অরুনিমা ইকো পার্ক, নড়াইল
অনুরিমা ইকো পার্ক
ফখরে আলম

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পানিপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় একটি ইকো পার্ক। অরুণিমা কান্ট্রি সাইড তার নাম। এখানে গাছের ছায়ায়, পাখির গান শুনতে শুনতে, জলের ধারে অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায় অনেকটা সময়। আবহমান গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ আর আধুনিকতার সুপরিকল্পিত সমন্বয় ঘটানো হয়েছে এখানে। ব্যস্ত শহুরে জীবনের বাইরে এসে বুক ভরে একটু নিঃশ্বাস নেয়ার এমন সুযোগ এ দেশে খুব বেশি নেই। ইচ্ছা থাকলে এ দেশের অবহেলিত পাড়া-গায়েও সৃষ্টি করা যায় মনের মাধুরী মেশানো কোনো স্বপ্নপুরি।

গ্রামের নাম পানিপাড়া। অন্ধকার গ্রাম। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার পিছিয়ে পড়া গ্রাম। পল্লী বিদ্যুৎ আছে ঠিকই কিন্তু প্রায় সময় গ্রাম অন্ধকারে ডুবে থাকে। ঝিঝি ডাকে। হুক্কা হুয়া করে ছুটে যায় চতুর শিয়াল। পিচ ঢালা পথ, ইট বিছানো পথ, কাচা মেঠো পথ ছুরির মতো একেবেকে এক পর্যায়ে বিলের কোলে হারিয়েছে। নড়াইল সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার সবুজে আচ্ছাদিত ওই পথ পাড়ি দিয়ে কালিয়া উপজেলার পানিপাড়া গ্রাম। বাংলাদেশের হাজার গ্রামের মতোই সাধারণ একটি গ্রাম। কিন্তু পানিপাড়া গ্রাম এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে নিজেই ইতিহাস হয়েছে। অন্ধকার হটিয়ে দিয়ে আলোর ঝরনায় স্থান করে ফর্সা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া সম্পদ বুকে আগলে রেখে ভেতরে ভেতরে ঠিকই সমৃদ্ধ ছিল পানিপাড়া। এ গ্রাম এখন ভিন্ন পৃথিবী। এ পৃথিবীর নাম অরুণিমা কান্ট্রি সাইড। গ্রামের মেধাবী সৃজনশীল ব্যক্তি খবিরউদ্দিন আহমেদ ওই কান্ট্রি সাইডের স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন। যে বীজের বৃক্ষ আজ পল্লবিত, পুষ্পিত, শোভিত। যে শোভা পানিপাড়া গ্রাম ছাপিয়ে দশ গ্রামের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে এখন বাংলাদেশকেও শোভিত করার জন্য ডাকছে। পানিপাড়া তার সবুজ দরজা খুলে দিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। এ ডাকে সাড়া দিয়ে রঙ-বেরঙের পাখি উড়ে এসে কান্ট্রি সাইডের ঝাউ বৃক্ষের ডালে এসে বসছে। হারিয়ে যাওয়া জীবজন্তুও খুজে নিচ্ছে ঠিকানা।

অরুণিমা কান্ট্রি সাইড একদিকে ইকো পার্ক, একদিকে এটি একটি মাছের খামার আবার এটিকে ফুল-ফলের বিরাট বাগানও বলা যেতে পারে। সুনিপুণভাবে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময়ে শিল্পীর মতোই অরুণিমাকে সাজানো হয়েছে। মধুমতি আর নবগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের ১৫০ বিঘা জমির দ্বীপে ১৯টি দীঘি কেটে বিল ভরাট করে ফুল-ফলের হাজার হাজার চারা রোপণ করে অরুণিমাকে তিলোত্তমা করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টিপ পরানো হয়েছে। মেহগনি, ঝাউ, আম, গোলাপ বাগান ছাড়াও প্রায় দেড় হাজার প্রজাতির বৃক্ষ এখানে রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া অনেক পাখির বাসা বৃক্ষের ডালে খুজে পাওয়া যায়।

দীঘিগুলোতে সাতার কাটছে দেশি প্রজাতির মাছ। তার পাড়ে আম্রপালির সুনিপুণ বাগান। দীঘি এবং আম গাছ থেকে আয় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আবার পর্যটকদের প্লেটে তুলে দেয়া হচ্ছে টাটকা মাছ, সবজি, ফল। গরু, ঘোড়া, কুকুর, হাস-মুরগি, জীবজন্তু, পশুপাখি, সাপ-ব্যাঙ ইকো পার্কের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে অতীতকে ফিরিয়ে এনেছে।

পর্যটকদের জন্য সব রকম আনন্দ-বিনোদনের আয়োজন ছাড়া এখানে রয়েছে দীঘির মাঝখানে একটি আধুনিক রেস্টুরেন্ট। থাকার জন্য রয়েছে সব ধরনের আধুনিক সুবিধাসহ কটেজ, গ্রামীণ বাড়ি, ভাসমান কটেজ। নৌকার ওপর নির্মাণ করা দুই কক্ষের কটেজে রয়েছে লাল কার্পেট, এসি, ফ্রিজ। বনভোজনের ৩০টি অরণ্য স্পট, ছোট ও বড়দের নানা রকম খেলার ব্যবস্থা ছাড়াও লাইব্রেরি, বিশ্রাম ঘর, দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু, স্পিড বোট, নৌকা, ঘোড়ার গাড়ি, পাহারাদার কুকুর, পদ্ম পুকুর, পদ্ম পুকুরের নীল পদ্ম, নয়নাভিরাম নার্সারি, নার্সারির দেশি-বিদেশি গাছ নিয়ে অরুণিমা কান্ট্রি সাইড সত্যিকারের পৃথক এক কান্ট্রি হিসেবে গড়ে উঠেছে।

মধুমতি-নবগঙ্গার সঙ্গম দ্বীপের জোয়ার-ভাটায় সাতার, নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থার পাশাপাশি অরুণিমায় চাদের আলোয় দীঘির জলে ফুলের অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। অরুণিমা কান্ট্রি সাইডের এমডি ইরফান আহমেদ বলেন, গ্রামের মৎস্যজীবী, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের এর সঙ্গে যুক্ত করে আমরা দেশে ভিন্ন আঙ্গিকের একটি অ্যাগ্রো বেসড টুরিস্ট প্লেস গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসবেন। তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রকৃত বাংলাদেশকে দেখতে পাবেন - এমন স্বপ্ন নিয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

জল নিবাস
মাছের মাতৃভূমি, জন্মভূমি পানি। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-দীঘি মাছের সাকিন। আর মানুষের সাকিন ডাঙা ভূমি। মানুষ ডাঙায় বাস করে। তবে পানির প্রতি তার খুব মহব্বত। বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই পানি পছন্দ করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এ দেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি আমাদের চিরচেনা অনেক নদী স্মৃতি হয়ে গেছে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ফটিক পানির নদী। আর নগরায়নের মিছিলে আমরা ভুলতে বসেছি প্রিয় নদীকে। আমরা ভুলে গেছি পানির প্রেম, শীতলতা, উদারতা, জীবন-মরণের জরুরি উপাখ্যান মহামূল্যবান পানিকে। এ কারণে আমরা আমাদের শিশুদের মাঝে-মধ্যে পিপড়ে খাইয়ে সাতার শেখানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পানি কোথায়? সুইমিং পুলের কংক্রিট শুধু বেদনার সৃষ্টি করে। এ বিষয়কে মাথায় রেখে অরুণিমা কর্তৃপক্ষ পানির ওপর বাড়ি তৈরি করেছে। এ বাড়ির নাম ভাসমান বোট। বিশাল দীঘির বুকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে সেই বোট। বোট ভাসছে দীঘির জলে। দুটি রুম। দুটি বাথরুম। অত্যাধুনিক বাথরুমে কমোডও রয়েছে। তুলতুলে গদি। ঝরনা, ব্যালকনি, নরম বালিশ, বাহারি বেড কভার, খাবারের স্পেস, আরো কতো কি! ভাসমান বোটের ব্যালকনিতে সবুজ ঝাউ বৃক্ষ। পাগল হওয়ার উপক্রম। এ বোট সম্পর্কে কথা বলি পানিপাড়া গ্রামের শিক্ষক মোল্লা সরোয়ার জাহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের এতো বুদ্ধি দিয়েছেন। বোট ভাসছে। তার মধ্যে ঘুমাচ্ছে মানুষ। উপরে পানি। নিচে পানি। সব কিছু কল্পনার বাইরে। এ ভাসমান বোটের পাশাপাশি অরুণিমায় রয়েছে কটেজ। তিন রুমের এসি/নন এসি কটেজ। সামনের বারান্দায় বেতের সোফা। ভেতরে নগর। লাল কার্পেট, এসি, ফ্রিজ, মোবাইল, কলিং বেলসহ সব ধরনের আধুনিক সুবিধা - যা পানিপাড়া গ্রামে কল্পনার বাইরে।

অরুণিমা ইকো পার্ক
অরুণিমা কান্ট্রি সাইড মূলত একটি ইকো পার্ক। জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ছাড়াও এখানে প্রকৃতিকে অসীম করা হয়েছে। পাখিরা স্বাধীন। জীবজন্তুর দল শৃঙ্খলমুক্ত। মাছেরা এখানে উচ্ছ্বসিত। এরা বাচার জন্য, প্রজননের জন্য অরুণিমার ফটিক জলে নিজেদের ঠিকানা খুজে নিয়েছে। গভীর অরণ্যে নানা রকম ফুল-ফলের লোভে বুলবুলি বাসা তৈরি করে ডিম পেড়ে তা দেয়। শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া থেকে উড়ে এসে দীঘির জলে ভাসে ময়ূরকণ্ঠী রঙের হাস, পাখি। বিলুপ্ত প্রায় সুইচোরা, ফটিকজল, শ্যামা পাখির দেখা মেলে। আবার ফিঙে, বুলবুলি, শালিক, কানা বকের ঝাক অরুণিমা ইকো পার্কের পৃথিবীকে সারাক্ষণ ঝঙ্কৃত করে রাখে।
গরু, ঘোড়া, কুকুর, রাজহাস, মুরগি, হরিণ, কাঠ বিড়ালি, বেজি, বাগডাসা, বনবিড়ালরাও মুক্ত হয়ে পার্কের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় ছুটছে। অরুণিমা তাদের অভয়ারণ্য। অরুণিমা তাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
অরুণিমার শেষপ্রান্তে আম বাগানের পশ্চিম পাশের পুকুরটি স্থানীয় পানিপাড়া বিলের সঙ্গে মিশেছে। পুকুরের সঙ্গে ওই বিলের সংযোগ থাকায় বর্ষা মৌসুমে দেশি পুটি, বাইন, ট্যাংরা, কৈ, জিয়ল, মাগুর ছাড়াও নানা প্রজাতির মাছ পুকুরে উঠে আসে। এখানে ডিম-বাচ্চা দেয়। বিলের পানি শুকিয়ে গেলে পুকুরে বেচে থাকে হারিয়ে যাওয়া দেশি মাছ। আর জীব বৈচিত্র্যের অন্যতম আয়োজন শত শত ছোট-বড় ফলদ, বনজ বৃক্ষ প্রকৃতিকে, হারিয়ে যাওয়া জীবজন্তু, পশু-পাখিকে পরম যত্নে বুকে আগলে রাখে।

অরুণিমার নার্সারি
অরুণিমা ইকো পার্কে ঢুকেই ইট বিছানো পথে সামান্য পথ এগুলেই সামনে নার্সারি। এ নার্সারিতে সাজানো রয়েছে হাজার প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধিসহ অপূর্ব সৌন্দর্যের সব ডেকরেটেড প্লান্ট। টবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফরকোরিয়া, মুচান্ডা, কাঙ্গন, চেরি। নার্সারির পাশেই পদ্মপুকুর। সেখানে ফুটে আছে গোলাপি রঙের শত শত পদ্ম। জানা যায়, নার্সারির জন্য নির্দিষ্ট এ এলাকা ছাড়াও কান্ট্রি সাইডে আরো রয়েছে ২০০ প্রজাতির গোলাপ বাগান। আম, কাঠাল, লিচুর চারা কলমের বাগান।
নার্সারির প্রধান মালি বাবুল হোসেন। তিনি ছয় বছর ধরে এখানে গাছের সঙ্গে বসবাস করছেন। বাবুল বলেন, আমরা দেশ-বিদেশ থেকে গাছের চারা সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যে বেশ কিছু বিরল প্রজাতির গাছ রয়েছে। যেমন আমাজান লিলি, ইংল্যান্ডের ডেফোডিল, পান্থ কুমারী, মার্বেল টাস্ক, রেড পাম্প, মরি পাম্প, এমনকি আমাদের দেশের ভাট ফুল। তিনি আরো বলেন, আমরা বিশেষ করে প্রতি বছর হাজার হাজার ফলদ বৃক্ষের চারা-কলম তৈরি করি। সেগুলো কম মূল্যে বিক্রি করা হয়। একই সঙ্গে ক্রেতাদের চারা-কলমের পরিচর্যা সম্পর্কেও আমরা ধারণা দেই।

কান্ট্রি সাইডের এমডি ইরফান আহমেদ বলেন, এবার থেকে আমরা প্রতি বছর বৃক্ষ মেলার আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত ২২ জুন প্রথম বৃক্ষ মেলা এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। আগামীতে আয়োজনকে সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। জানা যায়, কান্ট্রি সাইডে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। ফলের মধ্যে নানা প্রজাতির আমসহ আম্রপালি, আম মলি্লকা, ছফেদা, আপেলকুল, কয়েক প্রজাতির লেবু, পেয়ারা, জলপাই, কামরাঙা, নারকেল, পেপে, কলা, চেরি, মিষ্টি করমচা, স্টার আপেল, জামরুলসহ নানা প্রজাতির মৌসুমি ফলের গাছ রয়েছে।

ফুলের মধ্যে রয়েছে ডেফোডিল, পদ্ম, মিনি রঙ্গন, মুচান্ডা, নীলপদ্ম, কাঞ্চন, ক্যামেলিয়া, চেরি, লিলি, নাগলিঙ্গম, কুমারী পান্থ, নাগেশ্বর, মার্বেল টাস্ক, ২০০ রকম গোলাপ, গ্লাডিউলাস, টগর, রজনীগন্ধা ছাড়াও নানা রকম দেশি-বিদেশি অর্কিড ও ফুলের গাছ।

ঔষধি গাছের মধ্যে ঘৃতকুমারী, নিম, আলমকি, হরিতকী, বয়রা, অর্জুন ছাড়াও আরো কয়েক প্রজাতির মূল্যবান বৃক্ষ রয়েছে। তাছাড়া নলিনি, অ্যাডোনিয়াম, ফরফোরিয়া, বিভিন্ন প্রজাতির পাম্প, ক্রিসমাস ট্রি, ঝাউ, নার্সারি, ইকো পার্ক এবং কান্ট্রি সাইডকে সবুজ করে রেখেছে। এখানে রয়েছে বিরাট এক ঝাউ বাগান। ঝাউ বাগানের ছায়াতলে বসার ব্যবস্থা আছে। এখানে বসলে গান শোনা যায়, পাখিদের আর ঝাউপাতার গান। বাতাসে ঝাউপাতা তার অব্যাহত সুর ঝঙ্কারে কান্ট্রি সাইডের প্রকৃতিকে আন্দোলিত করে রেখেছে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা। আর ফুলে ভরা পদ্মপুকুর লাল-নীল পদ্ম, বিরল প্রজাতির আমাজন লিলির অভিনব পাতা রাগে-অনুরাগে পর্যটকদের কাছে টানছে। ওই বৃক্ষগুলোতে পাখিরা ঠিকানা খুজে পেয়েছে। এ কারণে বুলবুলি, মাছরাঙা, সাদা বক, ঘুঘু, দোয়েল, শালিক, শ্যামা গান গায়, শিষ দেয়। কিচির-মিচির করে প্রভাতকে স্বাগত জানায়। প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলে।

ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য
অরুণিমা কান্ট্রি সাইডের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঘন সবুজ অরণ্য। সে অরণ্যে হারিয়ে যেতে নেই মানা। সে সবুজ অসীম। যে সবুজের কূল নেই, কিনারা নেই। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখানে রয়েছে অতি দীর্ঘ ঝাউ বৃক্ষের বাগান। পবন ঝাউ নামে পরিচিত এ বাগানে সব সময়ই বাজনা বাজে। হাওয়া, বাতাসে ঝাউ বৃক্ষের কাটা সদৃশ্য পাতা শন শন শব্দে সব সময় মুখরিত হয়। এই ঝাউ বৃক্ষের তলে বৃক্ষ মেলা, গ্রামীণ মেলা বসে। এমনকি বাউল সঙ্গীতের অনুষ্ঠান এখানকার রাতকে জাগিয়ে রাখে।
অরুণিমা ইকো পার্কের গেটে ঢোকার ৫০ গজ দূরে রয়েছে সবুজ পাহাড়। দূর থেকে দেখে পাহাড়ই মনে হয়। দুই পাশ ঢালু। মাঝখান উচু। এটি আসলে একটি সুবিশাল মেহগনি বাগান। প্রায় ১০ বিঘা আয়তনের এ বাগানে রয়েছে শত শত মেহগনি গাছ। এখানে পর্যটকরা এসে বনভোজনে মেতে ওঠে। পিকনিক স্পট হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
অরুণিমা কান্ট্রি সাইডে আরো রয়েছে রানী আম্রপালির বাগান। ১৯টি পুকুরের পাড়ে ২০০০ সালে ৪৪৭টি আম্রপালির চারা রোপণ করা হয়। সে চারাগুলোই এখন বিশাল আম্রকাননে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর এ আম বাগান থেকে কয়েক লাখ টাকার আম বিক্রি হয়। কান্ট্রি সাইডের রাস্তার দুই পাশে আরো রয়েছে ২০০ সারিবদ্ধ আম্রপালির নবীন বৃক্ষ। এছাড়া পুরো ইকো পার্ক জুড়ে প্রায় ৩০টি ফুল-ফলের বাগান পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দ্বীপ রেস্টুরেন্ট
কান্ট্রি সাইডের ইট বিছানো পথ পাশে নারকেল বীথি। হাটতে হাটতে সামনে নদী না দীঘি তা বোঝা মুশকিল। চারদিকে পানি আর পানি। বাতাসে ঢেউ খেলছে। পানকৌড়ি, সাদা বক ছো মেরে তুলে নিচ্ছে বোকা পুটি। ডাঙা থেকে প্রায় ২৫০ ফুট ঝুলন্ত সেতু। এ সেতু পার হয়ে শন ক্ষেত মাড়িয়ে মাঝখানে দ্বীপ। আন্দামান দ্বীপ নয়, দ্বীপ রেস্টুরেন্ট। ভাসমান রেস্টুরেন্টও বলা যেতে পারে। দেশি-বিদেশি ব্যঞ্জন আর ডেকরেশনের সম্মেলনে অভিনব রেস্টুরেন্ট। চারদিকে খোলা। উপরে শনের চাল। একদিকে কিচেন। ভেতরে চেয়ার-টেবিল পাতা। বসলে পাশের দীঘির হাওয়ায় কবি হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। যেদিকেই চোখ যায়, পানি আর পানি। পানিতে সাতার কাটছে নানা রকম দেশি প্রজাতির মাছ। আর পাখিরা গান গাওয়ার পাশাপাশি শিকার খুজছে - এ দৃশ্য দ্বীপ রেস্টুরেন্টকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে। রেস্টুরেন্টে এক সঙ্গে ৩০ জনের খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রেস্টুরেন্টের বয় জামাল কোনো মেনু লিস্ট দিয়ে নয়, মুখেই বলতে থাকে, কি মাছ খাবেন, পুটি, সরপুটি, পাঙ্গাশ, কই, না রুই। আমের জুস, অস্ট্রেলিয়ান মেশিনে তৈরি বারবিকিউ আইটেম, দেশি মুরগি, আম-ডাল, পেপে ঘণ্ট, খামিরের আটার রুটি, মামলেট, ডিম পোচ, না আলু-পেপে ভাজি- মেনুর নাম শুনে জিভে জল আসে। জামাল বললো, একটু আগে ভাগে বললে আমরা দীঘি থেকে মাছ ধরে ফ্রাই করে দেবো। দাম রিজনেবল। জানা যায়, দ্বীপ রেস্টুরেন্টে যা কিছু বিক্রি হয়, তার সব কিছুই ফ্রেস। অরুণিমা কান্ট্রি সাইডের খামারে উৎপাদিত। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা রেস্টুরেন্টটি খোলা। সঙ্গে রয়েছে একটি বুক কর্নার। খাবারের অর্ডার দিয়ে বই পড়া যেতে পারে। জোসনা রাতে পানির ওপর নির্মিত দ্বীপ চাদের মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে। সে হাসি এক পর্যায়ে চাদের আলো মেখে দীঘির জলে হারিয়ে যায়।


এক নজরে অরুণিমা কান্ট্রি সাইড

গ্রাম : পানিপাড়া, উপজেলা : কালিয়া, জেলা : নড়াইল।

আয়তন : ১৫০ বিঘা।

জলকর : ৬৬ বিঘা, ১৯টি পুকুর।

বৃক্ষ : ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির ফলজ, বনজ, ঔষধি।

পাখি : শ্যামা, ঘুঘু, বুলবুলি, শালিক, মাছরাঙা, টুনটুনি, ফিঙে, সারস, পানকৌড়ি, কায়েম, বেলেহাস, কোচো, কোকিল, ভিলভিলে, কবুতর, ফটিকজল, ডাহুক, কাঠুকরা, দোয়েল, সুইচোরা, চড়ুই, বকসহ শতাধিক প্রজাতি।

মাছ : রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, পাঙ্গাশ, সরপুটি, পুটি, ট্যাংরা, বাইন, মাগুর, জিয়ল, কৈ, টাকি, শোল, মায়া, কিয়া, রয়না, কাকলে, গুতেন, রাতামি, গজাল, বোয়াল, ট্যাপা, খলসে, চ্যালা, পোত কৈ, পাবদা।

ফল : আম, জাম, নারকেল, কাঠাল, লিচু, কামরাঙা, ছফেদা, স্টার আপেল, পেয়ারা, মিষ্টি করমচা, চেরি, জলপাই, কুল, লেবু, পেপে।

ফুল : ডেফোডিল, ক্যামেলিয়া, রজনীগন্ধা, চেরি, ফুরুস, লিলি, কুমারীপান্থ, কাঞ্চন, পদ্ম, নীল পদ্ম, রঙ্গন, ২০০ প্রজাতির গোলাপ, মার্বেল টাস্ক, টগর, গ্যালাডুলাসসহ আরো কয়েক রকম।

নার্সারি : হাজার প্রজাতির গাছের সমৃদ্ধ নার্সারি।

অরণ্য : ৩ একর সবুজ মেহগনি বাগান, ১ একরের ঝাউবন, ৬৪৭টি আম্রপালি গাছের বাগান। ৫ কাঠের গোলাপ বাগান।

প্রাণী : ঘোড়া তিনটি, হরিণ তিনটি, গরু ছয়টি, রাজহাস আটটি, হাউন্ট কুকুর তিনটি, মুরগি ২০টি, পাখি অগণিত, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী কিছু কিছু।

লাইব্রেরি : ৬০০ দেশি-বিদেশি বই সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।

আবাসন ব্যবস্থা : তিন রুমের এসি/নন এসি কটেজ, ভাসমান ২ রুমের কটেজ, গ্রামীণ কটেজ গোল ঘর, ছনের ছাউনির বিশ্রামাগার তিনটি।

বিনোদন : স্পিড বোট, প্যাডেল বোট, ২০ সিটের ভ্রমণ বোট, সুইমিং পন্ড, ঘোড়ার গাড়ি, শিশুদের গেম কর্নার।

আহার : দ্বীপ রেস্টুরেন্টের দেশি-বিদেশি খাবার, ফলের জুস, নিজস্ব খামারের উৎপাদিত সবজি ও মাছের ফ্রাই, ব্যঞ্জন। আরো আছে অস্ট্রেলিয়ান মেশিনের সাহায্যে বারবিকিউ।

বনভোজন স্পট : ফুল-ফল বাগানের ৩০টি স্পট।

অন্যান্য সুবিধা : কান্ট্রি সাইডের পাশে মধুমতি নদীর বেলাভূমি ভ্রমণ, মধুমতি-নবগঙ্গার সঙ্গমস্থলে সাতারের ব্যবস্থা। নৌভ্রমণের সুবিধা। কান্ট্রি সাইডে সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় গ্রামীণ বাহন। জেনারেটরের সুবিধা। রবি শঙ্কর, উদয় শঙ্করের বাড়ি, সুলতান সংগ্রহশালা, সুচিত্রা সেনের নানার বাড়ি, এশিয়ার সবচেয়ে বড় পিতলের রথ দেখার ব্যবস্থা।

যাতায়াত : ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে দীঘলিয়া-গোপালগঞ্জ হয়ে কান্ট্রি সাইড, মোল্লারহাট-চুনখোলা হয়ে কান্ট্রি সাইড। খুলনা-কালিয়া-বড়দিয়া হয়ে কান্ট্রি সাইড। যশোর-নড়াইল-কালিয়া হয়ে পানিপাড়া কান্ট্রি সাইড।

যোগাযোগ : ০১৭১১৪২২২০৩, ০১৭১৬-৪৩১২১০
ফ্যাক্স : ০২৮৮২৯৬৮১