আপডেট: মে ২৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১০৬ বার

যশোরে অপ্রতিরোধ্য মাদক-শেষ

মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস॥ মাদকদ্রব্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ হচ্ছে পাচার ও ব্যবসার নিত্য নতুন কৌশল। একটি কৌশল ধরা পড়ার পর মাদক সিন্ডিকেট অন্য কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এসব কৌশলের কারণে সর্বনাশা মাদক নিরাপদে একস্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে। আইন-আদালত থেকে বাঁচার জন্যেও নেয়া হচ্ছে নানা ছলচাতুরি ও কূটকৌশলের আশ্রয়। ফলে যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে আটক পড়ছে, তাদের বেশিরভাগই আইনের ফাঁকফোঁকর গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং মাদক ব্যবসার মূল হোতা ও রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ, বিজিবি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসৎ সদস্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড় দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, মাদকের শীর্ষ আইটেম ‘ইয়াবা’ মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের আরেক প্রান্তে ভারত সীমান্তের কাছে অবস্থিত যশোর জেলা। মাঝখানে দূরত্ব অন্তত ৮শ’ কিলোমিটার। এর মধ্যে বহু জেলা, উপজেলায় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইউনিট রয়েছে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবা সহজে যশোরে চলে আসছে নিত্য নতুন কৌশলের কারণে। ইতিমধ্যে যেসব কৌশল ধরা পড়েছে তার মধ্যে রয়েছে গরুর পেটে, মানুষের পেটে, মাছের পেটে, কফিনের ভেতর, মলদ্বারে, মেয়েদের গোপন অঙ্গে, কাঁঠাল ও ডাবের ভেতর, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, গ্যাস সিলিন্ডার, মটর গাড়ির টায়ার, তেলের ট্যাংকি, শিশুদের দুধের কৌটা প্রভৃতির ভেতর লুকিয়ে ইয়াবা বহন। ধর্মীয় পোশাকে হুজুর সাজিয়ে ও সরকারি বেসরকারি গাড়িতে জাতীয় সংসদ ও সংবাদপত্র স্টিকার লাগিয়ে মাদকদ্রব্য বহনের ঘটনা ধরা পড়েছে। এর বাইরে অধরা, অজানা কৌশল রয়েছে। একটি জানাজানির হবার পর আরেকটি কৌশলের আশ্রয় নেয় মাদক পাচারকারীরা। গোয়েন্দা তথ্য ছাড়া যা ধরা ও শনাক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণের মূল কাজে নিয়োজিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অবস্থা ‘ঢাল সড়কবিহীন নিধিরাম সরদারের’ মতো। ১৯৯০ সালে এটি প্রতিষ্ঠাকালে জনবল ছিল ১ হাজার ২শ’ ৮৩ জন। ২০১৪ সালে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭শ’ ২২ জন করা হয়েছে। কিন্তু লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়েনি। সেই মান্ধাতা আমলের সাজ-সরঞ্জাম, নিয়ে তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে ‘আধুনিক সাজে সজ্জিত মাদক সন্ত্রাসীদের, এই প্রতিষ্ঠানের মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ইউনিটের জন্যে গাড়ি, আর্মস, স্কানার, মোবাইল ট্রাকিং সুবিধা কিছুই নেই। সোর্স ও গোয়েন্দা তথ্য তাদের একমাত্র ভরসা।
অভিনব কৌশল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কারণে মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাও রাঘাব বোয়ালরা ধরা পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের জালে আটকা পড়ে চুনোপুটি শ্রেণির বহনকারীরা। কৌশলের কারণে তারাও আইন-আদালত থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। যশোরে মাদক সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা করেন এমন একজন সিনিয়র আইনজীবী জানান, মাদক পাচার ও ব্যবসায় যশোর শীর্ষে অবস্থান করলেও সর্বোচ্চ শাস্তির কোন নজির নেই। এমনকি, অধিকাংশ মামলায় আসামিদের সাজা হয় না। এর কারণ হচ্ছে, মামলায় আসামি ও সাক্ষীদের ঠিকানা ও পরিচয় সঠিক থাকে না। অনেক সময় সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা সাক্ষীদের আগেই ম্যানেজ করে ফেলে আসামিরা। তার মতে, আসামেিদর ভুল তথ্য দেয়া হয় ইচ্ছে করে। টাকা দিয়ে বাদি কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসৎ সদস্যদের ম্যানেজ করে আসামিরা একাজটি করায়। এভাবেই আইনের ফাঁকফোঁকড় গলিয়ে তারা বেরিয়ে যায়। মামলা দায়েরেরও ক্ষেত্রেও সূক্ষ্ম কারসাজির আশ্রয় নেয়া হয়। অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, পুলিশ, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যে মামলা করে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন আসামি থাকে না। পরিত্যক্ত মালামাল হিসেবে মামলা করা হয়। অর্থাৎ আর্থিক লেনদেনের কারণে আসামি ছেড়ে দেয়া বা ভুল ঠিকানা দেয়া হয়। যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মোর্তজা ছোট বলেছেন, অসম্পন্ন্ তথ্য ও সাক্ষীর অভাবে অনেক আসামি অপরাধ করেও রক্ষা পেয়ে যায়।
যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান মাদকমুক্ত যশোর গড়ার জন্যে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি সর্বশেষ  ১০১ দিনের কর্মসূচীর আওতায় ১৪ জন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের গডফাদারের ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করেছেন। পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, মাদকদ্রব্য দেশ জাতি ও ধর্মের শত্রু। এর হাত থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। এটা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্যে প্রয়োজন, সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সহযোগিতা। যশোর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক নাজমুল হোসেন একই অভিমত ব্যক্ত করে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj