আপডেট: জানুয়ারী ৫, ২০১৭   ||   ||   মোট পঠিত ১৮৪ বার

কালীগঞ্জের দাপনা গ্রামের সব বাড়িতেই নারীরা কেঁচো ও সার উৎপাদন করছেন

শিপলু জামান, বারবাজার (ঝিনাইদহ): কারো বাড়ির বারান্দায়, ঘরের মধ্যে, কারো বা উঠানে, রান্নাঘরে, বাথরুমের পাশে সারি সারি রাখা আছে মাটি ও সিমেন্টের চাড়ি। বাড়ির বাইরে রয়েছে টিনের চালা আর নিচে পাকা হাউজ। এগুলো সবই কম্পোস্ট সারের প্লান্ট। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের দাপনা গ্রাম এখন কেঁচো আর কম্পোস্ট সারের গ্রামে পরিণত হয়েছে। আর এই গ্রামের শতভাগ বাড়িতে এখন কেঁচো ও সার উৎপাদন হচ্ছে। আর এই কাজ করছেন বাড়ির নারীরা। ঘরের কাজের পাশাপাশি তারা প্রতিমাসে আয় করছেন হাজার হাজার টাকা। প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে ৫ থেকে ১০০ কেজি করে কেঁচো। গ্রামের ৬০ ঘর পরিবার এখন আর রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। নিজেদের উৎপাদিত পরিবেশবান্ধন কম্পোস্ট সার দিয়েই জমিতে চাষাবাদ করছেন। মাসে তারা ৬ লাখ টাকার সার ও কেঁচো উৎপাদন করছেন। সমগ্র উপজেলা থেকে মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকার কেঁচো আর সার উৎপাদন হচ্ছে। ১ কেজি কেঁচো ১৫০০ টাকা আর কম্পোস্ট সার ১০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তারা। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কম্পোস্ট সার সৌদি আরব, দুবাইসহ মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। দাপনা গ্রামের মেয়েদের মতো উপজেলার নিয়ামতপুর ও রায়গ্রাম ইউনিয়নের হাজারো নারী এ কাজের সাথে জড়িত হয়েছেন। এই কাজে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও উপজেলা কৃষি অফিস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তবাপুর গ্রামে ৮৫ জন, মহেশ্বরদাঁচা গ্রামের ৯০ জন, নিয়ামতপুর গ্রামের ৬৫ জন, মহিষাডোরা গ্রামের ৪৬ জন, বলরামপুর গ্রামের ১৬১ জন, অনুপমপুর গ্রামের ৬১ জন, হরিগোবিন্দপুর গ্রামের ৫৬ জন, আড়–য়াশলুয়া গ্রামের ৬১ জন, বলাকান্দর গ্রামের ৫১ জন, ভোলপাড়া গ্রামের ৫৩ জন, বারোপাখিয়া গ্রামের ১২৬ জন, খামারমুন্দয়া গ্রামের ১৪ জন, আগমুন্দিয়া গ্রামের ২৫জন এবং মল্লিকপুর গ্রামের ৮১ জন নারীসহ সহাস্রাধিক নারী এই কেঁচো চাষ করছেন। দিনে দিনে তাদের চাষ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের পর গ্রাম।
কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বের গ্রাম দাপনা। এই গ্রামের নারীরা খুবই কর্মঠ। প্রত্যেকের বাড়িতেই ২ থেকে ৮টি পর্যন্ত গরু আছে। তারা তাদের গরুর গোবর কাজে লাগিয়ে কেঁচো আর সার তৈরি করছেন। যে সার পরিবেশবান্ধব। এই গ্রামে শতভাগ বাড়িতে কম্পোস্ট প্লান্ট বানাতে পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছেন রেবেকা ও সোনাভান নামের দুই গৃহবধূ। তারা প্রথমপর্যায়ে হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতায় এই কাজ শুরু করেন। এরপর পুরো গ্রাম। গ্রামের ৬০টি ঘরেই এখন কেঁচো আর কম্পোস্ট উৎপাদন হচ্ছে। গৃহবধূ রেবেকার ঘরের মধ্যে, রান্নাঘরে, বারান্দায়, গোয়ালঘরে, বাড়ির পরিত্যক্ত জায়গায় কাঁচা-পাকা বেশ কয়েকটি কম্পোস্ট প্লান্ট তৈরি করেছেন। প্রতি মাসে তিনি প্রায় ৪০০ কেজি কম্পোস্ট ও প্রায় ২০ কেজি কেঁচো উৎপাদন করছেন। এক কেজি কম্পোস্ট সার ১০ টাকা আর এক কেজি কেঁচো ১৫০০-১৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। গড়ে তার মাসে আয় ১০ হাজার টাকা। একই গ্রামের আতিয়ারের স্ত্রী শাহনাজ, মশিয়ারের স্ত্রী সোনাভান, শওকতের স্ত্রী সুখজান, কুদ্দুসের স্ত্রী হাজেরা বেগম, জিল¬ুর রহমানের স্ত্রী আহরনসহ ৬০ টি পরিবারের সকল গৃহিনীই তাদের বাড়িতে কেউ মাটির রিং¯¬াব, কেউ বা পাকা করে কম্পোস্ট প¬ান্ট তৈরি করেছেন। প্রতি মাসেই তাদের প¬ান্ট থেকে সার ও কেঁচো উৎপাদন হচ্ছে। তারা উৎপাদিত কম্পোস্ট সার নিজেদের জমিতে ব্যবহার করে বাকিটুকু বিক্রি করছেন। দেশের যশোর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে ট্রাক ভরে সার ও কেঁচো ক্রয় করে সেগুলো প্যাকেটিং করার পর মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছেন। কেঁচো কম্পোস্ট সারে বিশেষ করে ধান, পানচাষি, সবজি জাতীয় চাষাবাদে বেশি উপকার হচ্ছে। শুধু তাই না, এই গ্রামের কৃষানীরা সবাই মিলে একটি মহিলা সমবায় সমিতি করেছেন। সার বিক্রির একটি অংশ তারা সমবায় সমিতিতে জমা রাখেন। এই সমিতির বর্তমান মূলধন প্রায় ৩ লাখ টাকা। তারা ইতিমধ্যে সমিতির মাধ্যমে একটি পাওয়ার ট্রিলার, ২টি গরু ক্রয় করেছেন। আর সমিতির সদস্যদের মধ্যে টাকা ঋণ দিয়েছেন। এছাড়াও গ্রামের শিক্ষার্থীকে তারা লেখাপাড়ায় বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেন তারা। নারীদের বক্তব্য, আমরা আর স্বামীদের কাছ থেকে হাত খরচের টাকা নিই না, বরং স্বামীদের বিভিন্ন সময় টাকা দিয়ে সহযোগিতা করি।
মোস্তবাপুর গ্রামের কৃষাণী ও ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম জানান, কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করতে বেশি টাকা খরচ হয় না। দরকার আগ্রহ। গরুর গোবর, লতাপাতা, কলাগাছ আর কেঁচো দিয়েই প্রতি তিন মাস অন্তর সার উৎপাদন করা হয়। এই সারের গুণগত মানও ভাল। যশোর মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রে তারা এ জৈব সার পরীক্ষা করে দেখেছেন বাজারের যে সব টিএসপি পাওয়া যায় তার মান ৪৫% অন্যদিকে কম্পোস্ট সার বা অর্গানিক সারের মান ৮৫% (সার্বিক)। তিনি আরো জানান,তার নিজের প্রায় ২০ কেজি কেঁচো আছে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
স্বেচ্ছাসেব সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রাম অফিসার এস এম শাহিন হোসেন জানান, দাপনা গ্রামসহ কালীগঞ্জ উপজেলার ২টি ইউনিয়নের কৃষকদের পাশাপাশি কৃষানী/গৃহিনীদের কম্পোস্ট তৈরি ও কেঁচো উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। আর কৃষানীদের প্রশিক্ষণের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র জৈবচাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি কালীগঞ্জের রায়গ্রাম ইউনিয়নের আগমুন্দিয়ায় স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে হাতে কলমে কৃষক/কৃষানীদের জৈবচাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেই সাথে কিছু অনুদান প্রদান করেছেন। তারা জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার জন্য কৃষক/কৃষানীদের উদ্বুদ্ধ করছেন।
নিয়ামতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাজু আহমেদ রনি জানান, কেঁচো কম্পোস্ট এলাকার কৃষিতে বিশাল বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি এলাকার স্বামী পরিত্ত্যক্তা, বিধবা ও দরিদ্র মহিলারা কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন করে। প্রায় প্রতি বাড়িতে এই কেঁচো চাষ হচ্ছে। এসব পিছিয়ে পড়া নারীদের সফলতা দেখে আমি মুগ্ধ। দাপনাসহ নিয়ামতপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের নারীরা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তাতে খুব শ্রীঘ্রই এই ইউনিয়ন দেশের নিরাপদ খাদ্যের মডেল ইউনিয়নে পরিণত হবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার জাহিদুল করিম জানান কম্পোস্ট সার পরিবেশবান্ধব। উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের কৃষানীরা নিজেদের উৎপাদিত সার জমিতে ব্যবহার করছেন এটা ভাল উদ্যোগ। কৃষি অফিসও তাদের সার্বিক সহযোগিতা করছে। কেঁচো কম্পোস্ট বা জৈব সার কৃষি চাষাবাদে দারুন ফলপ্রসূ। এটা মাটিকে যেমন সুস্থ রাখে তেমন এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি ও ফসল খেলে সুস্থ জীবন উপভোগ করা যায়। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ছাদেকুর রহমান জানান, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নারীরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি কেঁচো ও সার উৎপাদন করছেন এটা খুবই ভালো। কৃষানীদের যদি কোন সহযোগিতা লাগে তারা আমার সাথে যোগাযোগ করলে সার্বিক সহযোগিতা করবো।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj