এদেশ ভালোবেসে
নরম্যান ডিবারজ ও টমাস ডিবারজ (বাম থেকে), ছবি: লেখক
নরম্যান ডিবারজ। নীল চোখ। প্রথম দেখাতেই মনে হবে বিদেশী সাহেব। মাঠে যখন তিনি ধান কাটেন তখন মনে হয় একজন বিদেশী মাঠে কাজ করছে। গ্রামের মানুষ ডিবারজকে চেনেন। কিন্তু বাইরের মানুষতো তাঁকে চেনে না। হ্যাঁ, নীল চোখ উচু লম্বা সাহেবী গোছের দেখতে নরম্যান ডিবারজ একজন ইংরেজের বংশধর। তাঁর পুর্ব পুরুষদের একজন নড়াইলে নীল চাষ করতে এসে বাংলার গ্রামকে ভালবেসে থেকে যান নড়াইল। তাঁর বংশধররা এখন মাঠে কাজ করেন। মজুরি দেন অন্যের ক্ষেতে। এটা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা।
ইংরেজ শাসনামলে নড়াইলে নীল চাষ শুরু হয়। ১৮৪০ সালে নড়াইলের লোহাগড়ায় নীলকর সিএমসি মুনয়ার ইতনায় প্রথম নীল কুঠি তৈরি করেন। বর্তমানে কুঠিটি মধুমতির ভাঙ্গনে শেষ হয়ে গেছে। ওই সময়ে নড়াইল সদরের নবগঙ্গার তীরে কুমারগঞ্জ নীল কুঠি ছিল। বর্তমানে ওই গ্রামের কোন অস্তিত্ব নেই। আর নীল কুঠিটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানটি এখন শংকরপুর মৌজায়। এখানে এক ইংরেজ নীল চাষ করতে এসে শংকরপুর গ্রামকে ভালোবেসে সেখানে থেকে যান। সাথে আরও কয়েক ইংরেজ। এ গ্রামের নীলকুঠি সংলগ্ন এলাকায় জমি কিনে তারা বসবাস শুরু করেন। তাদের বংশধররা এখনও এ গ্রামে বসবাস করছেন। তাদেরই একজন নরম্যান ডিবারজ। নিজস্ব খৃস্টধর্মীয় কৃষ্টি অক্ষুণ্ণ রাখলেও তারা সামাজিকভাবে মিশে গেছেন স্থানীয় লোকজন ও রীতি-নীতির সঙ্গে। গ্রামের আর দশজনের মতো তাদের অধিকাংশই এখন গায়ে খেটে চাষাবাদও করছেন। বনে গেছেন খাঁটি চাষী। তবে এলাকায় আজও তারা সাহেব নামেই পরিচিত। শংকরপুর গ্রামের যে পাড়াতে তারা বসবাস করেন সে পাড়া এখনও পরিচিত সাহেবপাড়া নামেই। সাহেবপাড়ার সাহেবরা এখন বাংলাদেশের ভোটার এবং মনে প্রানেখাঁটিবাঙালী।
নড়াইলের শংকরপুর গ্রামে স্থাপিত নীলকুঠি এবং সেখানকার নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচারের চিহ্ন অনেক আগেই নদী ভাঙনে নবগঙ্গার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে বাঙালির ওপর ব্রিটিশ অত্যাচারের একামাত্র প্রতিবাদকারী জন ডিবারজের উত্তরসূরিরা। এসব উত্তরসূরি ও আশপাশের বয়স্ক লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নড়াইল জেলার (তৎকালীন নড়াইল মহাকুমা) বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি শংকরপুর গ্রামে ১৮৪০ সালে নীলকুঠি স্থাপন করে জোরপূর্বক স্থানীয় কৃষকদের দিয়ে নীল চাষ শুরু করে। ফ্রান্সের নাগরিক আর্থার ডিবারজ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার কন্যাকে বিয়ে করে শ্বশুরের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনিতে চাকরি নিয়ে শংকরপুর গ্রামের নীলকুঠিটির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে শংকরপুর গ্রামে আসেন আরও কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক। আর্থার ডিবারজ সস্ত্রীক নীলকুঠিতে বসবাস শুরু করেন। এখানেই জন্ম হয় তাদের একমাত্র সন্তান জন ডিবারজের। ডানপিঠে জনের লেখাপড়ার প্রতি তেমন মনোযোগ ছিল না। পারিবারিক অনুশাসন ভেঙে তিনি বাঙালি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশতেন