আপডেট: এপ্রিল ২১, ২০১৪   ||   ||   মোট পঠিত ১৮২ বার

দুই উদ্যোক্তার সাফল্য:: এক খামারে তেলাপিয়ার আড়াই কোটি রেণু-পোনা উৎপাদন

যশোরের ইউনাইটেড অ্যাগ্রো একুয়াকালচার লিমিটেড চলতি মওসুমে তেলাপিয়ার প্রায় আড়াই কোটি রেণু-পোনা উৎপাদন করেছে। কয়েক বছরের বন্ধ্যাত্বের পর এবারই খামারটিতে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে।


নরওয়ের প্রযুক্তিনির্ভর এই খামারটির মূল মালিক আমেরিকান ইউনাইটেড একোয়া ফার্মস (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এই প্রতিষ্ ানটির কাছ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে লিজ নিয়ে যশোরের দুই উদ্যোক্তা আরএম মঞ্জুরুল আলম ও আজম খান টুলু খামারটি পরিচালনা করছেন। এই দুই বন্ধুর নিয়ন্ত্রণাধীন খামার এবারই প্রথম রেণু-পোনা উৎপাদন করছে। তাদের প্রত্যাশা, এই খামারের রেণু-পোনা চাষ করে কয়েক হাজার চাষী যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশে আমিষের চাহিদা পূরণেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।


আমেরিকান মালিকানাধীন ইউনাইটেড একোয়া ফার্মস ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম অত্যাধুনিক তেলাপিয়া হ্যাচারি স্থাপন করে চট্টগ্রামের পটিয়ায়। পর্যায়ক্রমে দেশের আরও তিনটি এলাকায় খামার স্থাপিত হয়; যার একটি যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাগদহ গ্রামে। ২৪ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ িত খামারটিতেই শুধু বিশ্ববিখ্যাত জেনোমার সুপ্রিম মনোসেক্স তেলাপিয়ার রেণু-পোনা উৎপাদিত হয়।


খামার ঘুরে দেখা গেছে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিষ্ ানটিতে। মা-মাছ থেকে ডিম সংগ্রহের পর তা ফোটানো হয়। এরপর সদ্যোজাত রেণু-পোনা ২১ দিন রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায়। এ সময়কালে হরমোন ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে মাছগুলোকে মনোসেক্সে রূপান্তরিত করা হয়। জেনোমার সুপ্রিম জাতের মনোসেক্স তেলাপিয়া উচ্চ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন, পরিবেশ-সহায়ক, দ্রুত ও সমবর্ধনশীল এবং সুস্বাদু। তাই বাজারে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। অন্য জাতের মনোসেক্স তেলাপিয়ার বাচ্চা যেখানে ২৫-৩০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে, জেনোমারের দাম সেখানে প্রতি পিচ ৮০ পয়সা।


যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রমজান আলী বলেন, ‘চলতি মওসুমে আমি খামারটিতে যাইনি। এর আগে গেছি। যতদূর জানি, অভয়নগর এলাকায় অত্যাধুনিক টেকনোলজির মাধ্যমে রেণু-পোনা উৎপাদন শুরু করে এই প্রতিষ্ ানটি। এখন এই টেকনোলজি বিস্তৃত হয়েছে।’


এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খামারটির যে অবস্থা আমি দেখেছি, তাতে আড়াই কোটি রেণু-পোনা উৎপাদন করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা আর টাকার জোগান।’


কথা হয় খামারটির দুই পার্টনার আরএম মঞ্জুরুল আলম ও আজম খান টুলুর সঙ্গে। তারা অকপটে স্বীকার করেন, এর আগে কখনও মৎস্য উৎপাদনের মতো কারবারের সঙ্গে এই দুই বন্ধু জড়িত ছিলেন না। কোনো প্রশিক্ষণও নেই। কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট সময় অন্তর খামারটি পরিদর্শনে আসেন। তারা প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেন। ফলে এই খামারে উৎপাদিত রেণু-পোনার প্রায় শতভাগই সুস্থ-সবল।


ম্যানেজিং পার্টনার মঞ্জুরুল আলম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘প্রথম বছরেই আমরা আশাতীত সফল হয়েছি। চলতি মওসুমে দেড় কোটি রেণু-পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি। প্রতিটি রেণু-পোনা বিক্রি হচ্ছে ৮০ পয়সা দামে। সবকিছু দেখে মূল কোম্পানি ইউনাইটেড একোয়া ফার্মস কর্তৃপক্ষ বেজায় খুশি।’


তিনি জানান, খামারটির রেণু উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ কোটি। কিন্তু তা লালন ও ট্রিটমেন্টের জন্য আরও জায়গা দরকার। সে কারণে আরও ১৪ বিঘা জমি লিজ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী মওসুমে খামারটির আয়তন হবে ৩৮ বিঘা। তখন বাস্তবিকই পাঁচ কোটি রেণু উৎপাদন করা সম্ভব হবে।


বৃহস্পতিবার বিকেলে খামারটিতে রেণু-পোনা কিনতে এসেছিলেন সাতক্ষীরার আবদুল হামিদ শিপন। তিনি সেদিন এক লাখ রেণু-পোনা কেনেন। প্রশ্নের জবাবে শিপন বলেন, ‘আমি ৫-৭ বছর ধরে জেনোমার জাতের রেণু-পোনা নিচ্ছি। প্রতিবছর ৩০-৫০ লাখ পোনা কিনি। এবার আশা করছি ৭০ লাখ পোনা কিনব।’


এতো পোনা কী করেন জানতে চাইলে শিপন বলেন, ‘আমার নিজের খামারে চাষ করা ছাড়াও ছোট ছোট খামারিদের কাছে পোনা বিক্রি করি।’


যশোরের শার্শা উপজেলার জাকির হোসেন মন্টু জানান, তিনি ২০০৭ সাল থেকে এই খামারের পোনা কেনেন। অন্যান্য হ্যাচারির রেণুর তুলনায় এই খামারের মাছ দ্রুত বাড়ে। এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। সে কারণে এই রেণু-পোনা চাষ করে চাষীরা লাভবান হয় বেশি।


ইউনাইটেড অ্যাগ্রো একুয়াকালচার খামারের পাশেই রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি খামার। ‘কিন্তু আমাদের রেণু-পোনা থাকা পর্যন্ত ওইসব খামারের পোনা বিক্রি হয় না’-বলেন, ইউনাইটেডের প্রোডাকশন ম্যানেজার খায়রুল আলম। তিনি দাবি করেন, মৎস্য উৎপাদনে এতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ অঞ্চলে আর নেই।


আশাতীত সাফল্য সত্ত্বেও খামারটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন- ইউনাইটেড অ্যাগ্রো একুয়াকালচার খামারে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক ফিডমিল। কিন্তু বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকায় এর মেশিনারিজ নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন মেশিনারিজ কিনতে প্রায় এক কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানান খামারের ম্যানেজিং পার্টনার আজম খান টুলু। তিনি বলেন, ‘শুধু মেশিনারিজ কিনলেই তো হবে না, কাঁচামালের জোগান দিতেও বিস্তর টাকা প্রয়োজন। ব্যবসায় উন্নতি করতে পারলে ফিডমিল পুনঃচালুর উদ্যোগ নেব।’


এ ছাড়া উইন্ডমিল থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বলেন, ‘যখন খামারটি স্থাপন করা হয়, তখন উইন্ডমিলটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার দ্রুত নেমে যাওয়ায় কয়েক বছর ধরে উইন্ডমিলটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় বিপাকে পড়তে হয়।’


ম্যানেজিং পার্টনার প্রথম বছরের সফলতায় খামারটিকে নিয়ে বড় ধরনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। মঞ্জুরুল আলম বললেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, ভারতে জেনোমার সুপ্রিম জাতের মনোসেক্স তেলাপিয়া রেণু-পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আগামী মওসুমে আমরা ওই দেশের আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেণু-পোনা রফতানির উদ্যোগ নেব।’

তথ্যসূত্রঃ