ২০০৪ সালের বন্যা। বন্যার পানি নির্দিষ্ট সময়ে সরে যাওয়ার কথা কিন্তু নিষ্কাশন ব্যবস্থা ত্রুটির কারণে পানি আটকে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ২০০৬ সালের জলাবদ্ধতা অনেক বেশি যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের কারণ হয়। ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১১ সালের জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে যশোর জেলার মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলার একাংশ, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা এবং সাতক্ষীরা জেলার তালা, কলারোয়া ও সদর উপজেলার বিস্তৃীর্ণ জনপদ।
প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুম আসলে ভবদহ তৎসংলগ্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে দীর্ঘদিন যাবত পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে ওই এলাকার লাখ লাখ মানুষ। এবারও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে অন্তত: দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় বিল ডাকাতিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৩-১৯৯৪ অর্থ বছরে কেজিডিআরপি কার্যক্রম শুরু হয়। যা ১৯৯৭তে শেষ হয়। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় তা বন্যা বা জলাবদ্ধতা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। যশোর-খুলনা এলাকার ১ লাখ ৬ হাজার হেক্টর এলাকাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় এ প্রকল্পের অধীন। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ২২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এটি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ প্রকল্প। ১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছরে সরকার কেয়াবুনিয়া, ঘ্যাংরাইল, শিপসা ও কাশিমপুর এলাকায় রেগুলেটর নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে জনগণের বাঁধার মুখে তা ভেস্তে যায়। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ভবদহ জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন এবং যশোর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপকূলীয় অঞ্চলের সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা করেন। সভায় বেশিরভাগ প্রতিনিধি জোয়ারাধার (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেন। (জোয়ারাধার পরিকল্পনাটি হচ্ছে পলিবাহিত জোয়ারের পানি উঠিয়ে বিলের তলদেশ উচুঁ করা। এতে নদী ফিরে পাবে তার নাব্যতা। দূর হবে জলাবদ্ধতা। সোনার ফসল ফলবে বিলে। মূলতঃ টিআরএম হলো নদীকে নাব্য রেখে সংলগ্ন বিল গুলোতে পর্যায়ক্রমে জোয়ারভাটার মাধ্যমে পলি অবক্ষেপিত করা।) সেই সুপারিশের আলোকেই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০০২ সালে বিল কেদারিয়ায় ৬০০ হেক্টর এলাকায় টিআরএম চালু করে। ৪ বছর পর ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ২০০৫ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল বিল খুকশিয়ার টিআরএম চালু হয় এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ৬ বছর পর ২০১২ সালে তা বন্ধ হয়। বিল খুকশিয়ার পর ২০১২ সালের জুন মাসের ২ তারিখে বিল কপালিয়ায় টিআরএম উদ্বোধন করতে গেলে বিল কপালিয়াবাসীর সাথে পাউবোর কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের মাঝে সহিংস ঘটনা ঘটে। এরপর প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়। প্রকল্পটি পুনরায় গ্রহণের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল বিল কপালিয়া এলাকা পরিদর্শন ও সমীক্ষা করেছেন।
স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতা রুহুল আমিন বলেন, জোয়ার-আধার (টিআরএম) এর মাধ্যমে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিলকপালিয়াবাসীর সাথে সমঝোতা ও সম্প্রীতিই একমাত্র পথ।
বিল কপালিয়া রক্ষা কমিটির আহবায়ক আব্দুল কাদের সরদার বলেন, বিল কপালিয়া আমাদের জীবন, বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। যে বিলে সোনার ফসল ফলে, জীবন থাকতে সেই বিল কি কেউ দেয়?
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম প্রকল্পের কোন বিকল্প নেই। বিল কপালিয়াবাসীদের সাথে সংঘর্ষ নয় বরং সমঝোতা করে, সহজ শর্তে ক্ষতিপূরণ দিয়ে শান্তি ও সম্প্রীতির মাধ্যমে সকলকে সাথে নিয়ে ওই অঞ্চলের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে টিআরএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চাই।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj