আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০১৫   ||   ||   মোট পঠিত ২৭৬১ বার

অন্তপ্রাণ শিক্ষক জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ

ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর :শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন ছাড়া শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। অর্থাৎ গুরু ও শিষ্যের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সাধন হয় না। শিক্ষার্থীদের খুব আপন করে নেয়ার মানসিকতাও থাকে না খুব বেশি শিক্ষকের। যারা সন্তান জ্ঞান করে পাঠদান করেন তারা সন্তানের মতো সম্মানও পান শিক্ষকদের কাছ থেকে। এমন উপলবদ্ধি থেকেই জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ কখনও অভিভাবক, কখনও বন্ধুর মতো ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশেছেন প্রাণ খুলে। তার স্বভাবসুলভ ব্যবহারে অতি আপন নির্ভরতায় জায়গা করে নিয়েছেন হাজারো শিক্ষার্থীর মণিকোঠায়। শিক্ষার্থীদের অন্তপ্রাণ এই মানুষটি ১৯৯১ সালের ২৫ মে যশোর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন। টানা প্রায় ২২ বছর তিনি ওই একই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি থেকে যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।


জন্ম ও শিক্ষা জীবন

জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ ১৯৬৫ সালের ১৯ মে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বাজারগ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জিএম ওকালত আলী ও কাজী দৌলতুন্নেছা আলী দম্পতির ৮ সন্তানের মধ্যে ৬ষ্ঠ তিনি। প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের স্কুলেই। এরপর কালিগঞ্জের বড় সিমলা-কারবালা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৪ সালে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি ও একই কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতক পাস করেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে বিপিএড ও ২০০০ সালে যশোর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড পাস করেন। বর্তমানে তিনি যশোর শহরের রেলগেট পশ্চিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গন

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহর পদচারণা ছাত্রজীবন থেকেই। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। অসংখ্য সংগঠনের সঙ্গে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সোচ্চার রয়েছেন। যশোরের প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন সুরবিতানের সদস্য ও নৃত্য বিতানের উপদেষ্টা, যশোর ইন্সটিটিউট, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, এফপিএবি, যশোর শিল্পকলা একাডেমির আজীবন সদস্য, ঢাকার মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীও ছিলেন। সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে তিনি আরও বেশকিছু কাজ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বৃক্ষরোপণ অভিযানকে আরও বেগবান করার জন্য তিনি প্রতিবছর স্কুলের শিক্ষার্থী ও গ্রামের মানুষের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করেন। শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য চালু করেছেন তার বাবা মায়ের নামে একটি ‘‘শিক্ষা সহায়তা প্রকল্প’’। প্রতিবছর ৪০ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হয়। নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন একটি লাইব্রেরি। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে বিভিন্ন রকমের বই সংগ্রহ করে পড়তে পারে। এছাড়াও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি জিলা স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে ১৯৯৬ সালে প্রথম স্মৃতি অ্যালবাম নামে ম্যাগাজিন বের করেন। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে জিলা স্কুল। পরবর্তীতে ২০১৩ সাল থেকে তিনি যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও চালু করেছেন স্মৃতি অ্যালবাম ম্যাগাজিন।

শিক্ষকতা

১৯৯১ সালের ২৫ মে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যশোর জিলা স্কুলে যোগদান করেন জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ। টানা প্রায় ২২ বছর ধরে জিলা স্কুলে চাকরি করেছেন। এরপর সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি হন। শিক্ষার্থীদের কাছে জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ভূগোল ও বাংলার শিক্ষক হিসেবে বেশি পরিচিত তিনি। শিক্ষকতা জীবনে তিনি কখনও কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট, টিউশনির সঙ্গে নিজেকে জড়াননি। তার নেতৃত্বে যশোর জিলা স্কুল বিভিন্ন সময়ে খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছে। জিলা স্কুল স্কাউটস, হ্যান্ডবল, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের কৃতিত্ব অর্জন করেছে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।

তার শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি কখনও পিতা, কখনও ভাই আবার কখনও বন্ধু হয়ে ওঠেন। তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শামসুল ইসলাম, ম্যাজিস্ট্রেট তারিক শামস্, স্কোয়াডন লিডার মারুফ হাসান, উইং কমান্ডার সালাউদ্দিন, মেজর আফিক হাসান, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাজিমুর রহমান, স্থপতি নিয়াজ হোসেন ও মারুফ হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন কুমার ধর, সহকারী পুলিশ সুপার শাহাবুদ্দিন, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় তুষার ইমরান, জাতীয় হ্যান্ডবল দলের খেলোয়াড় সোহেল, ইমরান, জাতীয় হকি দলের খেলোয়াড় আশিকুজ্জামান, ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুস সালাম, সৈয়দ শামসুদ্দীন, চিকিৎসক মোস্তফা আজিজ সুমন প্রমুখ।

পরিবারের কথা

১৯৯৪ সালের ২ ডিসেম্বর পারভীন আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ। স্ত্রী পারভীন আক্তার যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। দুই সন্তানের জনক তিনি। বড় মেয়ে ফাইরুজ ফারাহ এ বছর এইচএসসি পাস করেছে। আর ছেলে ইজাজ আবদুল্লাহ দশম শ্রেণির ছাত্র।

স্মৃতিচারণ

জিএম জুলফিকার আবদুল্লাহ শিক্ষকতা জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, চাকরি জীবনে আমি অসংখ্য ভালো সহকর্র্মীর সান্নিধ্যে পেয়েছি। তাদের দিকনির্দেশনা ও ভালোবাসা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। ছেলেমেয়েরা আমাকে আপন করে নিয়েছে। তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি। তিনি বলেন, সবচেয়ে খুশি হই তখন, যখন শুনি আমার ছাত্রছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার খুব পীড়া দেয় যখন শুনি আমার কোনো ছাত্রছাত্রী পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু আমাকে আরও বেশি ব্যথিত করে। শিক্ষার্থীদের আমি সন্তান মনে করি। প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী আমার রক্তের বিন্দুর মতো।

তথ্যসূত্রঃ Jugantor