আপডেট: মে ১৫, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১০৪ বার

একাত্তরের শিশুটি ৪৬ বছরেও পায়নি পিতা-মাতার পরিচয়

বয়স সাতচল্লিশ পেরিয়েছেন সরস্বতী ওরফে সুফিয়া। কিন্তু এখনও জানে না তার আসল বাবা-মা’র ঠিকানা। সেই একাত্তর সাল থেকে কখনো হিন্দু কখনো মুসলিম পরিবারে আশ্রয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। এজন্য তার নাম কখনো সরস্বতী। আবার কখনো সুফিয়া হয়েছে। জীবন সংগ্রামে বারবার নাম আর ধর্মীয় পরিচয় বদল হয়েছে বটে। মা বাবাও পেয়েন নতুন নতুন। কিন্তু আসল বাবা মায়ের সন্ধান মেলেনি এখনও। জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা ও ভালবাসা।
একাত্তরের মে মাসের কোন একদিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার এলাকায় বাগানে কুড়িয়ে পাওয়া দেড় বছরে একটি কন্যা শিশুকে। সেই শিশুটি আজকের সরস্বতী ওরফে সুফিয়া। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তার স্বজনদের সন্ধান মেলেনি। যখন যাদের কাছে আশ্রয় পেয়েছেন, তারাই হয়ে উঠেছেন তার আপনজন। সর্বশেষ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) নেতৃবৃন্দ তার সন্ধান পেয়েছে। সরস্বতী ওরফে সুফিয়াকে পুর্নবসানের দায়িত্ব নিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার প্রেসক্লাব যশোরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার হাতে উপহার সামগ্রি তুলে দেন। একই সাথে তাকে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করেছেন।

ঘাদানিকের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, সরস্বতী ওরফে সুফিয়া ৪৬বছরেও তার আত্মীয় স্বজনের পরিচয় পাননি। কখনো হিন্দু পরিবার। আবার কখনো মুসলিম পরিবারে তার আশ্রয় মিলেছে। বড় হওয়ার পর এই শহীদ সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গতি দরিদ্র মুসলিম পরিবারটির ছিল না। যার ফলে সরস্বতী গাছতলা, রাস্তায় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ৭১ সর্বহারা এই নারী ৪৬ বছরে বহু নির্যাতন ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছে। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুর্নবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যশোরের রোটারি কেনায়েত আলী ও আনোয়ারা বেগম ওল্ড হোম কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এসেছে। তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

সরস্বতী ওরফে সুফিয়া জানান, তার পিতা-মাতার সন্ধান জানেন না। ছোট বেলায় হিন্দু বাড়িতে ছিলাম। তখন নাম ছিল সরস্বতী। পরে মুসলমান বাড়িতে কাজ নিয়েছি। তখন থেকে আমার নাম সুফিয়া। যখন যাদের কাছে থেকেছি তারাই আমার বাবা মা। তাকে পুর্নবাসনের উদ্যোগ নেওয়া বেজাই খুশি সুফিয়া।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২২ মে ঝিনাইদহ, শৈলকুপা ও কালিগঞ্জ এলাকার হাজার হাজার মানুষ তাদের সহায় সম্বল ফেলে ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য ঝিনাইদহের বারোবাজার হয়ে চৌগাছার মাশিলা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। শরণার্থীর মিছিলে নারী-শিশু ও পুরুষসহ দুই-তিন হাজার মানুষ ছিল। হানাদার বাহিনী এ খবর পেয়ে যশোর ক্যান্টমন্টে থেকে চার-পাঁচটি গাড়ির বহর নিয়ে বারোবাজার অভিমুখে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শরণার্থীদের অনেক নারী-পুরুষকে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে হাত-মুখ বেঁধে ফেলে। স্থানীয়দের ধারণা ওই সরস্বতীর বাবা মাকে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। অথবা সরস্বতীকে ফেলে তার বাবা-মা ভারতে চলে গেছেন।

বারোবাজারের চা দোকানদার বানছারাম রেললাইনের পাশ থেকে সরস্বতীকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর বানছারাম পাল শিশুটিকে তার বোন যশোদা রাণীর কাছে তুলে দেন। যশোদা রানী শিশুটির নাম দেন সরস্বতী। নিজের সন্তানের মত তিনি লালন পালন করেন। যশোদা হয়ে ওঠেন সরস্বতীর মা। পাঁচ বছর পর সংসারে অভাব অনটন দেখা দেয়। এরপর দুই পরিবারে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশি ইদু জোয়ার্দারের স্ত্রী আছিয়া বেগম সরস্বতীর দায়িত্ব নেন। এরপর তার নাম রাখা হয় সুফিয়া। সেই থেকে আছিয়া মা হয়ে ওঠেন। সেখানেও প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন। এরপর বারোবাজারের ব্যবসায়ী রফিউদ্দিন মুন্সীর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন কিশোরী সুফিয়া। সেখানেও প্রায় ১০বছর ছিলেন। একপর্যায়ে সুফিয়া তার বাবা-মা’র সন্ধানে রাজপথে নেমে পড়েন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন স্বজনদের সন্ধানে। কিন্তু সন্ধান মেলেনি। বারোবাজার এলাকার বেলার্ডবাড়ি মিঠাপুকুর ফুলছুড়ি, হালিমবাগ ও পিরোজপুর গ্রামে তার বসবাস। যখন যেখানে থাকেন, সেটাই তার গ্রাম।

দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ ৪৬ বছর পার হলেও সুফিয়ার সন্ধানে এখানে কেউ আসেনি। এলাকার সবার কাছে প্রিয় সুফিয়া। এলাকার বৃদ্ধ লোকদের আব্বা ও বাবা বলে ডাকে সে। হিন্দু বাড়ি থাকলে হিন্দু আর মুসলিম পরিবারে থাকলে ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলে। পড়াশুনার সুযোগ পায়নি। ধর্মীয় পরিচয় ও স্বজনদের সন্ধান না পাওয়ায় বিয়েও হয়নি তার। সর্বশেষ একটি স্থানীয় পত্রিকায় এই সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীরের নজরে আসেন সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার সংগ্রামের গল্প। তিনি সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুর্নবাসনের দায়িত্ব নেন। এরপর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদকে নির্দেশ দেন।

হারুন অর রশিদ বলেন, বুধবার সকালে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীরের নির্দেশে সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার পুনর্বাসনের জন্য বারোবাজারে গিয়ে তার মতামত নেয়া হয়। সুফিয়া প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। আগামী এক মাসের মধ্যে তার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

রোববার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুলসহ নেতৃবৃন্দ সরস্বতী ওরফে সুফিয়ার হাতে উপহার সামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে যশোরের রোটারি কেনায়েত আলী ও আনোয়ারা বেগম ওল্ড হোম কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নেতৃবৃন্দ। সেখানেই আগামী এক মাসের মধ্যে পুনর্বাসন করা হবে সুফিয়াকে।

তথ্যসূত্রঃ Poriborton