আপডেট: জুন ২৩, ২০১৬   ||   ||   মোট পঠিত ২১০৫০ বার

সন্তানের জন্য ৪৩ বছর ধরে বারো মাস রোজা রাখেন এক মা

কাজল চৌধূরী, ঝিনাইদহ: সংসার আর ধন সম্পদ বলতে নিজের কিছুই নেই সুখিরণ নেছার। অভাব অনটনের জীবন তাঁর। না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে হাত পাতেন না সুখিরণ। দুঃখ কষ্ট তার নিত্য সঙ্গী। এতো অভাব আর দুঃখ কষ্টের মধ্যেও বারো মাস রোজা পালন করেন তিনি। এই রোজা রাখতে তাঁর কোন কষ্ট নেই। সন্তানের জন্য রোজা রাখি, তার আবার কষ্ট কিসের ? স্ফিত হেসে জবাব দিলেন ৬৯ বছরের বৃদ্ধা সুখিরণ ওরফে ভেজিরণ নেছা। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধুহাটী ইউনিয়নের বাজারগোপালপুর গ্রামের মৃত আবুল খায়েরের স্ত্রী বারো মাস রোজা রাখা এই বৃদ্ধা। গ্রামের প্রতিবেশি যুবক মঞ্জুর আলম জানান, পরের ক্ষেতে ঝাল, মুগ কলাই তুলে ও চানাচুর ফ্যক্টরিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন বৃদ্ধা সুখিরণ। সারাদিন রোজা রাখার পরও তিনি খাবারের জন্য কারো বাড়ি যান না। এই বৃদ্ধ বয়সে নিজের রোজগার নিজেই করেন। তিনি নিজেই এখনো ভাত রান্না করে খান। আরেক প্রতিবেশি মসলেম উদ্দীন জানান, যে সন্তানের জন্য তিনি ১২ মাস রোজা রাখেন, সেই সন্তানের কাছেও তিনি খাবারের জন্য যান না। ১২ মাস রোজা রাখা নিয়ে সুখিরণ নেছা স্মৃতিচারণ করে বলেন, তার বয়স যখন ২৬ বছর, তখন বড় ছেলে শহিদুল ইসলাম হারিয়ে যান। ধীর্ঘদিন খুজে ১১ বছর বয়সী শহিদুলকে কোথাও খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্তানের খোঁজে তার বাড়িতে প্রতিদিন ছাগল জবাই করে শিরনী দেওয়া হতো। ১৫ দিন ধরে ছাগল জবাই করে চলে শিরনী বিতরণের কাজ। বাজারগোপালপুর, মামুশিয়া ও চোরকোল গ্রামের মানুষ এই শিরণী খেতে তার বাড়ি আসতেন। সন্তানের জন্য ব্যকুল মা সুখিরণ নেছা পাগল হয়ে যান। তিনি মনস্থির করেন তার ছেলে ফিরে আসলে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য বারো মাস রোজা রাখবেন। গ্রামের মসজিদ ছুঁয়ে সুখিরণ নেছা প্রতিজ্ঞা করেন। দেড় মাস পর তার হারিয়ে যাওয়া সন্তান নিজ আঙ্গিনায় ফিরে এসে “মা” বলে ডাক দেন। সুখিরণ নেছা স্বস্তি ফিরে পান। তখন ছিল ১৯৭৫ সাল। তারপর থেকেই সুখিরণ নেছা স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ তপু মিয়ার পরামর্শে বারো বাস রোজা রাখা শুরু করেন। প্রতিবেশিরা জানান, ২১ বছর আগে সুখিরণ নেছার স্বামী আবুল খায়ের ইন্তেকাল করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তার সংসারে অভাব অনটন নেমে আসে। সচ্ছল সংসার ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। তিন ছলে ও তিন মেয়ে লালন পালন করতে মাঠের জমি ও ভিটেমাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয় সুখিরণ নেছা। ৬ ছেলে মেরে মধ্যে তিনজন প্রায় অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মানসিক প্রতিবন্ধির মতো আচরণ করতে থাকে। এখনো সেই রোগে মাঝে মধ্যেই সন্তানরা আক্রান্ত হন বলে জানান সুখিরণ নেছা। বছর খানেক আগে তার এক মেয়ে আরজিনা খাতুন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। প্রবিবেশি আত্তাপ হোসেন জানান, আমরা ছোট বেলা থেকেই দেখছি সুখিরণ নেছা ১২ মাস রোজা রাখেন। তিনি খুবই দরিদ্র এবং বসবাসের মতো তার কোন বাড়িঘর নেই। সাপ ব্যাঙ্গের সাথে ভাঙ্গাচোরা ঘরে বসবাস। এতো কষ্টের মধ্যেও তিনি রোজা ভাঙ্গেন না। বড় ছেলের অবস্থা ভাল না। কোন রকম তার সংসার চলে। যে ছেলের জন্য সুখিরণ নেছা ১২ মাস (৫ দিন ব্যতিত) রোজা রাখেন সেই বড় ছেলে শহিদুল ইসলাম জানান, আমার জন্য মা কষ্ট করে রোজা রাখেন। আমি রোজা রাখতে নিষেধ করলেও তিনি শোনেন না। অসুখ বিসুখ হলেও তিনি রোজা ভাঙ্গেন না। মায়ের এই অবদানের ঋন আমি কোন দিন শোধ করতো পারবো না। তিনি জানান, আমি যতটুকু পারি সহায়তা করি। তবে তিনি আমাদের মুখাপেক্ষি না। এলাকার ইউপি সদস্য ও মধুহাটী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যন তহুরুল ইসলাম জানান, বৃদ্ধা সুখিরণ ওরফে ভেজিরণ নেছার ১২ মাস রোজা পালনের কথা চিন্তা করে তাকে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তবে তার বাড়িঘর নেই। ঘরবাড়ি নির্মানের জন্য বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিৎ বলে প্যানেল চেয়ারম্যন তহুরুল ইসলাম মনে করেন।

তথ্যসূত্রঃ Daily Loksomaj