আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১১৩ বার

অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যশোরের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে : ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানের প্রধান

মিনা বিশ্বাস : অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যশোরের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে : ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানের প্রধান এগিয়ে চলেছেন যশোরের নারীরা। ঘরে কিংবা বাইরে, অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই তাদের সফল পদচারণা। কাজের মধ্যে দিয়ে যেমন তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে চলেছেন তেমনি আলো ছড়াচ্ছেন সমাজের সবখানে। গত এক দশকে তাদের সে কর্মের পরিধি আরও বেড়েছে। প্রতিনিয়ত অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছেন তারা।
শুধু ঘর সংসারের দৈনন্দিন কাজ নয়। সব ধরণের কাজে যশোরের নারীরা এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যশোরের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তারা যেমন ঘর সংসারে ভূমিকা রাখছেন, তেমনি কাজ করছেন এবং সফল হচ্ছেন অফিস আদালতে। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আইন আদালত, শিক্ষকতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ছাগল-গরু পালন, নার্সারি, মিল, কলকারখানা, খাবার হোটেল, বিউটি পার্লার, দর্জির কাজ, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ নিয়ে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়ী হচ্ছেন যশোরের নারীরা। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃৃক্ততার মাধ্যমে দারিদ্রতার গ্লানি মুছে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন জেলার ৭১ হাজার নারী। এরমধ্যে ১২ হাজার ৫শ’ ৫৫ জন নারী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
শুধু স্বাবলম্বীতে হওয়াতে থেমে নেই তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ এর যশোর জেলা রিপোর্টে সেই চিত্র উঠে এসেছে। যশোর জেলা পরিসংখ্যান অফিস বলছে, জেলার নারীরা শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে গত এক দশকের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ মতে শুধু প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবেই দায়িত্ব পালন করছেন ১২ হাজার ৫শ’৫৫ জন নারী। ২০০৩ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩শ’৭২। সেই সময় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীর সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৩শ’ ৮ জন। ২০১৩ সালের জরিপে বৃদ্ধি পেয়ে ৭১ হাজার ৩শ’ ৬৪ জনে উন্নীত হয়েছে।
যশোর শহরের শংকরপুরের বাসিন্দা শাফিয়া বেগম বলেন, দিন আনা দিন খাওয়া সংসার ছিল। শংকরপুর গোলপাতা মসজিদের পাশে মুদি দোকান দিয়ে তিনি ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। যশোর শহরের রেলস্টেশন এলাকার হাফিজা খাতুন জানান, চুড়ি ফিতা বিক্রি করে সংসার চালাই। এখন সংসারে অভাব নেই। দুবেলা-দুমুঠো খাবার জোগাড় হচ্ছে।
শহরের রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দা শিল্পী খাতুন বলেন, গরীব নারীদের ভাগ্যে বদলাতে ১৯৯৮ সাল থেকে তারা পরশমনি মহিলা উন্নয়ন সংগঠন চালু করি। মহিলাদের সঞ্চয়ে আগ্রহী করার মধ্যে দিয়ে আমার সংগঠন এগিয়ে গেছে। নারীদের সঞ্চয়ের টাকা দিয়েই তাদের স্বাবলম্বী করতে গরু পালন, হাঁস মুরগি পালন করা এবং বাড়িতে দর্জি দোকান করতে উৎসাহিত করা হয়। অনেকে সঞ্চয়ের টাকার সাথে সমিতি থেকে সামান্য সুদে ঋণ নেয়। এভাবে তারা হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল পালন, দর্জির কাজ, হস্ত শিল্প সহ বিভিন্ন কাজ করে নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছে। এভাবে সমিতির ৪শ’ ৩০ সদস্যের মধ্যে প্রায় ১শ’ জন কর্মের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তারা নারীদের চিকিৎসা সেবা, শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম, বৃদ্ধা মাকে ছাগল প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশ নিচ্ছেন।
বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা ও বিউটিশিয়ান এবং ২০১৫ সালে যশোর জেলা পর্যায়ে জয়িতা সম্মনানা পাওয়া লতিফা শওকত রূপা নিজ প্রতিষ্ঠান সফলতার সাথে পরিচালনা করে আসছেন। তিনি বলেন, আমি ১৯৯২ সালে ৪ জন কর্মী নিয়ে দোলা নকশী ঘর নামে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি এনজিও চালু করি। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে ১হাজার ৫শ’ দরিদ্র অসহায় নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। পরে শহরের দড়াটানায় দোলা বিউটি পার্লার নামে একটি পার্লার ও মেয়েদের ফিটনেস সেন্টার খুলি। যেখানে আরও মেয়েদের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। তারা খেয়ে পরে বেঁচে আছে। তারা আরও মেয়েদের কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন আবার অনেকে প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন এসকল কাজে। তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পারিবারিক, সামাজিক নানান প্রতিকূলতা পেরিয়ে অনেক সংগ্রাম করে আমি আজ সফল হতে পেরেছি। শুরুতে পরিবার চায়নি আমি কাজ করি। তাছাড়া নানান সময়ে চাঁদাবাজির শিকার হয়েছি। হুমকি ধামকি সইতে হয়েছে। বিভিন্নভাবে বাঁধা পেয়েছি। কিন্তু সব বাঁধা পেরিয়ে আজ আমি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। সফলভাবে তা পরিচালনা করছি। এ দেশের প্রতিটি নারীকে সফল হতে হলে নিজের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকতে হবে।
মহিলা আইনজীবী সমিতি যশোরের জেলা সমন্বয়কারী নাসিমা বেগম বলেন, মহিলা আইনজীবী সমিতি থেকে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য নারী উপকারভোগী হয়েছেন। তারা এখন সংসার সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সফলভাবে কাজ করছেন। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন এবং অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। নারীদের জন্য এসকল কাজ করতে যেয়ে মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি চাই আরও নারীরা আসুক। তাদের সমস্যার কথা বলুক। সমাধান নিয়ে এগিয়ে যাক। সমস্যা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে হবেনা।
যশোর পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালক মিঝানুর রহমান হাওলাদার জানান, যশোরের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা ব্যবসা বাণিজ্যে সহ বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে সফল হচ্ছেন। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুন বলেন, সরকারের নারীবান্ধব নানা কর্মসূচি চালুর ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সরকারি বেসরকারি সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে যশোরের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আগের চেয়ে সকলে এখন অনেক বেশি সচেতন। এই সচেতনতা ও কাজে নিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj