আপডেট: জানুয়ারী ১৮, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১৮৩ বার

কৈ ও শিং মাছ চাষে মফিজুরের সাফল্য

কৈ ও শিং মাছ চাষে মফিজুরের সাফল্যউন্নত জাতের কৈ আর শিং মাছের চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন যশোরের মৎস্য চাষি মফিজুর রহমান তরফদার। চাঁচড়া বর্মণপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত তরফদার মৎস্য চাষ প্রকল্পে ৬ হেক্টর জমিতে ১০টি পুকুরে প্রতি বছর প্রায় ২শ’ মেট্রিক টন মাছ চাষ করছেন তিনি। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। আর উৎপাদন খরচসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ শেষে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ টাকার মুনাফা করছেন তিনি। তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই এখন উন্নত জাতের কৈ আর শিং মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। যার স্বীকৃতিস্বরুপ ইতিমধ্যে তিনি কয়েকবার জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মাছ চাষি হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
যশোর শহরতলীর চাঁচড়ার বাসিন্দা মফিজুর রহমানের পিতা মুজিবার রহমান ছিলেন একজন আদর্শ চাষি। আধুনিক পদ্ধতির ধান ও সবজির চাষাবাদ করে তিনিও রাষ্ট্রীয় পদক লাভ করেন। সরকারি পৃষ্টপোষকতায় করেন বিদেশ ভ্রমণ। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৯০ সালে মফিজুর রহমান লেখাপড়া ছেড়ে পৈত্রিক ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে তিনি বর্মণপাড়ায় পৈত্রিক জমিতে ২/৩টি পুকুর খনন করে কার্প জাতীয় মাছের চাষ শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মফিজুর রহমান মাছ চাষে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। আর এ ব্যবসার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখেন। এরপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মৎস্য চাষি মফিজুর রহমান তরফদারকে। বর্তমানে তিনি বর্মণপাড়ায় নিজস্ব ৬ হেক্টর জমিতে ছোট বড় ১০টি পুকুর খনন করে সেখানে উন্নত জাতের কৈ ও শিং মাছের চাষ করছেন। এছাড়া সারা বছরই তিনি সাদা মিশ্র জাতের মাছ চাষ করে থাকেন। তার চাষ করা কৈ আর শিং মাছ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলা শহরে বাজারজাত হচ্ছে। গত বছর আড়াই শ’ মেট্রিক টন কৈ ও শিং মাছ উৎপাদন করেছেন মফিজুর রহমান। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
চাঁচড়ার রাষ্ট্রীয় পদক প্রাপ্ত মৎস্য চাষি ও মৎস্য চাষি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আনোয়ারুল করিম আনু বলেন, যশোরের চাঁচড়ার মাটি মাছ চাষের জন্য আদর্শ। এখানে উৎপাদিত মাছ সারাদেশের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। একসময় এ অঞ্চলে দেশি জাতের সাদা মাছ চাষ হতো। বর্তমানে কৈ, শিং, পাঙ্গাস ও কার্প জাতীয় মাছ উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিয়েছে। তিনি বলেন, কৈ ও শিং মাছের চাষ লাভজনক হওয়ায় মফিজুর রহমান তরফদারের মতো আরো অনেকে এ মাছ চাষে ঝুকে পড়ছেন।
মৎস্য চাষি মফিজুর রহমান তরফদার জানান, তিনি আগে রুই, কাতল, মৃগেলসহ অন্যান্য দেশি জাতের মাছের চাষ করতেন। সাতবছর আগে তিনি উন্নতমানের কৈ ও শিং মাছের চাষ শুরু করেন। স্থানীয় বাজারে কৈ ও শিং মাছের চাহিদা বেশি হওয়ায় তিনি লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন। তার এই সফলতা দেখে স্থানীয় বহু শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত বেকার যুবক এই চাষের প্রতি ঝুকে পড়েন। বর্তমানে তার দেখাদেখি বহু মৎস্য চাষি উন্নত জাতের কৈ ও শিং মাছের চাষ করে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, তার খামারের উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালী, মাগুরা, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ কমপক্ষে ২০ জেলায় সরবরাহ করা হয়। এসব এলাকার মৎস্য চাষি ও ব্যবসায়ীরা ট্রাক-পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানে করে এসব মাছ স্থানীয় চাঁচড়া মৎস্য পল্লী থেকে সংগ্রহ করে নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে বিক্রি করেন।
তিনি আরো বলেন, কৈ ও শিং মাছের চাষ করে ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ায় তিনি ইতিমধ্যে যশোরের চাঁচড়া মোড়ে মাছের খাবার বিক্রির একটি দোকান চালু করেছেন। এছাড়া লাভের টাকায় ৪টি ট্রাকের মালিক হয়েছেন। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের আমিষের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত মাছ বিদেশে রপ্তানী করা। সরকার এ কাজটি সহজ করতে ও চাষিদের কল্যাণে উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে দাবি রাখছি। তিনি বলেন, কেবল আমি লাভবান হইনি, বর্তমানে আমার ১৫/১৬জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। যারা এ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে কৈ ও শিং জাতীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলায় কৈ ও শিং মাছের পোনা উৎপাদন হলেও গুনগত মানের দিক থেকে যশোরের মাছের চাহিদা বেশি। যে কারণে দিন দিন এ মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, তরফদার মৎস্য চাষ প্রকল্পে কৈ ও শিং মাছ উৎপাদনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাকে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সবধরণের সহায়তা দেয়া হয়। আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে।

 

তথ্যসূত্রঃ Daily gramerkagoj