আপডেট: মে ৩, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৭৭ বার

যশোরে মুখ থুবড়ে পড়েছে ডিজিটাল কার্যক্রম

মুথ থুবড়ে পড়েছে ‘ডিজিটাল যশোর’র ‘নন্দিত ডিজিটাল কার্যক্রম’। হাতের মুঠোয় নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এসব প্রকল্প চালু করা হয়।  তবে সেই প্রকল্প এখন আর জনগণের সেবায় কাজে আসছে না।
টেলিমেডিসিন সেন্টার বন্ধ ও অধিকাংশ ইউনিয়নের তথ্য সেবা কেন্দ্রে অনলাইন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। জেলা তথ্য বাতায়নে সরকারি-বেসরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য হালনাগাদ নেই। অনলাইনে পড়চা সংগ্রহে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সরকারি দফতরগুলোতে ন্যাশনাল ই সার্ভিস সিস্টেম (নেস) কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। অধিকাংশ অফিসে এনালগ পদ্ধতিতে দাফতরিক কার্যক্রম সম্পাদন করা হচ্ছে। অর্থ্যাৎ ডিজিটাল যশোরের স্বীকৃতি অর্জনে যেসব নন্দিত প্রকল্প ভূমিকা পালন করেছিল সেগুলো বর্তমানে ঝিমিয়ে পড়েছে।

২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর যশোর সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম জেলা যশোরকে দেশের প্রথম ‘ডিজিটাল জেলা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ডিজিটাল যশোরের বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্প সারাদেশের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে যশোরের সেই নন্দিত প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ভোগান্তি ছাড়াই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রম চালু হলেও তৃণমূলের মানুষ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সূত্র মতে, জেলা প্রশাসন ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে যশোর সদর, শার্শা, ঝিকরগাছা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলায় ৫২টি ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রে এবং মণিরামপুর কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার ২২টি কেন্দ্রে ৫টাকা ফি দিয়ে অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রম শুরু করা হয়। শুরুতে ব্যাপক সাড়া পড়লেও বছর তিনেকের মাথায় নানা সমস্যায় মুখ থুবড়ে পড়ে এই কার্যক্রম। জেলা প্রশাসনের মনিটরিংয়ের অভাব ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতা এবং উদ্যোক্তাদের ফাঁকিবাজির কারণে এ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

কয়েকটি উপজেলার একাধিক ইউডিডিস উদ্যোক্তা অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের সহযোগিতার অভাবে অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে বিল পরিশোধের শেষ দিনে ভোগান্তি পোহাতে হয়। গ্রাহকের দেওয়া বিল আমরা অনলাইনে সাবমিট করতে গেলে জমা দিতে পারি না। পরে আমাদের জরিমানা করা হয়। পকেটের টাকা দিয়ে জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। গ্রাহকদের সঙ্গেও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এজন্য বন্ধ করে দিয়েছি।

কার্যক্রম বন্ধ প্রসঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার  আবদুল মান্নান বলেন, গ্রাহকরা ৫ টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে থাকেন। গ্রাহকরা বিল পরিশোধ করলেও অনেক সময় টাকা জমা হয় না। একই সঙ্গে আশেপাশে ব্যাংক থাকায় গ্রাহকরা অনলাইনে বিল জমা দিতে নিরুৎসাহিত হন। তবে খুব তাড়াতাড়ি এ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার সালাউদ্দিন আল বিথার বলেন, সমিতির আওতায় ২২টি ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রম চালু ছিল। সফটওয়্যার পরিবর্তনের কারণে ওই সেন্টারগুলোর কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ আছে। পুনরায় চালু হবে এ কার্যক্রম।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (আইসিটি) সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, কয়টি ইউডিসিতে এই কার্যক্রম চালু ছিল। আর কয়টি বন্ধ ছিল সেটি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব। এজন্য একটু সময় লাগবে।

যশোরে চালু হওয়ার বছর খানেকের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে টেলিমেডিসিন কার্যক্রমের ৪টি সেন্টার। ফলে বাড়িতে বসে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন না। দেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরে ২০১৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সর্বপ্রথম জাঁকজমকভাবে টেলিমেডিসিন সেন্টার চালু হয়। ‘স্কাইপ’র মাধ্যমে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা ও পরামর্শের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সদর উপজেলা চাঁচড়া, ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ও মনিরামপুর উপজেলার মশ্মিমনগর ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র টেলিমেডিসিন সেন্টারের কার্যক্রম চালু হয়। যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাজধানীর আয়েশা মেমোরিয়াল স্পেশালাইজড (প্রা.) হসপিটালের সহযোগিতায় যাত্রা শুরু করে কার্যক্রমটি। তখন এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তৎকালীন তথ্য ও প্রযুক্তি সচিব নজরুল ইসলাম খান। যশোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের উন্নত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হতো বিশেষজ্ঞদের পরিসেবা। সেবা ও পরামর্শ দিতেন রাজধানীর আয়েশা মেমোরিয়ালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তারা স্কাইপ’র মাধ্যমে কথা বলে রোগীদের পরামর্শ ও সেবা দিতেন। তবে রোগীর রক্তচাপ ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আলাদা মেশিন ব্যবহার করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে যশোরের সেই সময়ের জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান বদলি হয়ে যাওয়ার পর এই কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে।

 

মণিরামপুর উপজেলার মশ্মিনগর ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা জিএম মুকুল বলেন, এক বছর আগে ‘ডাইকট মেশিন’ নামক যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে গেলে মেরামত করার জন্য আয়শা মেমোরিয়াল হাসপাতালের লোকজন নিয়ে যায়। এরপর সেই মেশিনটি দেয়নি। টেলিমেডিসিন কার্যক্রম আর চালুও করা হয়নি।

যশোর জেলা তথ্য বাতায়নে দেখা গেছে, যশোর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নামের তালিকায় ফয়েজ আহমেদ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি), সহকারী পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন ও মিলু মিয়া বিশ্বাসের নাম রয়েছে। অথচ ওই তিন কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন কয়েক বছর আগে। তাদের স্থানে যোগ দিয়েছেন শহীদ আবু সরোয়ার,  ভাস্কর সাহা।

আর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার বণিক। তিনি বদলি হয়েছেন কয়েক মাস হলো। তার স্থানে যোগ দিয়েছেন আহমেদ কবীর। মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই দফতরের তথ্য আপডেট ছিল না। একই অবস্থা ছিল যশোর পৌরসভার মেয়রের ছবি ও তথ্যে। সেখানে পুরাতন মেয়র মারুফল ইসলামের ছবি থাকলেও বর্তমান মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদারের তথ্য রয়েছে। এ নিয়ে এক তরুণ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে সেটি বুধবার সংশোধন করা হয়।

জেলা তথ্য বাতায়নে বিভিন্ন দফতরের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকলেও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হয়রানি বন্ধে অনলাইনের মাধ্যমে জমির পড়চা সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করা হয়। কিন্তু সেই কার্যক্রমের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না। নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, আমার জানা মতে অনলাইন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কার্যক্রমের ২/৩টি সেন্টার বন্ধ রয়েছে। বাকিগুলো চালু আছে। আর অনেকগুলো সেন্টার বন্ধের বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। টেলিমেডিসিন সেন্টার বন্ধ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, আমি আসার পর টেলিমেডিসন সেন্টার বন্ধ পেয়েছি। সেটি চালুর সম্ভাবনা নেই। জেলা তথ্য বাতায়ন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা তথ্য বাতায়নে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর প্রতি মাসে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের তথ্য হালনাগাদ করার কথা। কর্মকর্তা বদলি হলে সেখানে সংশ্লিষ্টরা হালনাগাদ করবেন। আবার অনেক সময় আমরাও করে থাকি। তবে কোনো দফতর যদি হালনাগাদ না করে থাকে সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হবে।

তথ্যসূত্রঃ Poriborton