আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০১৬   ||   ||   মোট পঠিত ১২৩ বার

মিশ্র পদ্ধতিতে যশোরে মেটে আলুর চাষে ঝুঁকছেন প্রান্তিক চাষিরা

মিশ্র পদ্ধতিতে যশোরে মেটে আলুর চাষে ঝুঁকছেন প্রান্তিক চাষিরাবাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদনে দেশের মধ্যে যশোর অন্যতম জেলা। নতুন নতুন প্রযুক্তি আর নতুন উদ্ভাবনী আধুনিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এ জেলার প্রান্তিক চাষিরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ফসল ও সবজি সফলভাবে উৎপাদন করে চলেছেন। আর এ উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় যশোরে মিশ্র পদ্ধতিতে (একইসাথে একাধিক সবজি চাষ) মেটে আলুর (গাছ আলু) চাষ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা ঝুঁকছেন এ চাষে। যশোরের চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলায় বিঘার পর বিঘা এবং মণিরামপুর, কেশবপুরের কিছু জমিতে এই আলুর ব্যাপক চাষ হচ্ছে।

যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর যশোরের আট উপজেলায় ১শ’৯৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছিল মেটে আলু। এ বছর তা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র চৌগাছা ও ঝিকরগাছাতেই এ আলু চাষ হয়েছে ১শ’৩০ হেক্টর জমিতে।

সরজমিনে ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নের শ্রীচন্দপুর, বালিয়া, আটলিয়া, গৌরসুটি এবং চৌগাছার জগদীশপুর, মির্জাপুর, তেঘরী, বিশ্বনাথপুর, স্বরুপদাহর বিভিন্ন মাঠে মেটে আলুর ব্যাপকভাবে চাষ হতে দেখা গেছে। যা পাঁচ-ছয় বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়।

সূত্রমতে, মাটির গুণাগুণের কারণে চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার প্রতিটি গ্রামের অধিকাংশ ক্ষেত সব ধরণের সবজি চাষের জন্য উপযোগী। এসব অঞ্চলের মাটি দোঁআশ ও বেলে-দোঁআশ হওয়ায় মেটে আলুর চাষ সব থেকে বেশি হয়। অন্যদিকে, আলুর জাতের সাথে মিলিয়ে মিশ্র পদ্ধতিতে অন্যান্য সবজিও ভালো হয়। সে ক্ষেত্রে প্রথম সবজির উৎপাদনে যে সার প্রয়োগ করা হয় তাতে আলু চাষে সারের চাহিদা মিটে যায়। ফলে খরচও কম হয়। এ কারণেই চাষিরা মিশ্র বা সাথী পদ্ধতিতে মেটে আলুর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আবার একই মাঁচায় রোলিং পদ্ধতিতে অর্থাৎ একটি ফসল উঠে গেলে সেখানে মেটে আলুর চাষও করছেন কেউ কেউ।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা উচ্ছে ও শিমের সাথে পতিত জমিতে একই মাঁচায় চাষ করছেন গাছ আলু। গ্রাম বাংলায় যাকে সবাই মেটে আলু বলে চেনেন। সে সময় মেটে আলুর উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য চলে আসে চাষিদের হাতে। ফলে এ সব অঞ্চলে দিন দিন মিশ্র পদ্ধতিতে চাষের চাহিদা বাড়ছে। কষ্ট ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লিজে জমি নিয়ে মহিলারাও বাণিজ্যিকভাবে নেমেছেন মেটে আলু চাষে।

শ্রীচন্দপুরের প্রান্তিক কৃষক আলী আহমেদ জানান, ‘মেটে আলুর জমিতে মিশ্র চাষ পদ্ধতি ছাড়াও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে (রোলিং) সবজির চাষ করা যায়। এই দুই পদ্ধতিতে যেখানে মেটে আলুর চাষ হচ্ছে সেখানে পটল, ঝিঙে, বেগুন, শশা জাতীয় সবজির চাষ করা যায়। এসব সবজির ফলন যখন কমতে শুরু করে তখনই মেটে আলু বিস্তার লাভ করে। ফলে খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এই সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন।’

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তির্ণ মাঠে মাঁচা করে মেটে আলুকে প্রধান এবং উচ্ছে ও শিমকে সাথী ফসল হিসাবে চাষ করা হচ্ছে। পদ্ধতির নাম না জানলেও একই মাঁচায় উচ্ছে ও মেটে আলু এবং শিমের চাষি রিফা বেগম (৪৫) জানেন তার প্রয়োগ ও ব্যবহার। তিনি জানান, তিনটি সবজি একই সাথে লাগানো হয়নি। উচ্ছে বোনার মাস দুয়েক পর মেটে আলু এবং আরো কয়েক মাস পর যখন আলু গাছ মরো মরো হবে তখন একই মাঁচায় উঠনো হবে শিম।’ তেমন কষ্টসাধ্য না থাকায় সংসারের সব কাজ চালিয়ে এক বিঘে জমিতে চাষ করেছেন মেটে আলু। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও করছেন বাড়তি আয়।

একই গ্রামের চাষি রহমত আলী জানান, ‘তার চাষের আট কাঠায় ‘জন’ বাবদ খরচ হয়েছে ১হাজার ৩শ’ টাকা। গোবর ও রাশিয়ান সার ও ইউরিয়া সার দিয়েছেন। প্রথম সবজি উচ্ছে উৎপাদনে সেঁচ দিতে হয়েছে। বান তৈরি ও আনুষঙ্গিক মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার টাকা। আর কোন খরচ নেই। এ পর্যন্ত বিক্রির টাকা যা পেয়েছেন তাতে খরচ উঠে এসেছে। ৮ কাঠা জমিতে একই বানে তোলা তিনটি ফসলে আর যা আসবে সবই তার লাভ। তার ধারণা, মোট আট মাসে লাভের পরিমাণ বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা হতে পারে।

চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক অভিন্ন সুরে বলেন, এ অঞ্চলের মাটিতে বালির মিশ্রণ বেশি থাকায় মেটে আলুর চাষ ভালো হয়।’ চাষি সুরুজ মিয়া জানান, ‘আবাহাওয়ার কারণে বর্তমান সময়ে মেটে আলুর চাষ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। ‘আলতা-পাত’, ‘বেনা ঝাড়’, ‘গাড়লতা’, ‘হরিণ শিংয়ে বা হরিণ পেলে’ জাতের মেটে আলু এখানকার জমিতে বেশি ফলন দেয়। তবে হরিণ পেলে ও আলতা-পাতের চাহিদা ক্রেতাদের কাছে বেশি হওয়ায় দাম ভালো পাওয়া যায়। এজন্য অধিকাংশ পতিত জমিতে চাষিরা এই জাত দুইটির বেশি আবাদ করেন।’ তিনি বলেন, সাথী ফসল হিসাবে ঝিঙেও চাষ করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘বাংলা মাসের শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে জমিতে আলুর বীজ বপন করা হয়। এর চার মাস পরই আলু সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া এই ফসল উৎপাদনে কোনো প্রকার সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। ফলে খরচ নেই বললেই চলে।’ পদ্ধতিটির পরিচিতি এজন্যই এতো বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

বেশ কয়েকজন চাষির সাথে কথা বলে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘা প্রতি জমিতে ৮০-১শ’২০ মন আলু উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি আলুর স্থানীয় বাজার দর ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক এমদাদ হোসেন শেখের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি আসলে কৃষকরা তা গ্রহণ করছেন। মিশ্র ও রোলিং পদ্ধতিতে এ বছর মেটে আলুর চাষ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে, মিশ্র পদ্ধতিতে একই মাঁচায় নূন্যতম দুইটি ফসলের চাষ সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে মেটে আলুর চাষে খরচ নেই বললেই চলে। নিড়ানী ও অন্যান্য খরচও কম। অন্যদিকে, চৌগাছা, ঝিকরগাছার মাটি মেটে আলুর জন্য খুবই উপযোগী। ফলে পর পর কয়েক বছর ফলন বেশি পেয়ে চাষিরা মেটে আলুর সাথে সাথী ফসলের চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বর্তমানে যে সব জাতের আলুর চাষ হচ্ছে তার থেকে আরও উন্নত জাতের আলুর বীজ সরবরাহ করা হবে বলে তিনি জানান।

তথ্যসূত্রঃ