আপডেট: এপ্রিল ১৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৫৯ বার

মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ যশোর চারুপীঠের শামীম ও হিরন্ময় চন্দ সংবর্ধিত

প্রণব দাস : মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ যশোর চারুপীঠের শামীম ও হিরন্ময় চন্দ সংবর্ধিতইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ যশোর চারুপীঠসহ উদ্যোক্তা মাহাবুব জামাল শামীম ও হিরন্ময় চন্দ সংবর্ধিত হলেন। জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানের শতাব্দী বটমূলে রওশন আলী মঞ্চে বৈশাখী উৎসব অনুষ্ঠানে এ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। একই সাথে এবছর মঙ্গল শোভাযাত্রায় সাজ সজ্জায় নৈপূন্য প্রদর্শন করায় ১৩টি সংগঠনকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য বাংলা নববর্ষে উৎসব প্রকাশের অন্যতম অনুসঙ্গ যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অংশ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনে গত বছর ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
তবে বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে প্রতি বছর যে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, তার সূচনা ১৯৮৯ সাল থেকে। কিন্তু তারও আগে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয় যশোরে ১৯৮৫ সালে।
এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চারুপীঠের অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীমের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ও উত্তরীয় পরিয়ে দেন প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক ডক্টর হুমায়ুন কবীর। সভাপতিত্ব করেন জেলা সম্মিলি ত সংাস্কৃতিক জোটের সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু। হিরন্ময় চন্দের পক্ষে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষার্থী সৈয়দ গোলাম দস্তগীর মিঠু। চারুপীঠের পক্ষে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ। উৎসবে সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী, সুরধুনী, চাঁদের হাট, কিংশুক, স্পন্দন, আশাবরী, যশোর শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীবৃন্দ। নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যবিতান ও চাঁদের হাটের শিল্পীবৃন্দ। বিবর্তন যশোরের প্রযোজনায় ‘তোতারাম’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। সঞ্চালনা করেন আবৃত্তি শিল্পী সপ্তর্ষী দাস শীলা। মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ যশোর চারুপীঠের শামীম ও হিরন্ময় চন্দ সংবর্ধিত
এদিকে বৈশাখী উৎসব মঞ্চে চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট যশোরের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী সম্মাননা স্মারকপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো যথাক্রমে প্রথম চারুতীর্থ, দ্বিতীয় জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি বাংলাদেশ (নাসিব), তৃতীয় যশোর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, শেকড়, নন্দন যশোর, সরকারি এমএম কলেজ, নবকিশলয় প্রি-ক্যাডেট নার্সারী স্কুল, ইন্সটিটিউট নাট্যকলা সংসদ, নান্দিক, সুরধুনী, প্রাচ্যসংঘ, মহিলা সংস্থা এবং বিবর্তন যশোর।
সংবর্ধিত মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যতম উদ্যোক্তা যশোর চারুপীঠের অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বলেন, নিজেদের ভাবনা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পর সেটা আজ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিরাজমান। তিনি বলেন, ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি সমৃদ্ধ বাঙালী ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
মাহবুব জামাল শামীম বলেন, যশোরের চারুপীঠের পর ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করেন। ১৯৯০ সালে বরিশাল ও ময়মনসিংহ শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এর চার বছর পর ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও শহরে ও শান্তিনিকেতনে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে। আর আজ বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ এ মঙ্গল শোভাযাত্রা। যার অংশীদার যশোরবাসী।
যশোর চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ চারু-কারু শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম বলেন, মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সবারই আলাদা উৎসব আছে। কিন্তু এমন একটি উৎসব চাই যেটা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিজের উৎসব বলে মনে করবে। এমন ভাবনায় শিল্পী হিরন্ময় চন্দ প্রস্তাব করলেন পহেলা বৈশাখের কথা। হিরন্ময় চন্দের ভাবনায় যশোরের বর্ষবরণে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি চারুপীঠের ছোট শামীম এবং আরো কয়েকজন। এর আগে এই উপমহাদেশে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রার কোনো ইতিহাস নেই। সেদিনের সে আয়োজনের পর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয় নববর্ষের এ আয়োজন। পরবর্তীতে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’র নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
সেদিনের সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শামীম-হিরন্ময়-গোলাম দস্তগীরদের আয়োজনে ১৩৯১এর চৈত্রের শেষ রাতে যশোর শহরজুড়ে আঁকা হলো আল্পনা। বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য মাহবুব জামাল শামীম তৈরি করেন পরী ও পাখি, হিরন্ময় চন্দ তৈরি করলেন চমৎকার একটি বাঘের মুখোশ। নতুন বছরের নতুন আলোয় শিশুদের রংবেরঙের পোষাক, মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে বর্ণিল সাজে সানাইয়ের সুরে, ঢাকের তালে নেচে-গেয়ে সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রদক্ষিণ করে যশোর শহর। সেদিন যশোরের সব শ্রেণীর মানুষ এসে যোগ দেন সেই শোভাযাত্রায়। ইতিহাসের পাতায় জন্ম নিল এক নতুন অধ্যায়ের। শুরু হল বর্ষবরণে নতুন মাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এর চার বছর পর ১৯৮৯ সালে এই আয়োজন শুরু হয় ঢাকাতে। এরপর ঢাকা ছাড়িয়ে সারা দেশ, দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর আমড়ম্বর পূর্ণ পরিবেশে নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে। অসা¤প্রদায়িক চেতনার অবিনাশী উৎস মঙ্গল শোভাযাত্রা যা সারাবিশ্বের বাঙালীর মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আর ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি সেটা আরো ব্যাপকতা লাভ করবে।
এদিকে শুরুর মঙ্গল শোভাযাত্রা উৎসব আয়োজনের অন্যতম শিল্পী এসএম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজ যশোরের অধ্যক্ষ শামীম ইকবাল জানান, আবহামান বাংলার অসা¤প্রদায়িক চেতনায় সার্বজনিন উৎসব ‘বাংলাবর্ষ বরণ’। তিনি বলেন, যে যাই বলুক, বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পথিকৃৎ যশোর জেলা। যার শুরু চারুপীঠের হাত ধরে। যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ এর পুরনো হোস্টেল নামে বহুল পরিচিত চুয়াডাঙ্গা বাস স্ট্যােন্ডে পাশে শিশু চারুকলা স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে প্রথম বের হয় বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। সেদিনের সেই আয়োজনকে যাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন যতটুকু মনে পড়ে তারমধ্যে অন্যতম জনাব প্রফেসার আব্দুল নঈম, সামসুজ্জামান, বিমল রায় চৌধুরী, দেবব্রত ঘোষসহ আরো অনেকে। এছাড়া শুভাশীষ মজুমদার, মনিরুজ্জামান শিপু, রুমি, দস্তগীর মিঠু, সহিদুল ও আমিসহ আরো অনেকে। শাহীন, লিটু, রথিসহ ৩০/ ৩৫ জনের একটি দল সেদিনের শোভাযাত্রায় পলাশ ফুলের ডালি হাতে দুই লাইনে দড়াটানা পর্যন্ত যেয়ে আবার ফিরে এসেছিলাম।
শামীম ইকবাল আরো জানান, পরের বছর শোভাযাত্রা আয়োজন হয়েছিল এসপি বাংলোর পাশে কাজী লুৎফুন্নেছার বাড়িতে পরিচালিত চারুপীঠ থেকে।
এর পরের বছর অর্থাৎ ১৩৯৩ সনে জাঁকজমক পূর্ণ শোভাযাত্রাটি আনন্দ শোভাযাত্রা নামে শহর প্রদক্ষিণ করেছিল যার প্রধান ছিলেন চারুপীঠ সভাপতি আব্দুল হাসিব ও অধ্যাপক আমিরুল আলম খান। এছাড়া যশোরের প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সদস্যবৃন্দ। উল্লেখ্য সে বছর পহেলা বৈশাখ দিনটি ছিল পবিত্র রমাযান মাসে এবং সেবারই প্রথম থানার দেয়াল আলপনা করে শোভাবর্ধন করা হয়েছিল যার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক।
বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় আনন্দের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না বলে তিনি জানান। শুধু বলেন, শুরুর মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে জড়িত থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj