আপডেট: মার্চ ১৯, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ৮৪ বার

আধুনিকতা ও নানা প্রতিকুলতায় বিলুপ্তির পথে চৌগাছার মৃৎশিল্প

মুকুরুল ইসলাম মিন্টু, চৌগাছা (যশোর): আধুনিকতার ছোঁয়া আর যথাযথ পারিশ্রমিক না পাওয়ায় দিন দিন বিলুপ্তি হতে বসেছে এক সময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় সেই মৃৎশিল্প সামগ্রী। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ফলে পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া এই শিল্পকর্ম ছেড়ে দিয়ে অনেকে এখন হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক কিংবা ভ্যানচালক। জনপ্রিয় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্টপোষকতা জরুরি বলে মনে করেন উপজেলার সচেতনমহল।
সূত্র জানায়, মহান স্বাধীনতার প্রবেশদ্বার হিসাবে খ্যাত যশোরের চৌগাছার সুখ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। নানা জাতি বর্ণ ও ধর্মের বসবাস এ উপজেলা একটি শান্তিপ্রিয় উপজেলা হিসেবে পরিচিত যুগযুগ ধরে। নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের আবাসস্থল হওয়া সত্ত্বেও সকলের মধ্যে ছিল এক সৌহর্দপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু সব কিছুই যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।
সূত্র জানায়, মৃৎশিল্প সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছাবাসীর জন্য ছিল গৌরব ও অহংকারের একটি বিষয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও এই পেশার সাথে জড়িতরা বেশ ভালই ছিলেন। বছরের প্রায় ১২ মাসই উৎপাদন করা হত মাটির তৈরি সব সামগ্রী। বাজারে চাগিদা ভাল থাকায় এই পেশার সাথে জড়িতরা বেশ স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু মাত্র ৪৫ বছরের ব্যবধানে এই শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে দিন দিন এই বেহালদশা বলে মনে করছেন পেশার সাথে জড়িতরা। জানা গেছে, উপজেলার খড়িঞ্চা, গরীবপুর, ইছাপুর, হাজরাখানা, সঞ্চাডাঙ্গা, পাতিবিলাসহ বিভিন্ন গ্রামে যুগযুগ ধরে পাল বংশের মানুষ বসবাস করে আসছেন। তাদের বেশির ভাগই মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এ সকল পাল পরিবারের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে ঘরের নববধূ সকলেই কাজে বিশ্বাসী। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তারা নিজ নিজ অঙিনায় তৈরি করে চলেছেন মাটি দিয়ে নানা সামগ্রী। এর মধ্যে গুড়ের ভাঁড়, রসের ভাঁড়, হাঁড়ি, কড়াই, দই খুরি, দই ভাঁড়, নান্দা, কুয়ারপাট, মালশা, হাড়া, কলসি, কুলা, মুড়ি ভাজা ঝাঁঝরি, জেলোই উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বাড়িতে শিল্পীর নিপুন হাতে তৈরি হচ্ছে এই সকল সামগ্রী। বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত এই সব পেশার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা স্থানীয় মাঠ থেকে মাটি সংগ্রহ করে সেই মাটি থেকে কাদা তৈরি করে বানাচ্ছেন মনোমুগ্ধকর নানা সামগ্রী। এক সময় গ্রাম এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে উল্লেখিত সামগ্রী ছিল সব থেকে জনপ্রিয়। কিন্তু বর্তমানে সভ্যতার যুগে মাটির সামগ্রী যেন অচেনা একটি বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শ্রম, মেধা খরচ সব কিছুই আছে আগের মত কিন্তু বাজারে চাহিদা কম তাই এই পেশার সাথে জড়িতরা পড়েছেন মহাবিপাকে। বাধ্য হয়ে অনেকে ছেড়েছেন পেশা আবার অনেকে হয়েছেন দেশান্তর।
গতকাল চৌগাছা পৌর এলাকার ইছাপুর পালপাড়াতে গেলে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। এ সময় কথা হয় মহল্লার মৃৎশিল্পের অন্যতম শিল্পী অজিত কুমার পালের (৫৮) সাথে। তিনি জানান, জন্মসূত্রে তিনি এই পেশা পেয়েছেন। পিতা ঈশ্বর জটাধর পাল। তাদের আদিনিবাস যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের গুবিলা গ্রামে। প্রায় দুই যুগ হলো তারা স্বপরিবারে চলে এসেছেন চৌগাছা পৌর এলাকার ইছাপুর গ্রামে। দুই সন্তানের জনক অজিত কুমার জানান, এই পেশা অত্যান্ত পরিশ্রমী একটি পেশা। যে পরিমান শ্রম দিতে হয় সে পরিমান টাকা পাওয়া যায় না। এক সময় মাটির তৈরি সামগ্রীর যথেষ্ঠ চাহিদা ছিল। তখন মালামাল তৈরি করে বেশ ভাল ভাবেই সংসার চলতো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আর সংসার চলে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে এখন হয়েছেন ক্ষুদ্র কৃষক, চা বিক্রেতা কিংবা ভ্যানচালক। তিনি জানান, পিতার রেখে যাওয়া পেশাকে আমি আগলে রেখেছি কিন্তু আমার সন্তানরা আর এই পেশায় থাকতে নারাজ। কারণ যে পরিমান শ্রম দিতে হয় সে পরিমান লাভ এখানে নেই বিধায় তারা এখন আর এই কাজ করতে চায় না। বড় ছেলে হয়েছে চা বিক্রেতা আর ছোট ছেলে মনোরঞ্জন হয়েছে কৃষক। তিনি জানান, ইছাপুর গ্রামে অন্তত ১৫টি পরিবার আছে পাল বংশের। এর সিংগভাগ পরিবার এই পেশায় জড়িত ছিল। কিন্তু এখন ৫ থেকে ৬ টি পরিবার আছে তারা এই পেশার সাথে জড়িত। আগামী ১০ বছরে মধ্যে এরাও থাকবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। নানা প্রতিকুলতার কারণে দেশের জনপ্রিয় এই শিল্প আজ ধ্বংসের পথে। পরিবেশবান্ধব এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এমনটিই মনে করছেন উপজেলার সচেতনমহল।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj