অটোমোবাইল
যশোরে তৈরি বাসের বডি
যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলের সামনে দিয়েদক্ষিণ দিকে এগোলেই বকচর এলাকা। এখান দিয়ে চলে গেছে যশোর-খুলনা রোড। এখানকারশাহিনওয়েল্ডিং-এ কাজ করছেন ২৫/২৬ জনশ্রমিক। পাশের রাস্তা দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলছে রংবেরঙের নামিদামি অসংখ্যযানবাহন। কিন্তু সে দিকে ভ্রুক্ষেপ কারো। কারো হাতে হাতুড়ি, কেউ ব্যস্ত ছেনি নিয়ে,কেউ বা ওয়েল্ডিং-এ। কারখানার দুপাশে পড়ে রয়েছে বিশাল আকারের একপি বাস ও ট্রাকেরবডি স্ট্রাকচার।ও দুটির জন্য কাজ করছেনতারা।, বললেন পার্টির তাগাদা আছে, বডি দুটি দ্রুত তৈরি করে দিতে হবে। তাই সবাই কাজনিয়ে ব্যস্ত। এ দুটি শেষ করার পর আরও দুটি বডি তৈরির কাজে হাত দিতে হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু শাহিন ওয়াল্ডিংনয়, যশোরে এ ধরনের ছোট-বড় অন্তত দেড় হাজার অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে বর্তমানেবাস-ট্রাকের বডি তৈরি হচ্ছে। যশোরের অভিজ্ঞ মিস্ত্রিরাতৈরি করছেন বিদেশের আদলে অত্যাধুনিক হিনো, ভলভোও আরএম-টু বাসের বডি। যা বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভাব হবে।

শুরুর কথা:

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্থান আমলেরশুরুতে যশোরে বাস ট্রাক চলাচলের প্রসার শুরু হয়। অবাঙ্গালীরা শহরেরমিস্ত্রিখানা রোডে ছোট্ট পরিসরে মোটর গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ গড়ে তোলে। সেইথেকে শুরু। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর সড়ক পরিবহনে যশোরের গুরুত্ব বেড়ে যায়। বাস, ট্রাক, মাইক্রো, কারসহ নানান যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যশোরসড়ক পরিবহনের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। সে সাথে গাড়ি মেরামতেরজন্য গ্যারেজের চাহিদাও বেড়ে যায়। গড়ে উ তে থাকে নতুন নতুন মোটর গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ।৯০ দশকের প্রথম দিক থেকে যশোরে অটোমোবাইল ব্যবসা শুরু হয়। ৮০-র দশকের কিকেবাংলাদেশে হিনো গাড়ির আমদানি শুরু হলে অটোমোবাইল ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। তখনশুধু ঢাকাতেই বডি তৈরি হতো। ঢাকার ড্যান্সো ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংপ্রথম পর্যায়ে বডি তৈরীর কাজ শুরু করে। পরে নাভানা মোটরসও গাড়ির বডি তৈরিতে হাতদেয়। পরবর্তীকালে ভারত থেকে টাটা এবং অশোকলেন্যান্ড গাড়ি আমদানি শুরু হলে দেশে বডিতৈরির বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়। আর এই ৯০ দশকের শুরুতে আব্দুল মান্নান নামে একঅটোমোবাইল শ্রমিক যশোরে গাড়ির তৈরি শুরু করেন। সেই থেকে শুরু। আব্দুল মান্নানেরদেখাদেখি আস্তে আস্তে এপেশায় আসেনজাহাঙ্গীর আলম, শাহিন কবির, সিরাজ বাবু, কামাল হোসেন, মনোরঞ্জন প্রমুখ।

বর্তমানে যশোরে ওয়ার্কশপ মালিক সমিতিররেজিস্ট্রেশনকৃত ওয়ার্কশপের সংখ্যা ৮’শহলেও জেলা ও উপজেলা মিলিয়ে ওয়ার্কশপের সংখ্যা প্রায় হাজার দেড়েক হবে।এবং অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ এর সঙ্গে জড়িত।

দেশে যে পরিমাণ গাড়ির বডি তৈরি হয় তার বড়একটি অংশ হয় যশোরেই। এখানে তৈরি বডির মান ভালো এবং খরচ কম হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সহবিভিন্ন শহর থেকে গাড়ির মালিকরা যশোরেই আসেন বডি করতে। এখানকার প্রতিষ্ ান গুলোতেবর্তমানে প্রতি মাসে একশ বাস এবং দেড়শ ট্রাকের বডি তৈরি হচ্ছে। এর পরিমাণ প্রতিবছরে গড়ে ১২ শ বাস এবং ১৮শ ট্রাক। তাতে লেনদেন হয় অন্তত ৩শ কোটি টাকা।

দরদাম:

যশোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতি থেকেজানা যায়, যশোরের তৈরি বডি দেশের সেরা। এ জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল সহদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মালিকরা এখানে আসেন। অন্যান্য জেলার তুলনায় কম খরচে এখানেকাজ হয়। ঢাকায় যেকোন ওয়ার্কশপে একটি হিনো গাড়ির বডি তৈরি করতে খরচ হয় ১৩ লাখ টাকা।অথচ যশোরে তা সম্ভব ৮ লাখ টাকায়। একই ভাবে ১৫১২ মডেলের একটি গাড়ির বডি করতে ঢাকাতেনেওয়া হয় সর্বনিম্ন ১২ লাখ টাকা। যশোরে তা করে দেওয়া হচ্ছে ৭ লাখ টাকায়। একটি মিনিবাসের বডি করতে ঢাকায় খরচ হয় ৮ লাখ টাকা। যশোর তা করা সম্ভব ৫ লাখ টাকায়। এবাবেট্রাকের বডি করতেঢাকায় ৪ লাখ টাকা নেওয়াহলেও যশোরের মালিকরা তা করে দিচ্ছেন ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। ঢাকায় কাভার্ড ভ্যানেরএকটি বডি করতে নেয় ৫ লাখ টাকা যশোরে তা করা হচ্ছে মাত্র ৩ লাখ টাকায়। খরচ অনেক কম,সেই সঙ্গে উন্নতমানের বডি পাওয়ায় অনেকেই ছুটে আসেন যশোরে।

মালয়েশিয়া থেকে একটি মার্সেডিজ বেঞ্চেরবডি আনতে খরচ হয় দেড় কোটি টাকা। তা যশোরে এক কোটি টাকাতে করাসম্ভব। এজন্য শুধু প্রয়োজন সুযোগ। আরো জানা যায় এক কোটি টাকা হলে একটি হেলিকাপ্টারবডি বানিয়ে দেওয়া সম্ভব।

যশোরে শুধু বাস-ট্রাকের বডি নয়, দীর্ঘদিনধরে রি-মডেলিং এর কাজ হচ্ছে। যেসব গাড়ির বডি নষ্ট হয়ে গেছে তাদির মালিকরা গাড়িরি-মডেলিং করে আবার স্বচ্ছন্দে ব্যভহার করছেন। চমৎকার ফিনিশিংয়ের কারণে সারাদেশেইযশোরের তৈরি বডির কদর রয়েছে।

আরো যেসব কাজ হচ্ছে:
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধুবডি নয়, যশোরের ওয়ার্কশপগুলোতে ট্রাকের কেবিন, ডালাসহ ডেন্টিং এবং পেইন্টিংয়েরকাজও হয়ে থাকে। এছাড়া এখানকার লেদ গুলোতে, ডবেনসোল, ফরেন এক্সেল, নাকাল, হপস্,চাকার ড্রাম, কাটিং সেপ, তেল ক্রাউন, ইঞ্জিন পুলি, আইডিয়াল পেনিয়াম, স্টারিং বক্স,স্টারিং হুইল, পাতির সেটের বুশ, ফ্রাই বেল্ট, পেশার প্লেট, হাউজিং, গিয়ারবক্স,ক্লাস প্লেট, ড্রাম, এক্সেল, রিং, হুইসিলিন্ডার, মাস্টার সিলিন্ডার, ক্লাসকনেকটিং, ক্লাস কানেকটিং, বাইসেক্টর প্রভৃতির কাজও দেশসেরা। এ জন্য সারা বছরএখানকার শ্রমিকরা ব্যস্ত থাকেন।