নক্সীকাঁথার গ্রাম
নক্সীকাঁথা
নাম তার পান্থাপাড়া, নক্সীকাঁথার গ্রাম। যশোর থেকে পাকা সড়ক পথে প্রায় ১৫ কি.মি এগোনোর পর খাজুরা বাজার। বাজার ছাড়িয়ে কিছুদুর পরই লোকালয়। সড়কের পাশে সবজী ক্ষেত। ইটের ভাটা। পিছনে গ্রাম। পাকা সড়ক থেকে ধুলিমাখা পথে চলে গেছে পান্থপাড়ায়। আধা কি:মি: এগোনের পর গ্রামের সূচনা। ছায়া ঢাকা গ্রাম। প্রবীণ আমগাছ এখনো গ্রামের ঐতিহ্যের অস্তিত্বকে প্রকাশ করছে।
গ্রামে প্রবেশ করলেই এক অভিনব দৃশ্য চোখে পড়বে। আম রঙের ছায়ায় পাটি পেতে গ্রামের গৃহবধূরা কাঁথা সেলাই করছে। ছোট-ছোট ন্যাংটো শিশুরা মায়ের সূচি কর্মের পাশে আপন ইচ্ছায় খেলছে। কিংবা, গৃহস্তের বাড়ির লাউয়ের মাচার নিচে চলছে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। আর রেডিওতে ভেসে আসছে কোন গানের সুর। কোলের শিশুরা মুখ লুকিয়ে মায়ের কাঁথা সেলাইয়ের ফাঁকে দুধ খাচ্ছে। যশোর বাঘারপাড়া থানার পান্থপাড়া গ্রামের এই দৃশ্য কি শীত, কী গ্রীস্ম সব সময়ের। ছোট গ্রাম দুইশত পরিবার এই গ্রামে বসবাস করে। বেশির ভাগ মানুষের পেশা কৃষি। গ্রামে শিক্ষিতের হার খুবই কম। শতকরা ৯০শতাংশ লোক দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। পান্থপাড়া গ্রামের গৃহবধূ, কিশোরী,বিধবা, স্বামীপরিত্যক্তা এমন শতাধিক মহিলা নক্সীকাঁথা সেলাই কাজকে নিজেদের পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে। নানা রকম বাহারী কাঁথা সেলাই করে এই মহিলারা নিজেদের দীনতাকে হটিয়ে সামনের দিকে এগোবার চেষ্টা করছে। তারাও রঙীন নক্সী কাঁথার মতো ফুল তোলে, রঙীন স্বপ্ন দেখে। আর গুন গুন করে গান গায়। ফোঁড় তোলে।
বছর কয়েক আগে গ্রামের চেহারা ভিন্ন ছিল। মুখের কথায় গৃহবধূর তালাক হয়ে যেতো। কৃষি জমি বেশিরভাগ পরিবারে না থাকায় সব সময়ই দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে হতো। মহিলারা কাজ করলে পাপ হবে। তাদের ভিতরের কষ্ট জানার চেষ্টা করেন। আয়োজন করেন ২০ দিনের সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। পর্যয়ক্রমে অন্য মহিলারাও এগিয়ে আসে। তারাও শিখে নেয় কাঁথা তৈরীর কলাকৌশল। এরপর থেকে দিশার তত্মাবধায়নে গ্রামের মহিলারা কাঁথা তৈরী করছে। দিশা কাপড়, সুতো সরবরাহ করে। তা দিয়ে মহিলারা কাঁথা সেলাই করে দেয়। এই কাঁথা যশোর, ঢাকায় বিক্রি হয়। কেউ কেউ দিশা থেকে কাঁথা কিনে বিদেশে আত্মীয় স্বজনদের পা ায়। পান্থপাড়ার নক্সীকাঁথা কৃষক বধূর হাত থেকে নানা মাধ্যমে পৌছে যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। সেখানকার ভদ্রলোকেরা এই কাঁথা দেখে বাংলাদেশেকে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মহিলাদের শিল্পবোধকে জানবার চেষ্ া করেন।

নক্সীকাঁথার ভিতরের খবর
নক্সীকাঁথা তৈরীর জন্য প্রয়োজন কাপড় আর সুতা। সাধারণ মার্কিন, লাল শালু, কিংবা কালো কাপড় ব্যবহার করা হয়। এই তিন রঙের কাঁথার কদর বেশি। সূতি এসব কাপড়ের ভেতরে অন্য কাপড় দিয়ে কাঁথা পাতা হয়। কাঁথা পাতার পর নির্দিষ্ট শিল্পীরা কাঁথার উপর নক্সা আঁকে। হাতি, ময়ূর, পালকী এই তিন নামের নক্সার কাঁথাই বেশি দেখা যায়। নক্সা আঁকার পর সেলাই কাজ শুরু হয়। চার থেকে ছয়জন মহিলা এক সঙ্গে বসে কাঁথা সেলাই করে। বড় পাঁচ হাত সাত হাত কাঁথা সেলাই করতে প্রতিদিন গড়ে ছয় ঘন্টা শ্রম দিলেও সময় লাগে ২০ দিন থেকে এক মাস। স্পেশাল কাঁথা তৈরীতে আরো সময়ের প্রয়োজন।
কাঁথার জন্য বিদেশ থেকে আমদানীকৃত স্লিকি পেটি সুতো ব্যবহার করা হয়। বাজারে নানা রঙের স্লিকি সুতো কিনতে পাওয়া যায়। কাঁথার মুজুরী দেওয়া হয় প্রতিটির জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। কাপড়, আঁকা, সেলাই, সুতো সব মিলিয়ে একটি বড় কাঁথা তৈরি খরচ পড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা। বাজারে এ কাঁথার মূল্য ৪ হাজার থেকে বিভিন্ন দামে বিক্রি করা হয়। তবে কম দামে কাঁথাও কিনতে পাওয়া যায়। সে কাঁথায় কারুকার্য কম থাকে। এখন বেশি মূল্যের কারণে বড় নক্সার আদলে ছোট কাঁথা তৈরি কারা হচ্ছে। এসব কাঁথা অবশ্য শোপিচ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

নক্সীকাঁথার একাল সেকাল
যশোর অঞ্চলের নক্সী কাঁথার অতীত এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ৫০০/৭০০ বছর আগে থেকেই এ জনপদের মানুষ শীত নিবারণের জন্য নক্সীকাঁথা ব্যবহার করতো। গৃহবধূদের হাতে তৈরী এই নক্সীকাঁথার কদর ছিল বিদেশেও। সেই সময় তুলো থেকে তৈরি করা সুতো দিয়েই নক্সী কাঁথার আলপনা, ছবি আঁকা হতো। এই সুতো তৈরির পর পর নক্সী কাঁথার পুরো বিষয়ের মধ্যে জড়িত ছিল গৃহবধূদের শিল্পী সত্ত্বার যাবতীয় প্রকাশ। এ ছাড়া পুরাতন ব্যবহৃত শাড়ির পাড়ের সুতো তুলে সেই সুতো দিয়ে তৈরি করা হতো নক্সীকাঁথার। যার চল কোথাও কোথাও এখনো আছে। সতীশচন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, পা ান আমলেই যশোর বস্ত্র শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল। উৎকৃষ্ট তুলা উৎপাদনের কারণে এই সমৃদ্ধি অর্জন সহজ হয়। তাতে দেখা যায় ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ এই সময়ে প্রায় ৭০০ বছর আগেও এই জনপদের বস্ত্র একটি পৃথক স্থান দখল করে নিয়েছিলো। সতীশচন্দ্র মিত্র আরো লিখেছেন, স্ত্রী লোকেরা কাঁথা সেলাই ও সিকা প্রস্তুত করিয়া অন্য দেশকে পরাজয় করত যশোলভ করিতেন। তার এই লেখায় প্রমাণিত হয় শত শত বছর আগেও যশোর এলাকায় মহিলাদের হাতে তৈরি নক্সী কাঁথা দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করিয়া করে ছিল। যা আজো অব্যাহত রয়েছে। সেকালে মহিলাদের কাছে এ প্রসঙ্গে জানা যায়, গ্রামের গৃহস্থ এমনকি শহুরে বাবুদের পরিবারের মহিলা সদস্যরা নক্সী কাঁথা তৈরি করতেন। এই নক্সী কাঁথায় ফুটে উ তো পারিবারিক আভিজাত্য। সেই সময় পাড়ের সুতো, বিলেতি সুতো দিয়ে মহিলারা মন থেকে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ফুল, সাপ, খেলার দৃশ্য ছাড়াও গ্রামীণ নানা চিত্র কাঁথায় ফুটিয়ে তুলতো। সাধারণত এসব কাঁথা উৎসব অনুষ্ ান কিংবা বাড়িতে মেহমান এলে বাক্স থেকে বের করা হতো। তবে সে সময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাঁথা তৈরির কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না।
এরপর দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে কাঁথার নির্মাণ শৈলীতেও কিছু পরিবর্তন আসে। ষাটের দশকে পাকিস্থানী আমলে যশোর অঞ্চলের সেলাই কাজের এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। যশোরের প্রগতিশীল এক মহিলা আয়েশা সর্দার এই কাজের মূল রূপকার। ১৯৫৫ সালে যশোরের পুরাতন কসবা এলাকায় বেগম আয়েশা সর্দার ‘যশোর মহিলা শিল্প বিদ্যালয় সমাজকল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সেলাইয়ের স্কুল খোলেন। আর একই এলাকার স্কুল শিক্ষিকা মোহসেন আরা চৌধুরী এই স্কুলের দায়িত্ব নিয়ে, ‘যশোর স্ট্রিচ’ নক্সীকাঁথার সূচ শিল্পকে ঘরে-ঘরে পৌছে দেন।
মোহাসেনা আরা চৌধুরীর সঙ্গে তিনি বললেন, ১৯৫৭ সালে লেখাপড়া শেষে আয়েশা সর্দারের আহ্বানে সেলাই স্কুলের দায়িত্ব নেই। আমাদের এলাকাতেই শান্তিপুরের কিছু মহিলা বসবাস করতো। একদিন এক বিধবা মহিলা তার সমস্যা নিয়ে আয়েশা আপার কাছে আসেন। তিনি কাজ করতে চায়, সংসার চালাবার জন্য।
তামেজা খাতুন নামে এই বিধবা মহিলা জানায় সে রিপু কাজ জানে। তখন সেই শাল রিপুর ওপর ভরসা রেখে রিপুর প্যাটার্নে লতা পাতা ফুল তোলার কাজ শুরু হয়। পাকিস্থানী ডিএমসি সুতো দিয়ে সিদ্ধিপাশা থানের ওপর নক্সী কাঁথা, ডাইনিং কাভার সেট, বেড কাভার ছাড়াও শাড়িতে ফুল তোলার কাজে এক নতুন ধারার সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে ৫০০ মহিলা। তখন ফ্রেমে কোনো কাজ হতো না। হাঁটুর ওপর রেখে ফুল তোলা হতো। আয়েশা সর্দার, মিসেস আসিয় এন খোদা, সালেমা খাতুন, বিজলী বিশ্বাস এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের সেলাই স্কুলের নাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। খোলা হয় দর্জি বিভাগ, তাঁত বিভাগ। আমাদের তৈরী পণ্য বিক্রির জন্য আয়েশা আপা ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে যেতেন। ডিসি, এসপি সাহেবের স্ত্রীরা পণ্যের প্রশংসা করে কিনে নিতেন। প্রদর্শনীতে আমাদের স্কুলের নক্সী কাজ সব সময়ই প্রথম স্থান অধিকার করতো। ১৯৭১ সালের পর আমি পুরোপুরিভাবে সেলাই স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এরপর ১৯৯০ সালের দিকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে প্রতিষ্ ানটি বন্ধ হয়ে যায়। মোহসেনা আরা চৌধুরী ডলি আপার এখন বয়স হয়েছে। কিন্তু এখনো তিনি মাঝে মাঝে ফুল তোলেন। অদ্ভূত সেসব সব সূচ শিল্প। ডলি আপা সেলাই কাজের স্মৃতিচারণ করে বললেন, মাধবী লতা, গোলাপ বাগান এসব ডিজাইনের শোভা কোনো দিনই স্মৃতি থেকে মোছা যাবে না। মূলত এই সেলাই অঞ্চলটির কারণেই বাণিজ্যিকভাবে নক্সী কাঁথা তৈরির কাজ বাড়ি বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আশির দশকে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ ান তাদের ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি গ্রামের মহিলাদের নক্সী কাঁথা সহ অন্যান্য সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে নক্সী কাঁথা তৈরি করে দেশ-বিদেশে বাজারজাত করা শুরু করে। বাঁচতে শেখা, জাগরণী চক্র, আর.আর.সি, ব্রাক, দিশা ছাড়াও এমন অনেক এনজিওর অধীন এখন যশোর জেলার বিভিন্ন গ্রামের কমপক্ষে ১ লক্ষ মহিলা সেলাই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য লড়ছে।
পান্থপাড়া, মনুরাপুর সহ যশোরে বাঘারপাড়া ও সদর থানার মহিলাদের দিয়ে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করায় দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থা। এই সংস্থার পরিচালক রাহিমা সুলতানা আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে যশোর উপশহর এলাকায় নিজের বাসায় সেলাইয়ের স্কুল খুলে মহিলাদের দিয়ে নক্সী কাঁথা তৈরির কাজ শুরু করেন। নক্সী কাঁথার সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে রাহিমা খাতুন বলেন, যশোরের কাঁথার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বাজারজাত করা হল মূল সমস্যা। ঢাকা আর যশোর ছাড়া কোথাও বিক্রি হয় না। ঢাকার দোকানীরা বাকিতে কিনতে চায়। আমাদের পক্ষে বিদেশে কাঁথা পা ানো সম্ভব নয়। বিদেশে কাঁথা রপ্তানীত সরকারী ভাবে কোনো সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় না। হাজার হাজার মহিলা কাঁথা সেলই কাজে যুক্ত থেকে নিজেদের পায়ে দাড়ানোর চেষ্টা করছে। কাজেই এদের কথা বিবেচনা করে আমাদের উৎপাদিত কাঁথা বিদেশে পা ানোর ব্যবস্থা করা হলে আমরা এই দরিদ্র মহিলাদের পারিশ্রমিক বাড়াতে পারবো। আমারাও লাভবান হবো।