ও হেসে খেলে বেড়াতেন। এসব থেকে বিরত রাখতে না পেরে এক পর্যায়ে তাকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে মন টেকেনি জন ডিবারজের। শিক্ষাজীবন শেষ না করেই তিনি ফিরে আসেন শংকরপুরে। বাবার অনুরোধ সত্তে¡ও জন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করতে রাজি হননি। বরং তিনি বাঙালির ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্মম নির্যাতনের বিরোধিতা করতেন। একপর্যায়ে একমাত্র সন্তানের বাঙালি প্রীতির কাছে হার মেনে যান নীলকুঠি ম্যানেজার আর্থার ডিবারজ। এরপর বন্ধ হয় নির্যাতন। আর্থার ডিবারজও নবগঙ্গা পাড়ের শংকরপুর গ্রামের লোকজনকে ভালোবাসতে শুরু করেন এবং কুঠি সংলগ্ন প্রায় ১০০ বিঘা জায়গাও কেনেন নিজের টাকায়। আর্থার ডিবারজের মৃত্যুর পর জন ডিবারজ মাকে নিয়ে বাবার কেনা জমিতে ঘর বেঁধে বসবাস শুরু করেন। বিয়ে করেন এ দেশেই মংলা বন্দর এলাকায় এক বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারে। তার ছিল ২ পুত্র ও ২ কন্যা। বড় পুত্র ম্যালকম ডিবারজ এবং ছোট পুত্র মাইকেল ডিবারজ। দু’মেয়ের মধ্যে জুল রেনাল্ড বিয়ে করে ইংল্যান্ডে এবং অনরেনাল্ড স্বামীর সঙ্গে ভারতের বিহারে বসবাস শুরু করেন। ম্যালকম ডিবারজ ভারতে গিয়ে বিভিন্ন যাত্রাদলে অভিনয় শুরু করলেও পরে তিনি খুলনায় এক মিশনারী প্রেসে কাজ শুরুর কিছুদিন পর আততায়ীদের হাতে খুন হন। অপর দিকে মাইকেল ডিবারজের তিন পুত্র নরম্যান ডিবারজ, টমাস ডিবারজ ও আন্তন ডিবারজ সবাই খুলনায় খ্রিস্টান পরিবারে বিয়ে করেন। তারা এবং তাদের পরিবার এখন শংকপুরে বসবাস করছেন। নরম্যান ডিবারজের বড় মেয়ে বিউটি নিজ পছন্দে বিয়ে করেন নড়াইলের এক মুসলমান পরিবারের ছেলেকে। তিনি পেশায় নার্স ছিলেন। প্রায় দু’বছর আগে তিনি অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় কন্যা লাভলীও (২৮) পেশায় নার্স। অন্য দু’মেয়ে অস্র (২০) ও সুইট (১৮) পড়াশোনায় মনোযোগী না হওয়ায় তারা স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। এ তিন বোন এখনও অবিবাহিত রয়েছেন। একমাত্র পুত্র হ্যানিমন ডিবারজ (২৬) ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। টমাস ডিবারজের বড় মেয়ে বড়ু ডিবারজের (২৫) কলেজে পড়া অবস্থায় দু’বছর আগে বিয়ে হয়েছে বরিশালে এক খ্রিস্টান পরিবারে। ছোট মেয়ে রজনী ডিবারজ (১৮) কলেজে পড়েন। আন্তন ডিবারজ প্রায় ১০ বছর আগে সাপের কামড়ে মারা যান। তার মেয়ে আশা (১৬) ও ছেলে আশীষ (১৪) পড়াশোনা করছে। নরম্যান ডিবারজ (৭০) জানান, পূর্বপুরুষদের অনেক ভ‚-সম্পত্তি থাকলেও পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যরা জমিজমার বেশিরভাগই বিক্রি করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, ২০/২৫ বছর আগেও ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত তাদের বংশধর ও আত্মীয়-স্বজনরা তাদের কাছে বড়দিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কার্ড পাঠাতেন। তারা এখন আর তাদের কোন খোঁজ-খবর রাখেন না। এখন তারা এদেশের মানুষ। এদেশকে তারা প্রাণের চেয়ে ভাল বাসেন। এদেশ ছেড়ে আরও কোথাও যেতে তাদের ইচ্ছা লাগে না।