আপডেট: এপ্রিল ১৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৫৫ বার

ছেলের লাশ নিয়ে ফেরার পথে পেট্রাপোলে স্বামীর মৃত্যু, সীমান্তে অপেক্ষা আসমার

মুসলিম উদ্দিন পাপ্পু, বেনাপোল: স্বামীর মৃত্যু, সীমান্তে অপেক্ষা আসমার ক্যান্সারে মারা গিয়েছে একমাত্র সন্তান। পেট্রাপোল বন্দরে ছেলের কফিন আগলে বসেছিলেন বাবা। চোখের জল বাঁধ মানছিলোনা। শরীর যেন ক্রমে নেতিয়ে পড়ছে। কোনও মতে উঠে যাচ্ছিলেন শৌচালয়ের দিকে। সেখানে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনি মারা যান।
আত্মীয়-স্বজন বলে তখন কেউ নেই আসমা বিবির পাশে। সদ্য সন্তানকে হারিয়ে যিনি স্বামীর মৃত্যুরও সাক্ষী থাকলেন সোমবার।
অপরদিকে গতকাল মঙ্গলবার ছেলে আসাদের লাশ বাংলাদেশে তার আতœীয় স্বজনের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারতের ইমিগ্রেশন পুলিশ। বেনাপোল সীমান্তে আসাদের লাশ হস্তান্তরের সময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। অপরদিকে আইনী প্রক্রিয়ার কারনে বাবার লাশ বনগাঁ থানা কোলকাতায় নিয়ে গেছে।
বেনাপোল চেকপোষ্টে লাশ নিতে আসা রফিকের চাচা খন্দকার আলী জানান, ছেলে আসাদকে বাঁচাতে রফিক তার সহায় সম্পত্তি সব বিক্রি করে দিয়েছে। ছেলের অবস্থার কোন উন্নতি না দেখে তাকে ভারতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।
ঢাকার গাজিপুরে সম্পন্ন চাষি ছিলেন মহম্মদ রফিক (৪৫)। কিন্তু দশ বছরের ছেলে আসাদ ম-লের ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে টাকা-পয়সা তলানিতে এসে ঠেকেছিল। জমিজমা বন্ধক রেখে ছেলেকে নিয়ে কোলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। রোববার সেখানেই মারা যায় আসাদ। এরপর সমস্ত আইনী প্রক্রিয়া শেষ করে সোমবার আসাদের লাশ বাংলাদেশে নিয়ে আসার জন্য রওনা দেন আসমা বেগম ও রফিক ম-ল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, ছেলের কফিনের কাছ থেকে সরানোই যাচ্ছিল না রফিককে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে পাশেই বসেছিলেন তিনি। আর থেকে থেকে চোখ মুছছিলেন।
পুত্রশোকে অসুস্থ মনে হচ্ছিল তাঁকে। বন্দরের শৌচালয়ের এক কর্মী রামেশ্বর তাঁর হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন শৌচালয়ের দিকে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সেখানে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন রফিক। মাথা ঘুরে পড়ে যান। রামেশ্বরই তাঁকে উদ্ধার করে একটি ভ্যানে চাপিয়ে বনগাঁ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সঙ্গে আসমা। হতবুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন যেন মহিলা। স্বামীকে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের দিকে। অভিবাসন দফতরের এক কোণে তখন পড়ে নিঃসঙ্গ একখানা কফিন।
বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা রফিককে মৃত বলে জানিয়ে দেন। আলুথালু অবস্থা আসমার। অনেক পরে পৌঁছান আত্মীয়-স্বজনেরা। দেহ ময়না-তদন্ত হবে। কফিন রাখা হয়েছে পেট্রাপোল থানায়। সেখানেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে আসমার। ফ্যালফ্যালে চোখে মহিলা বললেন, ‘‘দু’দুটো কফিনের ভার এখন কী ভাবে বইব আমি!’’
এই ঘটনায় বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের বিধানসভার সদস্য বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘বাংলাদেশের ওই নারী মৃত ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। ছেলের মৃতদেহ বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার পথে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন থেকে মৃতদেহের ছাড়পত্র আনার জন্য পেট্রাপোলে অপেক্ষা করছিলেন রফিক ম-ল নামে বাংলাদেশি ওই ব্যক্তি। ওই সময় মারা যান তিনি। তবে স্বামী ও ছেলের মৃতদেহ নিয়ে সীমান্তের ধারে অসহায় ওই বাংলাদেশী মাকে সব রকমভাবে সাহায্যের চেষ্টা করছি আমি।’

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj