আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১১৪ বার

 শাকিব খানও বাঁচাতে পারলেন না যে সিনেমা!

সেঁজুতি শোণিমা নদী  : প্রিমিয়ারের আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল,“বাংলা সিনেমায় নতুন যুগ এসেছে, সেই সঙ্গে এসেছে আমাদের সিনেমা ‘সত্তা’”। এই কথায় পুরোপরি বিভ্রান্ত হয়ে এবং শাকিব খান-পাওলি দাম তারকাজুটির পয়লা রসায়ন কেমন জমে তা দেখতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌঁছে গিয়েছিলাম স্টার সিনেপ্লেক্সে। কিন্তু সিনেমাশেষে ‘সত্তা’র জন্য কিছু করুণা ও দীর্ঘশ্বাস ছাড়া দেওয়ার মতো আর ছিলনা কিছুই।
করুণা কেন? কারণ, এই সিনেমার প্রধান দুই শিল্পী, শাকিব খান এবং পাওলি দাম- দুজনই তাদের চরিত্রের সঙ্গে ন্যায়বিচার করে ভাল অভিনয় করেছেন। হ্যাঁ, যারা ভাবেন বাংলা ছবির হিরো মানেই মানহীন অতি-অভিনয়, তাদের মুখে ঝাঁটা মেরে শাকিব খান অধিকাংশ দৃশ্যেই উৎরে গেছেন সফলভাবে। আর পাওলি দাম অভিনীত চরিত্রটির গভীরতা ছিল এতোই বেশি, আর তাই পর্দায় সেটিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি এই সু-অভিনেত্রীর। কিন্তু তারপরও এই দুজনের প্রেমকাহিনি জমাতে পারলেন না পরিচালক! এই সিনেমাকে করুণা ছাড়া আর কীইবা করার আছে?

আর দীর্ঘশ্বাসই বা কেন? কারণ, অনেকদিন পর ‘সত্তা’ সিনেমার মাধ্যমে ব্যতিক্রমী একটি গল্প পেয়েছিল ঢাকাই সিনেমা। সোহানী রহমান-এর ছোটগল্প ‘মা’ পড়ার সুযোগ হয়নি; কিন্তু সিনেমাতে যে কাহিনি তুলে ধরা হলো, সেটা নিঃসন্দেহেই গত কযেকবছরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী এবং ভাল। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার, সিনেমার চিত্রনাট্যও আশি শতাংশে ভাল, সংলাপও নেহাত মন্দ নয়। আর তাই এতগুলো ভালোর যোগফল শেষপর্যন্ত কীভাবে শূণ্য হয়, তার হিসেব কষতে গেলে হতাশায় দীর্ঘশ্বাসই ফেলতে হয়।

‘সত্তা’র সবই যখন ভাল, তখন গলদটা কোথায়? গলদটা আসলে গোড়াতেই! ভাল সিনেমা হয় ভাল পরিচালকের হাতেই; খারাপ নির্মাণশৈলীর কদর্যতা বড় তারকার জৌলুস দিয়ে ঢাকা যায়না কখনোই। হাসিবুর রেজা কল্লোল, মানছি এটা আপনার প্রথম চলচ্চিত্র, কিন্তু তারপরও ভাল করার সবরকম উপাদান হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও আপনি সিনেমাটিকে এইভাবে নষ্ট করলেন?

সিনেমার মূল চরিত্র শিখা, চুয়াডাঙার সীমান্তঘেঁষা এক গ্রামের তরুণী, শুরু থেকেই মন্দভাগ্য যার নিত্যসঙ্গী। তার বিয়ের যৌতুক যোগাড় করতে গিয়ে অবৈধ পাচারকাজে জড়িয়ে যায় মা; মরে সীমান্তরক্ষীর গুলি খেয়ে। মায়ের লাশ ছাড়াতে গিয়ে সে খপ্পরে পড়ে বিবেকহীন এক চিকিৎসকের, যে তাকে ভোগের লালসায় মত্ত। ওই মুহূর্তে আত্মরক্ষার্থেই ডাক্তারকে খুন করে ঢাকায় পালিয়ে আসে সে।

ঢাকায় এসেও তার ভাগ্য ফেরে না, একের পর এক দুষ্টচক্রের হাত বদল হতে হতে একপর্যায়ে বেশ্যাদের দলে গিয়ে ভীড়ে সে। কিন্তু শত আঘাত সত্ত্বেও নিজের সতীত্বকে বিকোতে চায়না শিখা, রূখে দাঁড়ায় সকল স্রোতের বিপরীতে।

এটিই সিনেমার একমাত্র চরিত্র, যার সূচনা, বিকাশ এবং পরিণতি সফলভাবে উঠে এসেছে। পাওলি দাম দারুণ অভিনয় করেছেন শিখার চরিত্রে; শিখার কষ্টের সঙ্গে দর্শক একাত্মবোধ করবে একদম শুরু থেকে শেষ অব্দি। বৈরি এই পুরুষশাসিত সমাজে দৃঢ়চেতা হয়েও কীভাবে পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হয় নারীদের- তারই মূর্ত প্রতিচ্ছবি যেন শিখা।

শিখার প্রেমে পড়া যুবক সবুজ মাদকাসক্ত। অনাথ এই যুবককে মাদক ধরিয়ে তার সম্পত্তি হাতড়ে নিতে চায় মামা-মামী। সমাজের কপটতায় বিরক্ত সবুজ নিজেকে ডুবিয়ে রাখে মাদকে; কিন্তু শিখার মত পথের পতিতার প্রতি তার প্রেম দেখার মতো। কখনও আইসক্রিম কিনে দিয়ে, কখনও মায়ের হীরার আংটি শিখার হাতে আলগোছে ধরিয়ে দিয়ে সে প্রকাশ করতে চায় নিজের ভালবাসা। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে কি তা পারে?

তাকে পারতে দেন না পরিচালক! রাতের বেলা খদ্দেরের খোঁজে পার্কে হাঁটতে থাকা শিখার মুখোমুখি যখন হয় সবুজ, রাতের আলো-আঁধারিতে এক বেশ্যা আর নেশাখোরের অদ্ভুত প্রেমের ফুল সবেমাত্র যখন ফুটতে শুরু করেছে আবেগময় সংলাপে পূর্ণ এক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে, ঠিক তখনই স্বপ্নদৃশ্যের মাধ্যমে অপ্রাসঙ্গিক এক গানের অবতারণা করে গোটা ব্যাপারটাকেই নষ্ট করে দিলেন পরিচালক!

বলছি না, গানটি অসুন্দর, কিংবা শ্রুতিমধুর নয়। এমনকী কক্সবাজারের দামি দামি হোটেলে শ্যুট করা গানটির দৃশ্যায়নও আর দশটা প্রেমের সিনেমায় মানিয়ে যেত ভালভাবেই। কিন্তু এই সিনেমায়? কেন?

এখন পরিচালক যদি বলেন স্বপ্নদৃশ্যের গানে স্বপ্নের ভেলায় চড়ে নায়ক-নায়িকা যেখানে খুশি যেতে পারেন- সেটা আমি মেনে নেব না কিছুতেই; অন্তত ‘সত্তা’ সিনেমার ক্ষেত্রে নয়। কারণ, এই সিনেমার নায়িকার স্বপ্ন পতিতাবৃত্তির ক্লেদমুক্ত এক ছোট্ট সুন্দর সংসারের; যে সংসারে থাকবে স্বামীর সোহাগ, থাকবে অনাগত সন্তানের স্বপ্ন। সিনেমার নায়িকার স্বপ্ন ভালবেসে তাকে বুকে টেনে নেবে, জীবনে এমন কারও উপস্থিতি, যার শরীরে অন্যের ছোঁয়াচ থাকলেও তার কিছু যায় আসে না।

আর তাই স্বপ্নের ওই দৃশ্যে সবুজ-শিখার কাল্পনিক ছোট্ট ঘর দেখানোই যেত, যে ঘরে অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় ঝোলে আদরের দোলনা! কিংবা কোনো স্বপ্ন-টপ্ন ছাড়াই দিনে-রাতে পার্কের অলিতে গলিতে কেমন করে জমে উঠছে এই জুটির প্রেম, কেমন করে শিখার ভালবাসা বদলে দিচ্ছে সবুজকে, সবুজ নিজেও কেমন করে ধীরে ধীরে আপন করে নিচ্ছে ঘরহারা-স্বজনহারা শিখাকে, তাও ছোট ছোট দৃশ্যে দেখানো যেত অনায়সেই। অন্ততপক্ষে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা এক প্রেমিকজুটির প্রমিত বাংলার গানের সঙ্গে রাবীন্দ্রিক পোশাকের মডেলমার্কা নাচ দেখার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেত দর্শক!

এই গানের পরের দৃশ্যেই দেখানো হলো শিখা অন্তঃসত্ত্বা! গান বাদ দিলে যে জুটির প্রেমের গল্প মাত্র দুটি দৃশ্যে দেখানো হয়েছে, তাদের সম্পর্কের এত উন্নতি? দর্শকের কাছে কীভাবে তাহলে এই ‘দ্রুতগতি’র প্রেম বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে?

সবুজ আর শিখার আরও একটি অপ্রাসঙ্গিক প্রেমের গান দেখা গেছে সিনেমায়, যেখানে আয়নার কারিকুরি দেখিয়ে নির্মাতা হয়তো ‘নতুন কিছু’ করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। সেই অপচেষ্টা না করে এই গানটিতেও সবুজ ও শিখার বাস্তব প্রেমের টুকরো টুকরো দেখালেই তা সিনেমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।

সিনেমার প্রতিটি গানই আলাদাভাবে শুনতে হয়তো ভালোই লাগবে। বিশেষ করে শুরুতে আবহ সংগীতের মতো করে বেজে ওঠা মমতাজের ‘আমারে ডুবাইতে তোমার এত আয়োজন’ গানটি দারুণ। এছাড়াও জেমস-এর গাওয়া ‘তোর প্রেমেতে’ গানটিও ছিল যথেষ্ঠ শক্তিশালী। কিন্তু বাকি চারটি গানের কি আদৌ কোনো দরকার ছিল সিনেমায়? বিশেষ করে ‘গুলিস্তানের মোড়’ আর ‘রাজা বদলালেই কি আসবে সুদিন’ গানদুটির কথা আর দৃশ্যায়নের চড়া বৈপরীত্য বিরক্তিই ছড়াবে দর্শকের মনে।

পুরো সিনেমার প্রতিটা খেত্রেই খাপছাড়া ভাবটা চোখে লেগেছে খুব। চরিত্ররা সবাই আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলেন সিনেমায়, কিন্তু গানগুলো সব প্রমিত ভাষার! এছাড়াও শিখা ছাড়া বাকিসব চরিত্ররা ঢাকার, তাই তাদের একই ধরণের কথ্য রীতি মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু শিখা যেহেতু চুয়াডাঙার মেয়ে, সেখানকার আঞ্চলিকতার দিকে কি একটু নজর দেওয়া যেত না?

সিনেমার প্রধান দুই চরিত্র দারুণ অভিনয় করেছেন। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রগুলোর অভিনয় ছিল হতাশাজনক। সেই একই পুরোনো সুড়সুড়ি দেওয়া কৌতুক, আর ভিলেনদের অতি অভিনয় আর কতদিন সহ্য করতে হবে ঢাকাই ছবির দর্শকের?

সিনেমার দুটি গুরুতর ভুল নিয়েও কথা না বললেই নয়। একটি দৃশ্যে দেখানো মাদক সরবরাহকারী, যাকে শাকিব খান বন্দুকের ভয় দেখিয়ে বাধ্য করলেন মাদক গ্রহণে, সেই একই লোক কিছুক্ষণ পরের দৃশ্যে বনে গেল পুলিশের হিটম্যান! এ যেন দর্শকের সঙ্গে নির্মাতার সেই শেয়াল পণ্ডিতের কুমির ছানা দেখানোর গল্প!

আর যে ভুলটি বারবার চোখকে পীড়া দিয়েছে, সেটি হলো সিনেমাটোগ্রাফির। শাকিব কিংবা পাওলি’র গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে ক্যামেরা ঠিকমতো ফোকাসই হয়নি! এই ভুল কি হলে বসে সিনেমা দেখার সময় মানা যায়?

এতসব আজগুবি ভুলের কারণেই, যে সিনেমাটি হতে পারতো উঁচুমানের একটি শিল্পকর্ম, সেটি হয়ে গেছে একটি প্রায়-নিম্ন মানের বাণিজ্যিক ঢাকাই সিনেমা। তবে শাকিব-পাওলির দারুণ অভিনয় দেখাটাই যদি একমাত্র অভিপ্রায় থাকে, তাহলে শত বিরক্তি দূরে ঠেলে ‘সত্তা’ আপনাকে দেখতেই হবে। 

তথ্যসূত্রঃ bdnews24.com