আপডেট: জুলাই ২২, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৭৬ বার

মাচার তরমুজের সাথে দুলছে কৃষকের সুখ-স্বপ্ন

এস এম আরিফ : মাচার তরমুজের সাথে দুলছে কৃষকের সুখ-স্বপ্নযশোর সদর উপজেলার রহেলাপুরের কৃষক তরিকুল ইসলাম। সবার কাছে এখন তার পরিচিতি সফল তরমুজ চাষী হিসাবে। নিজ প্রচেষ্টায় কৃষক পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কৃষি উদ্যোক্তা হিসাবে। অনেকের কাছে তিনি এখন দৃষ্টান্ত।
যশোর সদর উপজেলার রহেলাপুর, পাঁচবাড়ীয়া, উসমানপুর, জগমোহনপুর আর কাশিমপুরের বিভিন্ন মাঠে মাচায় উৎপাদিত হচ্ছে বারোমাসি তরমুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হতে মাচায় মিস্টি কুমড়া ঝুলে আছে। দেখতে কুমড়ার মতো মনে হলেও আসলে তা তরমুজ।
যশোর সদর উপজেলার রাহেলাপুর গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের মেজছেলে তরিকুল ইসলাম। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর লেখাপড়া আর এগোয়নি। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। কাজ করতেন কুয়ালালামপুরে ক্লাসিক সাইনিক মোল্ডিং ফ্যাক্টরীতে। সেখানে মেশিনের সাহায্যে কাঠ দিয়ে তৈরী হতে ফটোফ্রেম। অটো ফটোফ্রেম তৈরীর মেশিন অপরাটের ছিলেন তরিকুল। বিদেশ বিভূইয়ে ফটোফ্রেম বানালেও তার হৃদয়ের ফ্রেমে ছিল স্বদেশের ছবি। রহেলাপুর গ্রামের শৈশব স্মৃতি তাকে আবেগ তাড়িত করতো। তাইতো ৮ বছর মালয়েশিয়া থাকার পরেও গ্রামে ফিরে কিছু করার তাড়নায় দেশে ফিরে আসেন তিনি। সময়টা ২০১৪ সালের মাঝামাঝি। তরিকুল তার বড়ভাই খায়রুল ইসলামের কর্মস্থল চুড়াডাঙ্গা বেড়াতে গিয়ে বারোমাসি তরমুজ চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হন। মাঠে তরমুজের বীজ বপণের আগে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়ে যায় হৃদয় জমিনে, চুয়াডাঙ্গায় হলে যশোরে কেন নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত বীজ কোম্পনীর বিপণন কর্মকর্তা বড়ভাই খায়রুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় নেমে পড়েন তরমুজ চাষে। চুয়াডাঙ্গায় চায়না ও জাপানী জাতের তরমুজ উৎপাদন হলেও তরিকুল ভিন্ন জাত উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু করেন তাইওয়ানের বীজ জেসমিন টু আর ব্লাক প্রিন্স জাতের তরমুজ চাষ। সেই শুরুর পর থেকে আর পিছে তাকাতে হয়নি তার। তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন সদর উপজেলার রহেলাপুর, পাঁচবাড়ীয়া, উসমানপুর, জগমোহনপুর আর কাশিমপুরের জনা চল্লিশেক কৃষক। প্রায় ১৫ থেকে ২০ একর জমিতে উৎপন্ন হচ্ছে বারোমাসী তরমুজ। তরিকুল এখন সবার কাছে পাচ্ছেন তরমুজ চাষে আইকনের সম্মান। মাচার তরমুজের সাথে দুলছে কৃষকের সুখ-স্বপ্নমাচার তরমুজের সাথে দুলছে কৃষকের সুখ-স্বপ্ন
যশোরে মাচা পদ্ধতিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ বিবেচিত হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটি কৃষি পণ্য হিসাবে। তরিকুল ইসলাম জানান,

Caption

 

এই তরমুজের জীবনকাল মাত্র ৬০ দিনের। ১ বিঘা জমির জন্য প্রয়োজন ৫০ গ্রাম বীজ। যার দাম ৩ হাজার ৮’শ টাকা। বিঘাপ্রতি সেড তৈরীর মালসিং পেপার ৭ হাজার ৫’শ, মাচা পদ্ধতিতে শেড তৈরীর বাঁশ আর মজুরী খরচ ১০ হাজার, সার মাটি আর বালাই নাশক স্প্রে বাবদ ৭ হাজার ৫’শ, পরিচর্য্যা মজুরী ৬ হাজার, পরিবহন খরচ ২ হাজার সর্বমোট বিঘা প্রতি তরমুজ চাষে খরচ হয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে ৬০ দিনে তরমুজ উৎপাদন হয় প্রায় ১২ ’শ থেকে ১৫’শ পিস তরমুজ যার ওজন প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ মেট্রিক টন। প্রতিটি তরমুজ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলে যার বিক্রি মূল্য হয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় নীট লাভ থাকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। যা তুলনামূলক অন্যান্য ফসলের চাইতে অনেক লাভজনক। তরিকুল ইসলাম আরো জানান, একটি সেড তৈরী হলে সেই শেডে নুন্যতম তিনটি তরমুজের আবাদ করা যায়। ফলে স্থায়ী এই খরচটি পরের দু’বার হয় না। ফলে পরের দু’বারে উৎপাদন খরচ কমে গিয়ে লাভের ভাগ আরো বেশী হয়।
যশোরে তরমুজ চাষের সম্ভাবনা বিষয়ে সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু ছায়েদ মোঃ আরিফ জানান, সাধারণত দেশে ফাল্গুন চৈত্র মাসে তরমুজের চাষ হয়ে থাকে। এই তরমুজই যশোরের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জেলা থেকে আমদানি করে বিক্রি করেন। সিজনের বাইরে এখন আর সেই তরমুজ বাজারে নেই। কিন্তু বারোমাসই এই তরমুজ পাওয়া যায় বলে এর চাহিদা বেশী। তাইওয়ানের জেসমিন-১, জেসমিন-২ ও ব্লাক প্রিন্স জাতের তরমুজে পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনা মূলক বলে ফসলে মার খাওয়ার ঝুঁকিও কম। গাছের গোড়ায় জলাবদ্ধতা ছাড়া এই জাতের উৎপাদন ব্যাহত হবার আর কোন কারন নেই। এই তরমুজ অনেক সুস্বাদু, পুষ্টিকর। তিনি জানান, সবচেয়ে বড় আশা জাগানিয়া কথা হচ্ছে বোরো ধান কাটার পর প্রায় দু’ আড়াই মাস জমি পতিত থাকে। দু’টি ধান চাষের মাঝে অনায়াসে একার তরমুজের ফলন সম্ভব। ফলে জমির সঠিক ব্যবহার যেমন নিশ্চিত হচ্ছে তেমনি বাড়ছে আয়। এ সব কারনে তরমুজ চাষে বাড়ছে কৃষকের সংখ্যা।
মাচার তরমুজের সাথে দুলছে কৃষকের সুখ-স্বপ্নযশোরের মাটিতে তরমুজের চাষ হবে তা বছর তিনেক আগেও ভাবেনি কৃষকরা। তার উপড় অসময়ে মাটির পরিবর্তে লাউয়ের মতো মাচায় তরমুজ চাষের এমন ধারণা না থাকলেও লাউ কুমড়ার মতোই দিব্যি চাষ হচ্ছে তরমুজের। মাটি থেকে অল্প উচু করা মাচায় শত শত ঝুলন্ত তরমুজে ভরে গেছে ক্ষেত। অসময়ের ফলনে দামও মিলছে ভালো। তাইতো মাঠের পর মাঠ মাচায় তরমুজের সাথে ঝুলছে এ অঞ্চলের কৃষকের সুখ স্বপ্ন।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj