শামসুর রহমান কেবল
শামসুর রহমান কেবল
শামছুর রহমানের জন্ম ১৯৫৭ সালের শার্শা উপজেলার শালকোনা গ্রামে। ডাকনাম কেবল। এই নামেই যশোরের মানুষ তাঁকে বেশি চিনতেন। ৬ বোন ২ ভায়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
১৯৭২ সালে লক্ষণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৭৪ সালে যশোর সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৭৭ সালে যশোর সরকারী মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ(অনার্স) এবং ১৯৭৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন তিনি। কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৭ সালের ১ জুন যোগদান করেন সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক জনকণ্ঠে। শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওই পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি। শামছুর রহমান নিহত হবার সময় তার বড় মেয়ে সেজুঁতি রহমান পড়তেন যশোর সরকারী গালর্স স্কুলে। আর ছোট মেয়ে প্রণতি যশোর সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণীর ছাত্রী।


“সব অর্জনে আনন্দ আছে। দু’হাজার সালকে স্পর্শ করতে পারা আমার কাছে অর্জন। মৃত্যু যেখানে বার বার দরজায় উঁকি দিচ্ছে, সন্ত্রাসীদের উদ্যত সঙ্গীন যেখানে তাক করা, সেখানে বিংশ শতাব্দীকে অতিক্রম করা কি আমার জন্য পরম পাওয়া ?... এ প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। কিন্তু আমার অনুভূতিতে কি শতাব্দীকে আলিঙ্গন করা, নতুন সূর্যোদয়কে প্রত্যক্ষ করা-এসবই যেন নিত্যা দিনের ঘটনা। মহাকালের কাছে আমার অস্তিত্ব ধুলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। যতক্ষন বেঁচে আছি, ততক্ষণই আমার অস্তিত্ব। হয়তো এই স্বার্থকতা আর স্বপ্ন মিলে মিশেই আগামী কালের জন্য অপেক্ষা।......’’
নির্ভীক সাংবাদিক শামছুর রহমান ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি ডায়েরির পাতায় এই কথা গুলো লিখেছিলেন। তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন না। ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কালীদাসপুরে কাজী আরেফ আহমেদ নিহত হওয়ার ঘটনা, একই বছরের ৬ মার্চ মধ্যরাতে যশোরে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলায় ১০ নিহত, ৭ জুন যশোরের টাউন হল ময়দানে প্রথম চরমপন্থীদের আতœসমর্পণ এই সব ঘটনা ছাড়াও খুলনার এবং ঝিনাইদহের সন্ত্রাসীদের নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন তিনি। আর এ কারণে চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা তাঁকে নানা ভাবে হত্যার হুমকি দিতো। এ জন্য তিনি চিন্তিত থাকলেও তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল সন্ত্রাসীরা তাঁর অফিস কক্ষে এসে হত্যা করতে পারবে না। আর তার এই অগাধ বিশ্বাসই তাঁর মৃত্যুর কারণ। এ কারণেই মৃত্যুর আগে মাঝে মাঝে তাঁকে বিষন্ন দেখাত। তাই ২০০০ সালের প্রথম কয়েক দিন তিনি অনিয়মিত ডায়েরি লেখেন। তাঁর মনের কথা তিনি বলেন যান ডায়েরিতে।

শামছুর রহমানকে খুন করা হয় যশোর শহরের আড়াইশ শয্যা হাসপাতালের সামনে দৈনিক জনকণ্ঠ অফিসে। ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাত ১৫ মিনিটে। তাঁর ছোট ভাই সাংবদিক সাজেদ রহমান এ সময় অফিসের সামনে পত্রিকার এজেন্টের কাছে যান। এ ঘাতকরা দৈনিক জনকণ্ঠ অফিসে ঢুকে তাঁর কপালে এবং বুকের বাম পাশে গুলি করে পালিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে আসেপাশের লোকজন চলে আসেন। তারা শামছুর রহমানকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষনা করে। শহীদ হন একজন কলম যোদ্ধা।
পরদিন নিহতের স্ত্রী সেলিনা আকতার লাকি কোতয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলায় কাউকে আসামী করা না হলেও তাঁর হত্যার ব্যাপারে ৪/৫টি কারণ উল্লেখ করেন। এ গুলো হলোঃ যশোরের চোরাচালান সিন্ডিকেট, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের হুন্ডি সিন্ডিকেট, খুলনার সন্ত্রাসী ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু এবং ঝিনাইদহের চরমপন্থী গণমুক্তিফৌজের ক্যাডারদের নিয়ে লেখালেখি।

সাধারন মানুষ এবং নিহতের পরিবার মনে করেন ঝিনাইদহের গণমুক্তিফৌজের সন্ত্রাসী, যশোরের চোরাচালান সিন্ডিকেট এই দুই গোষ্ঠী জড়িত ছিল তার হত্যার পেছনে। কারণ শামছুর রহমানের লেখালেখিতে ওই দুই গোষ্ঠী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল বেশি এবং ওই দুই গোষ্ঠী মধ্যে ছিল অপুর্ব মিল।হত্যাকান্ডের এতদিন পর এখন অনেক জিনিষ, অনেক ঘটনা বের হয়ে আসছে, সাধারন মানুষ এবং নিহতের পরিবারের কাছে স্পষ্ট পরিস্কার কারা এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত। আর তাদের উদ্দেশ্যে কি ছিল। পুলিশের বিপুল অর্থ বাণিজ্য এবং রাজনীতির কারণে এই গুরুত্বপুর্ন এবং চাঞ্চল্যকর মামলাটি শেষ হয়ে গেল। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তন হলে এই মামলা নিয়ে আবার শুরু হয় রাজনীতি। মামলার পুনরায় তদন্ত হয়। তদন্ত শেষে আসামী করা হয় শামছুর রহমানের ঘনিষ্ট বন্ধু ইত্তেফাকের সাংবাদিক ফারাজী আজমল হোসেনকে। আর সাক্ষী করা হয় মামলার আসামীদের ঘনিষ্টজনদের।
বর্তমান শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এত বছরেও বিচার কাজ শেষ হয়নি এই মামলার।

শামছুর রহমানের পিতা সোহরাব উদ্দিন ছিলেন একজন প্রগতিশীল ব্যক্তি, গ্রাম্য চিকিৎসক। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতীয় সংবাদিকদের কে নিয়ে আসতেন যশোরের সীমান্ত এলাকায়। বর্ননা করতেন এদেশের মানুষের সাহসী কাহিনী। তা প্রকাশিত হতো ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। এই মানুষটি নিখোঁজ হন ১৯৭১ সালের ২৯ জুন। এখনও তার খোঁজ মেলেনি। ওই রাতে একদল দুর্বৃত্ত তাঁকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ১৫ দিন পরে রাজাকারদের হাতে নিহত হন ঝিকরগাছার মাটিকুড়া গ্রামে শশুরবাড়ি শামছুর রহমানের চাচাতো ভাই মনসুর উদ্দিন। এই ঘটনায় পুরো পরিবার ভেঙ্গে পড়েন। অনেক কষ্টে লেখা পড়া করেন শামছুর রহমান। শামছুর রহমানের মা খায়রুন্নেছা (৭০) তাঁকে ডাকতেন খোকন বলে। তাইতো তার প্রিয় খোকন নিহত হলে তিনি মুষড়ে পড়েন। গ্রাম থেকে চলে আসেন শহরে ছোট ছেলের বাসায়। তাঁর প্রিয় নাড়িছেড়া ধন খোকনের কোন কথা শুনতে চান না কারও কাছে। বাসায় শামছুর রহমানের ছবি রাখা নিষেধ। ছবি রাখা নিষেধ গ্রামের বাড়িতেও। তাঁর কথা “আমি তাঁর ছবি দেখে সহ্য করতে পারব না। যদি হত্যাকারীদের বিচার হয় তখন ছবি বাসায় টাঙিয়ে রেখে”। কিন্তু শামছুর রহমান হত্যাকান্ডের অনেক বছর পার হলেও এখনও বিচার কাজ শেষ হয়নি। এর যে সঠিক বিচার হবে সেটাও ভাবেননা তাