আপডেট: জুলাই ৩০, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১০০ বার

ডুবে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

প্রণব দাস : ডুবে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলক্রমশঃ বিস্তৃত হয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভবদহের জলাবদ্ধতা। তাই যশোরের দুঃখ ভবদহ এখন সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুঃখ হতে চলেছে। পানি নির্গমনের প্রায় সকল পথ বন্ধ হওয়ায় ক্রমেই এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। গোটা অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত বছরের মত এবারও ভবদহ অঞ্চল তথা কেশবপুর মণিরামপুর ও অভয়নগরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশংকায় রয়েছেন স্থানীয়রা। প্রতিবছর জলাবদ্ধতায় এ অঞ্চলের লাখো মানুষের দুর্ভোগ বয়ে আনলেও নেই কার্যকর কোন পদক্ষেপ। জোড়াতালি প্রকল্পে কোটি কোটি ব্যয় হলেও সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে প্রতিবছর ভবদহের মানুষের দুঃখ ফিরে আসছে। আর এতে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এমন ধারা অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছোলজার রহমান জানান, যশোরাঞ্চল ক্রমাগত জলাবদ্ধতার দিকে ধাবিত হচ্ছে; এর অন্যতম কারণ উত্তর দিকে পলি সমৃদ্ধ প্রবাহমান কোন নদী বা জলাধার নেই আবার অন্য দিকে সামুদ্রিক জোয়ার বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে সিংহভাগ পলি একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ফেলে আসে। ফলে সাতক্ষীরার দক্ষিনাংশ যতটা পলি পায় উত্তর দিকে আসতে আসতে সেটা খুবই কমে যায়। এ যৎসামান্য পলি দিয়ে নিম্নাঞ্চল উচু করা দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। অন্য দিকে পদ্মার ডান তীর থেকে মাঝে মাঝে সামান্য উপচানো পলি এসে তা মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ এলাকায় নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে যশোর অঞ্চল পলি বঞ্চিত থাকায় ক্রমাগত জলাবদ্ধতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অব্যাহতভাবে টিআরএম প্রকল্প চালু রাখা না হলে এ জলাবদ্ধতা তরান্বিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তাই ভবদহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে অবিলম্বে পরিকল্পিত জোয়ারাধারের (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট- টিআরএম) সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে এ জনপদকে রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন তারা।
একইসাথে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে অবিলম্বে পরিকল্পিত জোয়ারাধারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে জনপদকে রক্ষায় ৫ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্তমানে ভবদহ এলাকায় মানবিক বিপর্যয় রোধে খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়নে গৃহীত সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়ন করণ, আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, ভবদহ স্লুইসগেটের ২১ ও ৯ ভেন্টের মাঝ দিয়ে সরাসরি নদী সংযোগ করণ, হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রায় জরুরী ভিত্তিতে পলি অপসারণ, সকল খাল পুনরুদ্ধার ও অবমুক্ত করণ এবং অপরিকল্পিত ঘের নয়, পানি প্রবাহে সকল বাঁধা উচ্ছেদ ও ঘের সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান।
এদিকে, যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ কিলোমিটার নদ খনন প্রকল্প চলমান রয়েছে। আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ প্রকল্প শেষ হবে। নদীগুলোর অবস্থা এখন অনেক ভাল। গত বছরের মত অবস্থায় নেই। ভারি বর্ষণ ও অমাবশ্যার প্রভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আশা করছি এবার স্থায়ী জলাবদ্ধতা হবে না। সাতদিনের মধ্যে পানি সহনীয় হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পর্যালোচনা (স্ট্যাডি) শেষ হয়েছে। এক মাসের মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। স্ট্যাডিতে বিল কপালিয়াসহ ৬টি টিআরএম বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও নদী ও খাল খননের সুপারিশ আছে। একনেকে প্রকল্পটি পাস হলে ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তবে আশাবাদী হতে পারছেন না ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ। তারা সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২১ জুলাই ভবদহের ভাটিতে সরেজমিনে নদী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভরা জোয়ারের সময় কপালিয়া ব্রিজের পাশে পানির গভীরতা ৭ হাত, তার ভাটিতে ভায়নার বিল খুকশিয়া টিআরএমের সংযোগ খালের মুখে মাত্র ৮হাত, তার ভাটিতে শোলমারি ব্রিজের নিচে ১০ হাত, গ্যাংরাইল ব্রিজের নিচে ৮ হাত, বারো আড়িয়ায় নদীর মোহনায় মাত্র ২০ হাত। বারো আড়িয়ায় স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, গত বছর ওই মোহনায় ১শ’ হাত গভীর ছিল। যা এ বছর মাত্র ২০ হাতে নেমে এসেছে।
কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, পাইলট চ্যানেল খননের কারণে ভবদহ গেটের নীচে জোয়ারে ৭ হাত গভীরতা দেখা গেলেও ভাটিতে গভীরতা কমছে। বিল খুক্শিয়ায় টিআরএম চালুর এক বছরে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পেয়ে কাট পয়েন্টে ৫০/৬০ ফুট হয়। বর্তমানে তা নেই।
এ পরিস্থিতিই প্রমাণ করে এবারই যদি বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী বিলে টিআরএম এর প্রস্তুতি না নেয়া হয় তাহলে ৫০/৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে যাবে। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই মণিরামপুর, অভয়নগর, কেশবপুর উপজেলা ছাড়িয়ে অন্যান্য উপজেলাতেও জলাবদ্ধতা গ্রাস করবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিৎ বাওয়ালী বলেন, গত ১৬ মার্চ যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানকল্পে এক জাতীয় কর্মশালায় পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল হক মাহমুদের উপস্থিতিতে পুনরায় টিআরএম করার সিদ্ধান্ত হয়। পানি সম্পদ মন্ত্রী ঘোষণা করেন টিআরএম বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জনপদের জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখার জন্য ১ এপ্রিল থেকে ২টি এস্কেভেটর লাগিয়ে পাইলট চ্যানেল চালু রাখা হবে। ভবদহ গেটের উজানে ও ভাটিতে ৬ কিলোমিটার খনন অব্যাহত রাখা হবে। গেট উন্মুক্ত রাখা হবে।
কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে গেট খোলা হলেও খনন শুরু হয় ২২ এপ্রিল থেকে। তবে কখনই ২টি এস্কেভেটর এক সাথে কাজে লাগানো হয়নি। মাসাধিককাল একটা এস্কেভেটর ২১ ভেন্টের পাশে অকেজো পড়ে রয়েছে। অন্যটির খবর নেই। এই কাজে টেন্ডার হয়নি। কাজ চলছে থোক বরাদ্দে। ৪টা প্যাকেজে ২টা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। একটি সনি করপোরেশন, অপরটি শুভ এন্টারপ্রাইজ। শুভ এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ নেওয়া শ্রী নদীর নেহালপুর অংশে এখনো কাজ শুরুই করা হয়নি। অথচ ওই কাজ সম্পন্নের শেষ সময়সীমা ৩০ আগস্ট। দীর্ঘসূত্রিতায় নদীখনন কাজের প্যাকেজ আটকে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব অনিয়মে অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুরের ১শ’৫০টির মতো গ্রাম, বাজারঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফসল ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। সরকার প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনও যদি সজাগ ও সতর্ক না হয়, তাহলে ভবদহে আগের মতো সুদূরপ্রসারী বিপর্যয় দেখা দেবে। তাই এ অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় রোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, মুক্তেশ্বরী, টেকা, হরি ও শ্রী নদীতে পলি জমে তলদেশ উঁচু হয়েছে। নদীগুলোর পলি অপসারণে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে টিআরএম বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেই। ফলে ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। যা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, অবিলম্বে পরিকল্পিতভাবে টিআরএম চালু করা না হলে এ জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমাধান হবে না। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে, নদীগুলোর পলি অপসারণ ও অবৈধ মাছের ঘের উচ্ছেদ করা আজ সময়ের দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ, প্রধান সমন্বয়ক বৈকুণ্ঠ বিহারী রায়, যুগ্ম সমন্বয়ক গাজী আব্দুল হামিদ, কেশবপুর উপজেলা ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক এড. আবু বক্কর সিদ্দিকী, কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাস, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি যশোর জেলা কমিটির সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু প্রমুখ।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj