আপডেট: জুন ১৯, ২০১৬   ||   ||   মোট পঠিত ১৫৭ বার

নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেই কোহিতুর

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পছন্দের আম কোহিতুর। কোহিতুর তাঁর এতই পচ্ছন্দ ছিল যে গ্রীষ্মকালের এই ফলটি তিনি শীতকালেও খেতেন। অভিনব কায়দায় বাংলার নবাব কোহিতুর সংরক্ষণ করে কনকনে শীতে সেই আম খেয়ে অন্তর জুড়াতেন। রাজকীয় মেহমানদেরও পাতে তুলে দিতেন কোহিতুর। পাকা আমের বোঁটায় মোম লাগিয়ে সেই আম মধু কিংবা ঘিয়ের পাত্রে ডুবিয়ে রাখা হতো। শীতের সময় এই আম মধুর ভেতর থেকে বের করে পানিতে ধুয়ে বাঁশের এক ধরনের ছুরি দিয়ে কেটে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর মন্ত্রী, উজির, নাজির সভাসদদের সঙ্গে বসে উৎসব করে খেতেন।


মোগল সম্রাট শাহজাহানের কোহিনূর সিংহাসন থেকে কোহিতুর আমের নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কোহিতুর মাঝারি আকারের আম। প্রতিটির ওজন ২০০-৩০০ গ্রাম। পাকা আমের ভেতরের রং হলুদ। আম খুব মিষ্টি। আঁশবিহীন মোলায়েম। আঁটি ছোট, খোসা একেবারে পাতলা। এই আম কাঁচা অবস্থায়ও মিষ্টি। যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম আরজু ও ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের বাড়িতে দুটি কোহিতুর আমগাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। মুর্শিদাবাদের নবাবদের বাগানেও কয়েকটি কোহিতুর আমের গাছ ছিল। এই জাতটি আসলে নবাব ও মোগল সম্রাটদের হাত ধরেই এ দেশে এসেছে। তবে খুব বেশি কোহিতুর আমের গাছ দেখা যায় না।


এই উপমহাদেশে (১৫৫৬-১৬০৫) শাসন আমলে মোগল সম্রাট আকবর ভারতের লাখবাগের দাঁড়ভাঙায় প্রথম এক লাখ চারা রোপণ করে উন্নত জাতের একটি আমবাগান গড়ে তোলেন। তাঁর বাগান থেকেই দাঁড়ভাঙা ল্যাংড়া বাংলাদেশে এসেছে। আকবরের এই আমপ্রীতির কারণেই রাজা বাদশা নবাবদের মধ্যে আম জনপ্রিয়তা পায়। আম দারগা নিয়োগ দিয়ে দূরদূরান্ত থেকে উন্নত জাতের আমগাছ ‘আটক’ করে নিয়ে এসেছেন। নবাব সুজাউদ্দৌলা বাংলা বিহার ওড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদে ‘আমখানা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে মীর জাফরের ছেলে মিরন চন্দনখোসা, লজ্জতবক্স, হুজুরপ্রসন্দ, মোলায়েমসহ প্রায় ১০০টি উন্নত জাতের আমগাছ সংগ্রহ করে সেগুলো রোপণ করেন। ট্র্যাজেডি হচ্ছে—এই আমবাগানেই বজ্রপাতে মারা যান মিরন। মুর্শিদাবাদের লালবাগে আজও নবাবদের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি কোহিতুর আমগাছ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা নবম বংশধর সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব বলেন, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা ফুল-ফলের বাগান খুব ভালোবাসতেন। তিনি বিদেশ থেকে অনেক ফুলের চারা এনে বাগান সৃষ্টির পাশাপাশি আমের উত্কর্ষ সাধনে কাজ করেছেন। উন্নত জাতের আমবাগান গড়ে তুলেছেন। নবাবের পচ্ছন্দের কোহিতুর আম আমাদের আবেগতাড়িত করে। আমরা পলাশীর আম্রকাননে ফিরে যাই। বাংলার শেষ নবাবের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই।’

তথ্যসূত্রঃ