আপডেট: জুলাই ২৬, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৯৩ বার

ভবদহ অঞ্চলের ১৩০ গ্রাম প্লাবিত, রাস্তায় আশ্রয়

উত্তম ঘোষ, ভবদহ (যশোর) এলাকা ঘুরে: যশোরের দুঃখ ভবদহ পাড়ের ১৩০টি গ্রাম অতি বৃষ্টির ফলে ফের প্লাবিত হয়েছে। এতে সাত লক্ষাধিক মানুষ ফের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। তবুও জলাবদ্ধ পানি সরাতে ওইসব এলাকার নদী, খাল-বিল থেকে নেট-পাটা ও ভেসাল জাল অপসারিত হয়নি।
 
যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদ মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন, রোববার (২৩ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) বেলা ১২টা পর্যন্ত যশোরে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুধবার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত এ বৃষ্টিপাত চলবে।

সরেজমিনে জানা গেছে, ভবদহ এলাকার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠে গেছে, ভেসে গেছে ঘেরের শত’ শত’ কোটি টাকার মাছ। গত বছরের মতো পানিবন্দি লোকজন গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী নিয়ে এলাকার পাকা রাস্তা ও ভেড়ি বাঁধের উপর আশ্রয় নেওয়া শুরু করছে।
 
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা থানা এলাকার ৫২টি বিল এলাকা ভবদহ নামে পরিচিত। এসব অঞ্চলের পানি বের হওয়ার জন্য বিরাট একটি স্লুইস গেট আছে। কিন্তু পলি পড়ে স্লুইস গেটের দুই পাশে ভরাট হয়ে গেলে আশির দশকে এই অঞ্চলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সেই থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাবদ্ধতা নিরসনে শত’ শত’ কোটি টাকা খরচ করেছে। গত অর্থ বছরেও এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু তার কোনো ইতিবাচক ফল হয়নি। গত কয়েক দিনের বর্ষণে ফের ডুবতে বসেছে ভবদহ অঞ্চল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গত অর্থ বছরে এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য হরিহর নদীর পলি অপসারণে ৮০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। ভবদহ স্লুইস গেটের উজান ও ভাটিতে ব্যয় করা হয়েছে আরো অর্ধকোটি টাকা।
 
স্থানীয়রা বলছেন, জ্যৈষ্ঠে দুই দফা ভারীবৃষ্টিতে ভবদহ অঞ্চলের সব বিল পানিতে ভরে যায়। সরকারি খাল দখল করে অবৈধভাবে ঘের তৈরি ও নদীগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি বিলের মধ্যে পানি জমে যায়। আর সর্বশেষ শ্রাবণে এসে গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অধিকাংশ এলাকায় বিলের পানি উপচে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকার রাস্তাও তলিয়ে গেছে।
 
সরেজমিন খবর নিয়ে জানা গেছে, মণিরাপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ ইতিমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মণিরাপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়ন, নেহালপুর ইউনিয়ন, কুলটিয়া ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামই এখন পানিবন্দি।

শ্যামকুড় ইউনিয়নের হাসাডাঙ্গা গ্রামের হামেদ গাজী বাংলানিউজকে বলেন, গত বছর পানিতে বাড়ি ঘর সব ভেঙে যায়। কয়েক মাস রাস্তার উপর ছিলাম। এখনো সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার পানি বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেছে। গরু, ছাগল নিয়ে আবার রাস্তার উপর থাকতে হবে। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম বলেন, হরিহর নদীর পানি উপচে পড়ে এলাকা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকের বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে।

উপজেলার পাজবাড়িয়া গ্রামের বাদল মাল্লিক, কুমার মল্লিক, কুমারসীমা গ্রামের গৌতম মল্লিক, তাপস কুমার রায়, প্রণব রায় বাংলানিউজকে বলেন, শুনেছি আমাদের জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু জল তো বাড়ি উঠে গেছে। গত বছরের মতো এবারও দুই এক দিনের মধ্যে রাস্তায় যেতে হবে।
 
একই অবস্থা কেশবপুরে। কেশবপুর পৌর এলাকার অধিকাংশ মানুষই এখন পানিবন্দি। এছাড়া উপজেলার পাজিয়া, মঙ্গলকোট ইউনিয়নের অনেক গ্রামের মানুষ বিপদের মুখে পড়েছে। পৌর এলাকার মধ্যকুল গ্রামের গৃহবধূ রেক্সনা খাতুন বাংলানিউজকে বলেন, ‘ঘরের মধ্যে পানি জমে গেছে। কথা বলে কী হবে? আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। একই অভিযোগ একই গ্রামের ওবায়দুর রহমানের।
 
অভয়নগর উপজেলার ডাঙ্গামশিয়াহাটি, বেদভিটা, সুন্দলী, ফুলেরগাতি, বারান্দি, দিঘলিয়াসহ এ অঞ্চলের প্রায় সব গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকে বাড়ি ঘর ছেড়ে রাস্তায় চলে আসার পরিকল্পনা করছেন।
 
এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বাংলানিউজকে বলেন, গত এপ্রিল মাস থেকে ভবদহ এলাকায় দু’টি ড্রেজিং দিয়ে খনন কাজ চলছে, বর্তমানে একটি ড্রেজিং মেশিন নষ্ট সেটিও মেরামতের কাজ চলছে।
 
গত কয়েকদিনের একটানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলেও সাগরে নিম্নচাপের কারণে নদ-নদীর পানি না টানার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত বন্ধ হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে ভবদহ এলাকার নদ-নদীর অবস্থা অনেক ভালো।

তথ্যসূত্রঃ Bangla News 24.com