আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০১৬   ||   ||   মোট পঠিত ১২২ বার

চৌগাছার কৃষকেরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করে লাভবান

যশোরের চৌগাছায় কৃষকেরা শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ মৌসুমে এলাকার কৃষকেরা ১০ কোটি টাকার সবজি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে শীতকালীন আগাম সবজি উপসা-৩, রহিম ও রুপভান জাতের শিম চাষ হয়েছে ৪শ ৫০ হেক্টর জমিতে, কেকে কুরাচ, ট্রাপিক মানপ্লাস ও ৭১২ জাতের বাঁধাকপি চাষ হয়েছে ৩শ ৮০ হেক্টর জমিতে , মারবেল ও আলয়াগান জাতের ফুলকপি চাষ হয়েছে ২শ ৪৫ হেক্টর জমিতে, বারি-১, পুষা ও রবি জাতের টমেটা চাষ হয়েছে ১শ ৭৫ হেক্টর জমিতে, বেগা, মনিরামপুরি, শিংনাথ ও স্থানীয় বেগুন চাষ হয়েছে ৪শ ৮০ হেক্টর জমিতে , আরলি, জাপানি, ইন্ডিয়া ও স্থানীয় ৪০/৪৫ জাতের মুলা চাষ হয়েছে ২শ ৩০ হেক্টর জমিতে, মারচিলা, হাজারি, লালতীর ও স্থানীয় জাতের লাউ চাষ হয়েছে ২শ ৫০ হেক্টর, সুইট, সুপ্রিমা, লালতীর ও স্থানীয় জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ হয়েছে ২শ ৭০ হেক্টর জমিতে, মাগুরা, ইরি ও চরো ঝাল চাষ হয়েছে ২শ৭০ হেক্টর জমিতে, বানী ও সাদা জাতের পটল চাষ হয়েছে ৪শ ৭৭ হেক্টর জমিসহ বিভিন্ন জাতের মোট ৩ হাজার ৭শ ৮০ হেক্টর জমিতে শীতের সবজি চাষ করা হয়েছে।

যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৩শ ১৭ মেট্রিক টন এবং মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। বুধবার উপজেলার হাজরাখানা, পেটভরা, চাঁদপাড়া. বুন্দেলীতলা, বাদেখানপুর, বড়খানপুর, হোগরডাঙ্গা, সিংহঝুলি, জগদীশপুর, মির্জাপুর, ইছাপুর, কান্দি, আড়কান্দি, আন্দারকোটা, পাতিবিলা, রোস্তমপুর, সাদিপুর, দেবীপুর, টেঙ্গুরপুর, বেলেমাঠ, পাঁচনামনা, ধুলিয়ানী, পাশাপোল, চারাবাড়ী, খড়িঞ্চা, পুড়াপাড়া, কদমতলা, সলুয়া, পলুয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাঘুরে দেখা গেছে, চাষিরা অন্যান্য আবাদ বাদ দিয়ে গুরুত্ব সহকারে শীতকালীন আগাম সবজি চাষে মনোনিবেশ করেছেন। চাষিরা জানান, এসব সবজি শীতকালীন ফসল হলেও আর্থিক লাভবান হবার আশায় ঝুঁকি নিয়ে আগেভাগেই তারা এসব সবজির চাষ শুরু করেছেন। তবে এ বছর বৈরী আবহাওয়ার ফলে সবজি চাষে দারুণভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জমিতে বীজ ও চারা রোপন করলেও অতিবৃষ্টির ফলে তা প্রথমবার সব ন্ষ্ট হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার জমিতে আবার বীজ ও চারা রোপন করলেও খুব একটা ভাল হচ্ছে না। অনেক জমিতে পানি জমে সবজির চারা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে প্রতিনিয়ত জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে জমিতে সার ও আগাছা পরিস্কার করতে অতিরিক্ত লেবার খরচ হচ্ছে।

সবজি চাষি ইছাপুর গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, ‘নিজেদের অভিজ্ঞতায় সবজি চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছি।’ এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে শ শ ট্রাক বোঝাই করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বর্তমান বাজারে এক কেজি শিম ৪০/৫০ টাকা, বেগুন এক কেজি ৫০/৫৫ টাকা, মুলা ২০/২৫ টাকা, ঝাল ১শ/১শ ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। গরিবপুর গ্রামের শিম চাষি বদর আলী বলেন, আগাম সবজি চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। রোস্তমপুর গ্রামের শিম চাষী আবু সাঈদ জানান, ‘১০ কাঠা জমিতে রহিম (সাদা রং) ও রুপভান (লাল রং) জাতের শিম চাষ করেছি, ইতোমধ্যে শিম ওঠা শুরু হয়েছে। বাজারে শিম ৫০/৫৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ১০ কাঠা জমিতে শিম চাষ করতে ১০/১২ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে মৌসুমে ১০ কাঠায় শিম উৎপাদন হয় ৩০/ ৪০ মণ। গড় ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলে ১০ কাঠা জমিতে শিম চাষ করে ৭০/৮০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।’

বিশেষ করে উপজেলার পাতিবিলা, মাঠচাকলা, পেটভরা, হাজরাখানা, আন্দারকোটা, বেলেমাঠ, আজমতপুর, শাহাজাদপুর, কাবিলপুর, মনমতপুর, খড়িঞ্চা, জামলতা, সিংহঝুলী, তেতুলবেড়ে, সৈয়দপুর, কান্দি, মাড়–য়া জগদিশপুর, মির্জাপুর ও পৌর এলাকার ইছাপুর, বেলেমাঠ, পাচনামনা, বাকপাড়া, বিশ্বাসপাড়া গ্রামের মাঠে মাঠে ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজি চাষ করছেন চাষিরা। পাতিবিলা গ্রামের বেগুন চাষি পান্নু মিয়া জানান, ‘এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছি, ইতোমধ্যে বেগুন উঠতে শুরু করেছে। বর্তমানে বাজারে ৪০/৪৫ টাকা কেজি দরে বেগুন বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বালিরভাগ বেশি হবার কারণে এক সময় আমাদের মঠে কোন ফসল হতো না। ফলে সারা বছর শ শ বিঘা জমি পড়ে থাকত। যেখানে শীতকালে শিয়ালে গর্ত করে বসবাস করতো। এখন এখানকার জমিতে শীতকালীন সবজি সোনা ফলে। দশ বছর আগেও এখানে এক বিঘা জমির মূল্য ছিল খুব জোর ৮/১০ হাজার টাকা। এখন এক বিঘা জমির মূল্য ৫/৬ লাখ টাকা।’ বেলেমাঠ গ্রামের কৃষক আব্দুল মাজিদ জানান, ৩/৪ বছর আগে থেকে তাদের এলাকার কৃষকেরা নিজস্ব চিন্তা চেতনা থেকে আগাম শীতকালীন সবজি শিম, টমেটো, মুলা, করলা, ফুলকপি,লাউ, বাঁধাকপি, চাষ শুরু করেন। সময়মত কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেলে শীতকালীন সবজি আগাম চাষে আরো উন্নতি করা সম্ভব হতো।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম শাহাবুদ্দীন জানান, শীত মৌসুমের সবজি সাধারণত শীতের শুরুতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিখরা ও অতিবৃষ্টি এ চাষে বড় অন্তরায় হলেও ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তাছাড়া শীতের সবজি চাষ শেষ করে একই জমিতে আলু, ইরিঝাল, মিষ্টি কুমড়া ও তরমুজ চাষ করতে পারছেন চাষিরা। এতে জমির ব্যবহার বাড়ছে এবং চাষিরা লাভবান হচ্ছেন তাই এ এলাকার চাষিরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ঝুঁকে পড়েছেন।

তথ্যসূত্রঃ