মুক্তিযুদ্ধের স্মারক
ভাষকর্য পালবাড়ির মোড়
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কালের বিবর্তনে এই ইতিহাস কখনো হারিয়ে যাওয়ার কিংবা বিকৃত হবার নয়। এ ইতিহাসকে ধরে রাখার এবং সঠিকভাবে উপস্থাপন করার দায়িত্ব এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। স্বাধীনতা যুদ্ধের এই স্মরণীয় ইতিহাস আগামী প্রজন্মকে দেশ গড়ার কাজে যোগাবে অসীম সাহস ও উদ্দীপনা। অথচ সত্যি বলতে কি, শুধু সুষ্ঠ সংরক্ষণের অভাবে সময়ের ভাঁজে-ভাঁজে ঝাপসা হয়ে আসছে জাতির এই গৌরবদীপ্ত সংগ্রাম ও ইতিহাসের পাতাগুলো। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে না বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে না। এই গুরুদায়িত্ব পালনে যিনিই এগিয়ে আসবেন জাতি অবশ্যই তাঁকে চিরদিন কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ রাখবে।
যশোর অঞ্চলে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের এক বিরাট অধ্যায়। যশোরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ৮ ও ৯ নং সেক্টর। এই অঞ্চলে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাসহ সেই গৌরবগাঁথা স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য যশোর অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৩টি অমর র্কীতি-স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক যাদুঘর ‘গৌরবাঙ্গণ’, ১ম ইস্ট বেঙ্গলের শহীদদের কবরস্থানে স্মৃতিসৌধ ‘রক্তঋণ’ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বীর উত্তম-এর কবরের উপরে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ ২৩ তম স্বাধীনতা দিবসে এই ৩টি অমরর্কীতির শুভ উদ্বোধন করেছিলেন যশোর অঞ্চলের তৎকালীন এরিয়া কমান্ডার ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি (বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বীর বিক্রম, এনডিসি, পিএসসি) তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় পরিকল্পনায় ও নিদের্শনায় এই প্রকল্পগুলো নির্মিত হয়েছে, যেখানে যশোর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করে ইতিহাসের গতিধারাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রয়াস পেয়েছে।

গৌরবাঙ্গণ
যশোর শহরের নিকটবর্তী আরবপুর এলাকায় সেনানিবাসের প্রবেশ পথে মিলিটারি পুলিশ চেকপোস্ট পার হয়েই রাস্তার পাশে চোখে পড়বে একটি একতলা ভবন। সুন্দর পরিপাটি এই ভবনটির উপরে বড় অক্ষরে লেখা আছে ‘গৌরবাঙ্গণ’ ঐঅখখ ঙঋ ঐঙঘঙটজ । স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত যাদুঘর। প্রবেশ পথের নরম সবুজঘাস পেরিয়ে বাম পাশের দেয়ালে অংকিত রয়েছে একটি মুর‌্যাল। তার উপরে লেখা আছে-‘একটি নক্ষত্রের সন্ধানে’ (উওঝঈঙ�� ঊজণ ঙঋ অ ঝঞঅজ )। সাতটি খণ্ডে বিভক্ত এই মুর‌্যালটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র। পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক সেই ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র দিয়ে শুরু করে শিল্পী সুনিপুণ হাতে মুর‌্যালটি শেষ অংশ এঁকেছেন রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত স্বাধীনতার রক্তস্নাত সকাল ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা দিয়ে। মাঝখানের অংশ গুলোতে পর্যায়ক্রমে অংকিত হয়েছে রিক্ত-নিস্ব, ছিন্ন-ভিন্ন আশ্রয়হীন শরণার্থীদের মিছিল, প্রতিরোধ গেরিলা যুদ্ধ, বাঙালি সৈন্য ও সাধারণ মানুষের অভিযান এবং পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র।
সোমবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য সব ক’দিন যাদুঘরটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। গৌরবাঙ্গণের ভেতরে প্রবেশ করেই ডানদিকে সর্বপ্রথম যে কক্ষটি চোখে পড়বে তার নাম ‘রক্তঋণ।’ ’৭১ সালের ৩ মার্চ যশোর শহরে বেজে উঠেছিল প্রতিরোধের হুংকার। ওইদিন যশোর কালেক্টরেট ভবনে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশী পতাকা উত্তোলন করেছিলেন জনাব আবদুল হাই। কক্ষের ভেতরে প্রথমেই চোখে পড়বে এই ঐতিহাসিক ছবিটি। এরপর একটু এগোলেই থমকে দাঁড়াতে হয় পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহচিত্র দেখে। চারদিকে শুধু লাশ, কংকাল আর ধর্ষণের ভয়াবহ চিত্র। রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে, বাসস্ট্যান্ডে, কচুরিপানার নিচে, ম্যানহোলের মধ্যে শুধু লাশ আর লাশ। যশোরের পাশে ভেকুটিয়া গ্রামের বধ্যভূমিতে কংকালের চিত্র দেখে যে কারোরই বুক কেঁপে উঠে। মানুষের লাশ শিয়াল-কুকুরে খাচ্ছে, বস্ত্রহীন অবস্থায় পড়ে আছে ধর্ষিত নারীর সংজ্ঞাহীন দেহ। এদের শুধু একটাই অপরাধ ছিল, এরা বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়েছিল।
এসব দু®প্রাপ্য অমূল্য ও জীবন্ত ছবিগুলোর পাশাপাশি এই কক্ষে আরো রয়েছে যশোর সেনানিবাসে পাকবাহিনীর হাতে নিহত ৭ ফিল্ড অ্যম্বুলেন্সের অধিনায়ক লে. ক. আবদুল হাই-এর শহীদ হবার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ’৭১ সালের ৩০ মার্চ পাকহানাদার বাহিনী লে. ক. আবদুল হাইকে তার অফিস কক্ষে গুলি করে হত্যা করেছিল। এছাড়াও এ কক্ষে তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাপ্রবাহের কাটিং সংরক্ষিত আছে।

স্মরণিকা
এই কক্ষে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারদের ছবি, যশোর সামরিক অঞ্চলের ম্যাপ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ছবি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বর্তমান মেহেরপুর জেলায় মুজিবনগরের আমবাগানে তৎকালীন অস্থায়ীরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া গার্ড অব অনারের ঐতিহাসিক ছবিটি রয়েছে এই কক্ষে।
রণধ্বনি
গৌরবাঙ্গনের আর একটি কক্ষের নাম ‘রণধ্বনি।’ এই কক্ষে সংরক্ষিত আছে ৮ ও ৯ নং সেক্টরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের নকশা ও ছবি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধের ঘটনাবলী পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। এতে প্রতিফলিত হয়েছে যশোর অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও সর্বস্তরের জনগণের প্রতিরোধের চিত্র। এখানে বর্ণিত আছে হামিদপুরের প্রতিরোধের ঘটনা, দাইতলার যুদ্ধ, মণিখারের যুদ্ধ, কাজীপুরের যুদ্ধসহ অন্যান্য অনেক যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। গোপালগঞ্জ জেলার মনিখারে তখন ছুটি কাটাচ্ছিলেন তৎকালীন ক্যাপ্টেন এম এ হালিম। পাকহানাদার বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের খবর পেয়ে তিনি এলাকার পুলিশ, ইপিআর ও আনসার সদস্যদের একত্র করে ২৭ মার্চ যশোর অভিমুখে যাত্রা করেন। ২৮ মার্চ যশোরের কাছে হামিদপুরে প্রথম আক্রমণ রচনা করেন পাকবাহিনীর উপর। এরপর তিনি একের পর এক বহুবার সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। এই কক্ষেই সংরক্ষিত আছে ঐতিহাসিক জীবননগর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বীরবিক্রম। জীবননগরের সম্মুখযুদ্ধে শত্র“র গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবুও তিনি থামেননি। দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণপনে যুদ্ধ করে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছিলেন শত্র“সেনাদের।

মোদের অহংকার
রণধ্বনির পাশেই ‘মোদের অহংকার’ নামক কক্ষািটতে রক্ষিত আছে স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র, এলএমজি, এসএমজি, এসএলআর, মর্টার, বিভিন্ন ধরনের গুলি, ব্যবহৃত হেলমেট ইত্যাদি।
অপরাজেয়
আর একটি কক্ষের নাম ‘অপরাজেয়’। সেখানে বিজয়ের গৌরবগাঁথা স্মৃতিগুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে। এখানে আছে ৫ জন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি। মুক্তিযুদ্ধের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ ের মধ্যে ৫ জনই বীরশ্রেষ্ঠ হলেন : ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, সিপাহী মোহাম্মাদ হামিদুর রহমান, সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, ল্যান্সনায়েক মুন্সী আবদুর রউফ এবং ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। এছাড়াও এখানে রয়েছে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল, বাংলাদেশের তৎকালীন ও বর্তমান জাতীয় পতাকা, সাভার ও মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ছবি এবং ‘রক্তঋণ’ ও শহীদ লে. আনোয়ার হোসেনের স্মৃতিস্তম্ভের ছবি।

স্মৃতিঅম্লান
গৌরবাঙ্গণে আরো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের একটি সংগ্রহশালা ‘স্মৃতিঅম্লান’। এখানে স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর প্রকাশিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই সংগৃহীত আছে। পাশেই রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একািট পাঠাগার। যাদুঘরটির পাশের গ্যারেজে রক্ষিত আছে জীবননগরের গয়েশপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা ‘পাকিস্তানের ৩য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে অ্য্যাম্বুশ করে উদ্ধারকৃত একটি জিপ। সবই যেন জীবন্ত, সবই যেন সেদিনকার কথা।
রক্তঋণ
যশোর সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে শান্ত-স্নিগ্ধ একটি নিস্তব্ধ গ্রামের দিকে। সে গ্রামটির নাম মনোহরপুর। তারই পাশে অবস্থিত একটি লেক, নাম তুলশীদহ বাওড়। এই বাওড়ের পাড়েই নিঃশব্দে চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছে সিনিয়র টাইগার্স নামে পরিচিত ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১৭টি নক্ষত্র, ১৭ জন মহাপ্রাণ। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সিনিয়র টাইগার্সের বীরবাঙালি সৈনিকরা বিদ্রোহ করেছিলেন পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ থেকে যুদ্ধ, যুদ্ধ থেকে রক্তপাত। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল সেই সব বাঙালি বীরযোদ্ধারা। এই সব বাঙালি সৈনিকের লাশ ন্যুনতম ধর্মীয় মর্যাদায়ও দাফন করে নি চরম বর্বর পাকসেনারা। সব লাশ এই নিস্তব্ধ মনোহরপুরের একটা গর্তের মধ্যে পুতে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমিটি আবিষ্কৃত হলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেই সব বাঙালি বীর শহীদদের লাশ পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করে সাদা দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বাঙালি জাতির, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিশ্র“তির কাছে সেই বাঙালি সৈনিকদের বীরত্বগাঁথা আত্মত্যাগের ইতিহাসকে চিরঅম্লান করে রাখার জন্য শহীদদের রক্তের ঋণের কথা স্মরণ করে স্মৃতিসৌধ ‘রক্তঋণ’ নির্মাণ করা হয়। ৮৮০ বর্গগজ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই স্মৃতিসৌধের ১০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ৪টি পিলারের উপরে ১৬ ফুট ৮ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট একটি হেলমেটও রক্ষিত রয়েছে। এই স্মৃতি সৌধটি উৎসর্গ করা হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে যশোর সেনানিবাসে ৭ ফিল্ড এ্যাম্বুলেন্সের শহীদ লে. ক. আবদুল হাই, ক্যাপ্টেন শেখ ও অন্য জানা-অজানা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় অস্ত যায়। উদিত ও অস্তগামী সূর্য প্রতিদিন একবার করে শ্রদ্ধা জানায় এই বীর-শহীদদের। বাঁশঝাড় ও অসংখ্য বৃক্ষের সবুজ ছায়ায় নীরব লেকের ধার ঘেঁসে চিরনিদ্রায় শায়িত এই বীর সৈনিকদের স্মৃতি চির জাগ্রত হয়ে থাকবে এ দেশের আনাচে-কানাচে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

শহীদ আনোয়ার স্মৃতিস্তম্ভ
স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র বাসনা যার বুকের মধ্যে অশান্ত ঢেউয়ের মত তোলপাড় করে তার কাছে অন্য সব কিছু তো দূরের কথা জীবনের মূল্যও গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি শুধু আঘাত হানার মত সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ১ম ইস্ট বেঙ্গলের এ রকমই একজন দুর্দান্ত সাহসী অফিসার ছিলেন সেকেন্ড লে. আনোয়ার হোসেন। যিনি ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝড় তুলে শহীদের পথ ধরে চলে গিয়েছিলেন জীবনের অপর পারে। তিনি শহীদ হয়ে রেখে গিয়েছিলেন সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা প্রতিটি বাঙালি সৈনিকের মনে বুনে দিয়েছিল সংগ্রামের অগ্নিদীপ্তশপথের বীজ। যে বীজের ফসল আমাদের আজকের স্বাধীনতা, একটি স্বাধীন দেশ, একটি স্বাধীন মানচিত্র।
সিনিয়র টাইগার্স নামে পরিচিত ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যৌথ প্রশিক্ষণের নামে পাঠানো হয়েছিল যশোর শহর থেকে ২০ কি.মি. দূরে চৌগাছার জগদীশপুরে। তৎকালীন ১০৭ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার দূরবানীর আদেশে ২৯ মার্চ ওই ইউনিটকে যশোর ফিরিয়ে এনে ইউনিটের সকল অফিসার ও সৈনিকদের পাকিস্তান ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া শতাব্দির বর্বরতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ থেকে শুরু করে কোন ঘটনাই ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যরা জানতেন না। কিন্তু সেনানিবাসে ফিরেই তারা বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং ব্রিগেড কমান্ডারের আদেশ অমান্য করে পাকিস্তান ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন। তখনই শুরু হয়েছিল তাদের উপর আর্টিলারি ফায়ার ও ত্রিমুখী আক্রমণ। সিনিয়র টাইগার্সের বীর সৈন্যরা ৬ ঘণ্টা বীরদর্পে যুদ্ধ করে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে শানতলা সেনাছাউনীর পশ্চিম তীর ঘেঁসে পদ্মবিলের মাঝে চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেখানেই ঝরে যায় অসংখ্য বাঙালি সৈনিকের প্রাণ। রক্তে রক্তে ভিজে যায় পবিত্র মাটি। এক ঝাঁক এসএমজির গুলি এসে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় লে. আনোয়ারের দেহ। তিনি চুম্বন করেন পবিত্রমাটি। সহযোদ্ধারা এই বীরতরুণ অফিসারের আহত দেহ সরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর দেহ অবশ হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শহীদের তালিকায় যুক্ত হলো একটি নাম। যশোর সেনানিবাস থেকে ৪ কি.মি. উত্তরে হৈবতপুরে যশোর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিল এই বীরশহীদ সেকেন্ড লে. আনোয়ারকে। সেখানেই তাঁর কবরের উপর নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। পথিক পথ চলতে-চলতে থমকে দাঁড়ায় পথের পাশে, শ্রদ্ধায় মাথা নত করে লাখো সালাম জানায় এই বীরশহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে, নীরবে দু’ফোটা চোখের পানি ফেলে কামনা করে তাঁর আত্মার শান্তি। দেশের প্রথম শত্র“মুক্ত জেলা যশোর। এখানেই প্রথম ওড়ে স্বাধীন দেশের পতাকা। এ জেলাতেই প্রথম পা রাখেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
শত্র“মুক্ত হবার পর অজ্ঞাত ও অখ্যাত গ্রামগঞ্জে কৃতজ্ঞ গণমানুষরা স্বেচ্ছায় শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে কালজয়ী শহীদদের স্মরণে গড়ে তুলেছে সাধ্যানুযায়ী স্মৃতিস্তম্ভ। কোনো কোনো স্থানে শহীদদের স্মরণে সাদামাটা কবর গেঁথে তুলেছে।

বিজয়স্তম্ভ
স্বাধীনতা সংগ্রামে নিহত নাম না জানা শহীদদের স্মরণে ১৯৭৪ সালে যশোর কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালের পাশে একটি স্মৃতিফলকের উন্মোচন করা হয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের উদ্যোগে এর সংস্কার করা হয়। নড়াইলের ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজবাড়ি থেকে শ্বেতপাথর এনে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু একটি স্তম্ভ তৈরি করা হয়। একই সাথে মিনারের পাদদেশে শ্বেতপাথর দিয়ে বাঁধানো হয়। বিজয়স্তম্ভটি সুরক্ষিত রাখার জন্যে প্রায় ১০ কাঠা জমি লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা হয়। স্তম্ভের পেছনে দু’টি ফলকে কবি শামসুর রহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি পাথরে খোদাই করে লেখা হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন এই জায়গাটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে যশোর পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয় ১৯৭৯ সালে। কিন্তু পৌরসভা এর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে পরিবহন শ্রমিক সংগঠ ন বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি এখানে বেশ কিছু গাছ লাগিয়েছে।
একাত্তরের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
যশোরের বধ্যভূমি চাঁচড়ার রায়পাড়ায় (মুরগী ফার্মের পাশে) স্থাপন করা হয়েছে একাত্তরের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। স্বাধীনতার ২০ বছর পর যশোর বিজয় উদযাপন পরিষদ ’৯২ সালের ১৪ ডিসেম্বর এটি তৈরি করে। নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল শ’ পাঁচেক টাকা। স্মৃতি ফলকটি উদ্বোধন করেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলীর পিতা আলহাজ আমীর আলী শেখ। পরবর্তীতে সরকার ২০০৬ সালে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে।

শহীদ মশিয়ূর রহমান স্মৃতিফলক
আওয়ামী লীগের বিশিষ্টনেতা প্রখ্যাত আইনজীবী মশিয়ূর রহমানকে পাকহানাদার বাহিনী ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। বন্দি করে যশোর সেনানিবাসে। সেখানে তাঁর ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন চলে কয়েকদিন ধরে। তারপর তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি পানি চেয়েছিলেন। কিন্তু না Ñ তাকে এক ফোটা পানিও দেয় নি বর্বর পাকিস্তানিসৈন্যরা। এ তথ্য জানা গেছে, তারই এক সহযোগীর কাছ থেকে। যিনি এত অত্যাচারের পরও কোনোক্রমে বেঁচে যান।
যশোরের এই কৃতী সন্তানের স্মৃতিকে ধরে রাখতে স্থানীয় পৌরপার্কে শিলান্যাস করা হয় স্মৃতিফলকের। ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর এর উদ্বোধন করেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
স্মৃতিফলকে পাথরে খোদাই করা আছে ‘বর্বরের বেয়নেটে ছিন্নভিন্ন দেহ যাঁর/ তাঁর জন্য শোক নেই, খুঁজবোনা তাঁকে আর/ যে শোনিতে দুঃখ মোছে বন্দিনী বাংলার/ তেমনি রক্তের ঋণে মশিয়ূর ভরে রাখে স্মৃতির ভাণ্ডার।’
শহীদ আইনজীবীদের স্মরণে স্মৃতিফলক
মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানিবাহিনী ও তার এদেশের দোসরদের হাতে নিহত আইনজীবীদের স্মরণে যশোর বার একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছে। এটি করা হয়েছে যশোর জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনের গায়ে। ১৯৮৪ সালে এটি করা হয়। ব্যয় হয়েছিল হাজার আষ্টেক টাকা। এটি নির্মাণে তখনকার সম্পাদক কাজী আবদুস শহীদ লালের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। শহীদ আইনজীবীরা হলেন :মশিয়ূর রহমান, সুশীল কুমার রায়, সৈয়দ আমীর আলী ও আবদুর রশিদ খান।

বাহাদুরপুর স্মৃতিফলক
সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে ২৫ জন শহীদের স্মরণে সেখানে গ্রামবাসী একটি স্মৃতিফলক নিজেরাই নির্মাণ করেছে। মুনীর আহমেদের নেতৃত্বে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে ১৯৮৮ সালের ১৮ এপ্রিল এটির উদ্বোধন করেন। মুনীর আহমদ শহীদ মহিউদ্দীনের ছেলে। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সকাল ৮ টার দিকে গোটা গ্রাম ঘিরে ফেলে। তারা পাইকারি হারে গ্রামের লোকজনকে ধরতে থাকে। তারপর শিশু ও বৃদ্ধদের প্রহার করে ছেড়ে দেয় আর তাদের পছন্দমত ২৯ জনকে ধরে নিয়ে যায়। পাকবাহিনী তাদের সবাইকে নামাজের সেজদার ভঙ্গিতে বসিয়ে দেয়। এরপর ঘটে সেই লোমহর্ষক বিয়োগান্তক ঘটনা।
বাহাদুরপুর গ্রামে পাকবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহতরা হলেন আনোয়ার হোসেন, আমীন উদ্দিন, আবুবকর সিদ্দিক, ওসমান আলী চুন্নু, অহেদুল ইসলাম, শামসুর রহমান, মকবুল হোসেন, মহিউদ্দীন আহমেদ, লুৎফর মোল্লা, নূর বকস, কওসার গোলদার, হাকিম গোলদার, জুমাত আলী, মোকসেদ আলী, রুহুল আমীন, আবদুল হামিদ, হানেফ মোল্লা, সদর মোল্লা, ইউনুস আলী, আব্দুস সামাদ এবং নাম নাজানা ৫ জন পথচারী।

স্বাধীনতার যুদ্ধক্ষেত্র ফলক
চৌগাছা উপজেলার মুক্তিনগরে নাম নাজানা শহীদদের স্মরণে স্থাপিত হয়েছে একটি স্মৃতিফলক। যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মহিউদ্দীন খান আলমগীর এটি তৈরি করেন।

খাজুরা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা উল্লেখযোগ্য একটি জনপদ। এ এলাকায় জামায়াতে ইসলামী বিপুলসংখ্যক রাজাকার সংগঠিত করে। অত্যাচার চালায় সাধারণ মানুষের ওপর। তারা খাজুরা এমএন মিত্র ইন্সটিটিউটে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখানে মুক্তিকামী মানুষদের ধরে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালানো হত।
এ এলাকায় ৩০ ব্যক্তি রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যার শিকার হন। তাদেরই স্মরণে এম এন ইন্সটিটিউটে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৯৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করেন শহীদ আবদুল মান্নানের পিতা হোসেন আলী। খাজুরা বিজয় উদযাপন পরিষদ এই স্মৃতিফলক স্থাপনের উদ্যোক্তা। আর এই উদ্যোগের পেছনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. আলতাফ হোসেন ও অধ্যাপক লিয়াকত আলী।

ঝিকরগাছা শহীদ স্মৃতিফলক
মুক্তিযুদ্ধে ঝিকরগাছা উপজেলার অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। উপজেলাটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে লড়াইয়ের ব্যাপকতাও ছিল বেশি। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যার শিকার হন উপজেলার অগণিত মানুষ। তাঁদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ’৯০ সালের ২৬ মার্চ এ উপজেলায় নির্মিত হয় স্মৃতিফলক।

শহীদ ইদরীস ফলক
ইদরীস ছিলেন একজন তরতাজা যুবক। মুক্তিযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। তিনি তখন চৌগাছা উপজেলা এলাকায় মরণপণ লড়াইয়ে রত। এরই মাঝে তার কাছে খবর গেল বাবা-মা ও ভাই-বোনদের উপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামির লোকজন ঘরের সব আসবাবপত্র লুট করে বাংকার তৈরি করেছে। খবর পাওয়া মাত্রই পরিবার নিয়ে ভারতে যাবার জন্যে তিনি বাড়ি আসেন এবং বাবাকে পরিবারসহ ভারতে যাবার ব্যবস্থা করেন। তারিখটি ছিল ১৯৭১ এর ১৮ নভেম্বর। কিন্তু কীভাবে যেন পাকসেনা ও তার এদেশীয় দোসরা খবর পায় ইদরীসের। তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে। এক পর্যায়ে ইদরীস ও তাঁর সহযোগী এবং পাকসেনাদের মধ্যে শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। এই ফাঁকে অন্য সহযোগীরা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারলেও ইদরীস পারেন নি। তিনি একাই এক ঘণ্টা ধরে বীরের মত লড়ে যান। শেষে রসদ ফুরিয়ে গেলে আহত অবস্থায় ধরা পড়েন রাজাকার ও পাকসেনাদের হাতে। তারিখটি ১৯ অক্টোবর।
এরপর তারা ইদরীসকে একটি খেজুর গাছের সাথে বেঁধে ফেলে। তারপর চলতে থাকে নির্যাতন। এ সময় রাজাকারের প্রধান আবদুস সালাম (পরবর্তীতে যশোর সরকারি সিটি কলেজের অধ্যাপক) প্রথম বেয়নেট চার্জ করে ইদরীসের শরীরে। এভাবে তাঁর শরীরে ১৫ জায়গায় বেয়নেট চার্জ করা হয়। শেষে মাথায় ও পেটে গুলি করে নরঘাতকরা। এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে খেজুররস পাড়ার সময় গ্রামের এক কৃষক। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে পারিবারিকভাবে ইদরীসের কবরটি পাকা করা হয়। পরবর্তীতে যশোর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ১৯৮৭ সালে ৩০ অক্টোবর এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে। এখনো প্রতিবছর ১৯ অক্টোবর ইদরীসের স্মৃতিস্তম্ভ লোকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেয়।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের কবর
তাঁর কবর হয়েছে শার্শা উপজেলার এক অখ্যাতপল্লী কাশীপুর দক্ষিণপাড়ায়। এখানে শুয়ে আছেন আরও ৫ জন। তাঁরা হলেন, সুবেদার মনিরুজ্জামান, মাগুরা জেলা থেকে নির্বাচিত সংসদসদস্য আতর আলী, আবদুস সাত্তার, বাহাদুর ও এনামুল হক। পরবর্তীতে সরকার এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে।
বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যুদ্ধরত অবস্থায় পাকসেনাদের মর্টারের গোলায় শহীদ হন। ঘটনাটি ঘটে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গোয়ালহাটি গ্রামে। তাঁর সাথে ছিলেন দু’সহযোদ্ধা। ছুটিপুর ঘাঁটির পাকিস্তানি সৈন্যদের উপর নজর রাখার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব ছিল তাঁর। মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি একসময় বুঝে ফেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা। শত্র“র নজর পড়ে ৩ জনের উপর। পাকসেনারা অবিরাম গোলাবর্ষণ শুরু করে। নূর মোহাম্মদ বুঝতে পারেন তিনি জীবনের শেষ যুদ্ধের মুখোমুখি। নূর মোহাম্মদের দুই সহযোদ্ধার অন্যতম ছিলেন নান্নু মিয়া। একপর্যায়ে নান্নু মিয়া বুলেটবিদ্ধ হন। তখন নান্নুকে তিনি কাঁদে তুলে নেন এবং এক হাতে গোলাবর্ষণ করতে থাকেন। এরই একপর্যায়ে নূর মোহাম্মদ মর্টারের গোলায় আহত হন। তখন অপর সঙ্গী মোস্তফাকে নির্দেশ দেন নান্নুকে নিয়ে যেতে। মোস্তফা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান নান্নুকে। কিন্তু নূর মোহাম্মদ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলেন বর্বর পাকসেনাদের বিরুদ্ধে।
এসব স্মৃতিফলক বা সৌধ ছাড়াও যশোরের বিভিন্ন স্থানে গ্রামেগঞ্জে ৩০টি গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলমের আর্থিক সহযোগিতায় ১২টি কবর পাকা করেছে।

উজ্জ্বলপুরে ৫ মুক্তিযোদ্ধার কবর
মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের সন্ধিক্ষণে ১৩ নভেম্বর গ্র“প কমান্ডার আবদুল খালেকসহ পাঁচ বীরমুক্তিযোদ্ধা এক সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুরে পাকবাহিনীর সাথে ওই যুদ্ধে শহীদ হন কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের আবদুল খালেক, মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা গ্রামের নূরুল ইসলাম, হানুয়ার গ্রামের জামশেদ হোসেন, আবদুর রাজ্জাক এবং গৌরীপুর গ্রামের জামাল উদ্দীন খান। এ পাঁচ শহীদকে উজ্জ্বলপুরে একই কবরে দাফন করা হয়।
আবদুল খালেক মুক্তিযুদ্ধের সময় এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনীর তাণ্ডবে যখন বিধ্বস্ত হচ্ছিল জনপদ, তখন মঙ্গলকোটও তা থেকে বাদ পড়েনি। এমনি এক সময় বাবা-মায়ের বন্ধন ছিন্ন করে আবদুল খালেক বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। চলে যান ভারতে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শেষে প্রবেশ করেন দেশের অভ্যন্তরে। অংশ নেন মহান যুদ্ধে। এক সময় ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুরে অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একত্রিত হন।
তারা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রাজগঞ্জ ক্যাম্প আক্রমণের, ঠিক তখনই ১৩ নভেম্বর খবর পান পাকবাহিনী তাদের দিকে আসছে। তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে একপর্যায়ে গোলা-বারুদের সংকট দেখা দেয়। তখন আবদুল খালেক অন্যদের পিছু হঠার নির্দেশ দিয়ে একা পাক বাহিনীর সাথে লড়তে থাকেন। তার সঙ্গীরা অনেকেই নির্দেশ মেনে পিছু হটলেও উল্লিখিত যোদ্ধারা তার সাথেই থাকেন। এক পর্যায়ে পাকবাহিনীর গুলির মুখে পড়ে তারা শহীদ হন। ওই যুদ্ধে পাকবাহিনীরও বেশ ক’জন হতাহত হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী ডা. ওমর আলী জানান, সেদিন আবদুল খালেকের বিচক্ষণতায় ও তাঁর জীবন উৎসর্গের বিনিময়ে উজ্জ্বলপুর গ্রাম যেমন রক্ষা পায়, তেমনি যুদ্ধের বহু সরঞ্জাম পরে মুক্তিযোদ্ধারা অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধের ওই বীরসেনানীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে তাদের কবরটি পাকা করা হয়েছে।

উপশহর পার্ক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
যশোর নতুন উপশহর পার্কে স্থাপন করা হয়েছে ১৪ শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। উপশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাবেরুল হক সাবুর নির্মিত এ স্তম্ভটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ। এ স্তম্ভে লিপিবদ্ধ আছে ১৪ জন শহীদের নাম। তাঁদের ঠিকানা এবং বিস্তারিত পরিচয় জানা না গেলেও ধারণা করা হয় দেশের স্বার্থে আত্মদানকারী এসব শহীদরা সবাই উপশহরেরই বাসিন্দা।
ফলকে লিপিবদ্ধ শহীদরা হলেন, সুজাউদ্দিন, আবুল হোসেন, সিদ্দিক হোসেন, মিজানুর রহমান, নায়েব শহিদুল্লাহ, আবদুল করিম, কাদরিয়া, আবদুল লতিফ, আবদুল সিদ্দিক, আতিকুল্লাহ, টাইট, আবদুর রশিদ, আবদুর রহিম ও শাহাদত হোসেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপশহর এলাকার অধিকাংশ বাঙালিবাসিন্দা অন্যত্র চলে যায়। এখানে বসবাসরত অবাঙালিদের একাংশ পাকহানাদার বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে নিরীহ বাঙালিদের ধরে হত্যা করতো। ওই সময় শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের অনেকের লাশ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে আলাপে জানা যায়, উপশহরের উত্তর পাশে নিরিবিলি এলাকায় স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালিদের নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হত। এছাড়া ‘বি’ ব্লকের তেঁতুলতলার কাছে একটি কূপের মধ্যে লাশ ফেলা হত। সেই কূপটি এখন নেই।
পুলিশ লাইন স্মৃতিস্তম্ভ
যশোর পুলিশ লাইনে স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। যশোর জেলার বিভিন্নস্থানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা শহীদ হন তাঁদের নাম এ স্মৃতিস্তম্ভে লেখা আছে। সে সব শহীদ পুলিশরা হলেন, ইন্সপেক্টর গোলাম রব্বানী, এসআই সদরুজ্জামান, এসআই এটিএম মাহবুব আলী, এসআই সেকেন্দার আলী সরদার, এসআই শামসুর রহমান, এসআই আবদুল করিম হাওলাদার, এসআই এমদাদুল হক, এসআই সোহরাব হোসেন শেখ, এসআই আবদুর রশিদ হাওলাদার, এসআই আবদুল ফাত্তাহ খান, এসআই ইমরান আলী গাজী, আমর্স এস আই আলিমুজ্জামান, এএসআই আনোয়ার হোসেন, হাবিলদার আবদুল আজিজ, এসআই মাহফুজুল হক, হাবিলদার ইরফাজুর রহমান চৌধুরী, হাবিলদার লতিফ তালুকদার, হাবিলদার আবদুস সালাম, হাবিলদার আবু ওসমান, হাবিলদার ওসতার আলী, নায়েক ফজলুল বাসেত খান, কনস্টেবলদের মধ্যে যারা শহীদ হয়েছিলেন কলিমউদ্দিন, সাহেব আলী, ইসহাক আলী, আতিয়ার রহমান, খান মহিউদ্দীন, আবুল খায়ের, রিজামুল হক, আবদুল মান্নান, করম আলী, ফরহাদ হোসেন, আবদুর রশিদ খন্দকার, বেলায়েত হোসেন, শামসুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, আবদুল গফুর, আবদুস সাত্তার, হায়াতুন নবী, কাজী সিরাজুল ইসলাম, মুসলিম আলী, মজম আলী, মকবুল হোসেন, আবদুল ওহাব শেখ, শেখ সোহরাব হোসেন, আজমল হোসেন, শেখ হুরমুজ আলী, তবিবুর রহমান, আবদুল জলিল শরীফ, মোদাসসের আলী, আজহার আলী, আবদুস সামাদ, সোহরাব উদ্দীন, নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, আকরামুজ্জামান, হিমাংশু বিকাশ চন্দ্র, আব্দুল মোতালেব, আবদুল ওহাব, আবদুল হাকিম, খন্দকার আবদুস সালাম, মেসবাহউদ্দিন, শামসুদ্দিন বিশ্বাস, হায়াৎ আলী, মহসিন আলী, জালু শেখ, শাহ আলম, মোফাজ্জল হোসেন, হাসান আলী, আবদুস সালাম, আনসার আলী ও কনস্টবেল রোস্তম আলী।
মনিরামপুরের সমাধিস্থল
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজারে হরিহর নদের ধারে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন পাঁচ সূর্যসনিক। এরা হলেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা অমিত সম্ভাবনাময় যুবক আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু। ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর রাতে পাকিস্তানি হানাদারদের এদেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনী তাঁদেরকে চিনাটোলা বাজারে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে দক্ষিণবঙ্গের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছাত্র-জনতাকে সংঘটিত করার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিলেন এই যুবকেরা। ২২ অক্টোবর তারা সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বগা গ্রাম থেকে আসেন মণিরামপুরে। সেখানে রতেœশ্বরপুর গ্রামে আশ্রয় নেন আবদুর রশিদ নামে একজনের বাড়িতে। সেখানে রাত কাটানোর সময় তাঁদের অবস্থানের কথা জেনে যায় গ্রামের রাজাকার ক্যাম্পের দালাল রায়হান সরদার। ২৩ অক্টোবর সকালে সে খবর দেয় ক্যাম্পে। বিকেল নাগাদ রাজাকাররা ঘিরে ফেলে ওইবাড়ি। গ্রেফতার করে সবাইকে। রাজাকারদের মধ্যে ইসহাক নামের একজন কমাণ্ডার ছিল। সে ওই সময় যশোর এম এম কলেজের ছাত্র সংঘের নেতা ছিলো। ইসহাক আসাদকে দেখেই উল্লাসে ফেটে পড়ে। বলতে থাকে এই শয়তানের বাচ্চার জন্য আমরা কলেজে কথা বলতে পারি নি। আটক ছাত্রনেতাদের উপর সেখানেই তারা মনের সুখে প্রহার করতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় চিনাটোলা বাজারে। সেখানে হরিহর নদের ব্রিজের উপর নিয়ে প্রথমে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাদের একসাথে গুলি করে রাজাকাররা। লাশ ভাসতে থাকে নদীতে। নদী পাড়ের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষ সাহস করে লাশগুলো তুলে নদীর পাড়ে একই কবরে সমাহিত করেন।
দেশ স্বাধীনের পর মক্তিযোদ্ধারা আটক করে এই পাঁচ সূর্যসৈনিক হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত দুই রাজাকার কমান্ডার ইসহাক ও আজিজকে। দু’জনেরই বাড়ি মণিরামপুর উপজেলার আটঘরা গ্রামে। মুক্তিযোদ্ধারা পরে এই দুই রাজাকারকে খতম করে। এরপরও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা আটঘরা গ্রামে যেতেন এবং ওই দুই রাজাকারের কবরে গুলি ছুড়তেন।
শহীদ পাঁচ ছাত্রনেতার স্মৃতি ধরে রাখতে চিনাটোলায় যশোর-সাতক্ষীরা (ভায়া কেশবপুর) সড়কের পাশে দায়সারা গোছের একটি সমাধি করা হয়েছে। প্রতিবছর এই সমাধিস্থল ভরে যায় ফুলে-ফুলে।