আপডেট: মে ১৩, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৬৮ বার

যশোরে অগুনতি ফিটনেসহীন গাড়ি

নিজাম উদ্দিন শিমুল : যশোরে অগুনতি ফিটনেসহীন গাড়িযশোরের বিভিন্ন রুটে চলাচলের অনুপযোগী বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সারাদেশে এ সব যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত অভিযান চললেও কার্যত যশোরে তেমন কোন অভিযান চোখে পড়ছে না।
এতে লক্কর ঝক্কর গাড়ির অবাধ চলাচলে একদিকে যেমন যাত্রীরা দুর্ঘটনার ঝ্ুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে যশোর বিআরটিএ প্রতিবছর প্রায় অর্ধকোটি টাকার সরকারি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মঙ্গলবারও যশোরের বারীনগরে একটি ফিটনেসহীন গাড়ি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে। যাতে বহু হতাহতের ঘটনা দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছে।
অথচ, এসব বিষয়ে তেমন মাথা ব্যাথা নেই বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের। পদক্ষেপ হিসেবে মাসে কয়েকবার হাতে গোনা কয়েকটি গাড়িকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা, আর বাৎসরিক নোটিস ছোড়াছুড়ির মধ্যদিয়েই চলছে খেলাপী আদায়ের কার্যক্রম। কিন্তু তাতে জনদুর্ভোগ আর ভোগান্তি কোনভাবেই কমছে না।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, যশোরে প্রায় ৯ হাজার নিবন্ধিত বাস, মিনি বাস, ট্রাক, মিনি ট্রাক, পিকআপ চলাচল করছে। এরমধ্যে প্রায় ৫ হাজার যানবাহন রয়েছে ফিটনেসহীন। বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোর বিআরটিএ অফিসের মোটরযান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা খেলাপীদের প্রতিনিয়ত তাগিদ দেই। কেউ কেউ আসেন। তবে অধিকাংশই আসেন না।
অথচ, মোটরযান আইন বলছে, যানবাহনের ফিটনেস সনদ পাওয়ার মূল শর্ত হচ্ছে কারিগরি ও বাহ্যিকভাবে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে যানবাহনের ৬০টির মতো কারিগরি ও বাহ্যিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এসব বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যানের ইঞ্জিনের পুরো কার্যকারিতা, আকৃতি ও নিবন্ধনের সময় উল্লেখ করা ওজন ঠিক আছে কি না, কালো ধোঁয়া বের হয় কি না এবং ব্রেক, লাইট ও বাহ্যিক অবয়ব ঠিক আছে কি না। এসব বিষয় নিশ্চিত হলেই ফিটনেস সনদ দেওয়ার নিয়ম। বিআরটিএর হিসেবে যশোরের ৫০ শতাংশ যানবাহনেরই ফিটনেস সনদ নেই।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, খালি চোখে দেখলেই মনে হয় যশোরে যানবাহনের ৬০ শতাংশই অনুপযুক্ত। ফিটনেস দেওয়ার পদ্ধতিতেও গলদ রয়েছে। সড়কে আইনের প্রয়োগও কম। যশোরে যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেই যেমন সত্য, তেমনি যেসব যানের সনদ আছে, যন্ত্রে পরীক্ষা হলে সেগুলোর একটা বড় অংশই চলাচলের উপযুক্ততা হারাবে। তারা আরো বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলার পেছনে কতগুলো কারণ আছে। বিআরটিএর একশ্রেণীর কর্মকর্তা ঘুষ নিয়ে অনেক সময় যানবাহন না দেখেই সনদ দিয়ে দেন। আবার কখনো কখনো বিআরটিএর কিছু কর্মকর্র্তার সাথে আঁতাত করে সনদ না নিয়েই মালিকেরা রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তাদের অভিমত, পুলিশ সড়কে কঠোর অবস্থান নিলে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল কমে যাবে।
সূত্র জানায়, ফিটনেসবিহীন যানের বড় অংশ চলছে যশোর ও এর আশপাশের উপজেলাতে। আর কিছু চলছে দূরের পথে।
জনসাধারনের জন্য বিশেষ করে বাসের ব্যবহারটিই বেশী। সেক্ষেত্রে যশোরের বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড ঘুরে দেখা যায়, যশোর নিউমার্কেট থেকে মাগুরা রুটে, মনিহারের সামনে থেকে মনিরামপুর, কেশবপুর, নড়াইল স্ট্যান্ড থেকে নড়াইল, লোহাগড়া, কালনা, বাঘারপাড়া, যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ছুটিপুর, চৌগাছা, বেনাপোল, সাতক্ষীরাসহ বেশ কিছু রুটে যে সব বাস চলাচল করে তার অধিকাংশ বাসের ফিটনেস সনদ নেই। তাছাড়া বিভিন্ন ট্রাক স্ট্যান্ডে থাকা অধিকাংশ ট্রাকগুলোর একই হাল। এসব যানবাহনের মালিকেরা নিবন্ধনের পর আর কোনদিন ফিটনেস সনদ নেইনি। আবার কোন কোন যানবাহনের নিবন্ধন সনদের মেয়াদ উত্তীর্ন হলেও তারা সনদ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেন না।
এসব যানবাহনের ইঞ্জিনের অবস্থা শোচনীয়। গাড়ির রং চটা, অনেক বাসে সিটের বদলে বেঞ্চ, লুকিং গ্লাস নেই, লাইট জ্বলে আবার জ্বলে না। দেদারছে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া, যাতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ব্রেকে রয়েছে ত্রুটি। আর এভাবেই প্রতিদিন চলছে হাজার হাজার বাস-ট্রাক, পিকআপসহ নানা যানবাহন। এমন কি যশোরে এমন বাসও চলছে, যাদের কোন রেজিষ্ট্রেশন প্লেট পর্যন্ত টাঙানো থাকে না।
বিআরটিএর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে একটি ভেইকেল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ে বসানো হয়। ওই যন্ত্রের উপর গাড়ি উঠিয়ে যান্ত্রিকভাবে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করে ফিটনেস সনদ গ্রহন করার নিয়ম করা হয়। কিন্তু তা ২০০১ সালেই বিকল হয়ে পরে। তারপর ১৬ বছর পার হয়ে গেলেও ওই যন্ত্রটি সচল করতে পারেননি খুলনা বিভাগীয় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
বিআরটিএর অন্য এক সূত্র জানায়, ফিটনেস সনদ ফি বাবদ প্রতিবছরে বাস, মিনিবাস, ট্রাকের জন্য ১হাজার ৬শ’৫ টাকা (ভ্যাট সহ) ও মিনিট্রাক, পিকআপসহ অন্যান্য যানের জন্য ১হাজার ৮৭ টাকা (ভ্যাট সহ) নির্ধারণ করা রয়েছে।
যশোর বিআরটিএর ভাষ্য মতে, প্রায় ৪হাজার ফিটনেসবিহীন যান রয়েছে যশোরে। অথচ এসব গাড়ি থেকে ফিটনেস সনদ গ্রহন বাবদ কোন অর্থ সরকার পাচ্ছে না। সে হিসেবে ২ হাজার বাস, মিনিবাস, ট্রাক ধরলে বছরে ৩২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং আন্যান্য যানবহন ২ হাজার ধরলে বছরে ২১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা আয় হতো। সেক্ষেত্রে প্রতিবছর সর্বমোট ৫৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে জমা পড়ছে না। সে হিসেবে বলা যায় সরকার প্রতিবছর বিআরটিএর ফিটনেস ফি বাবদ প্রায় অর্ধকোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিআরটিএর যশোরের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন গ্রামের কাগজকে বলেন, যশোরে যে সব ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলছে, তাদেরকে ধরতে প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালানো হয়। এছাড়া এসব যানবাহনের ফিটনেস সনদ পরীক্ষা ও প্রদানের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত মিটিং করে খেলাপীদের একাধিকবার নোটিস পাঠিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ ফি জমা দিচ্ছেন। তাছাড়া মালিক সমিতি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনকেউ খেলাপী টাকা পরিশোধে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে যশোর বিআরটিএ গুরুত্বের সাথেই কাজ করে যাচ্ছে।
বছরে অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব খোয়া যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ সমস্যা বিআরটিএর একার পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। এ সমস্যা নিরসনে যান সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও এসব সমস্যা সমাধানে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে যশোর ট্রাফিক ইন্সপেক্টর শাখাওয়াত হোসেনের কাছে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কত সংখ্যক ফিটনেসবিহীন যানবাহন আছে সেটা আমার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, সেটা বিআরটিএ ভালো বলতে পারবে।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ঐক্য পরিষদের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের আহবায়ক ও যশোর বাস, মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আলী আকবরের সাথে কথা বললে তিনি গ্রামের কাগজকে বলেন, যশোরে যেসব বাসের ফিটনেস নেই সেসব বাসের তালিকা আমরা বিআরটিএর কাছে জমা দিয়েছি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। তিনি আরো বলেন, আমি ইতিমধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মালিকদের লিখিত নোটিস দিয়েছি। সেখানে উল্লেখ ছিলো, চলতি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে ফিটনেস সনদ গ্রহন করতে হবে। অন্যথায় সেসব গাড়ির কোন দ্বায়ভার আমরা গ্রহন করবো না।
তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে এসব গাড়ির মালিকদের এক লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের জেল এবং শ্রমিকদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রেখে একটি আইন পাশ হচ্ছে বলে নোটিসের মাধ্যমে তাদেরকে অবগত করা হয়েছে।
« পূর্ববর্তী সংবাদ পরবর্তী সংবাদ »

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj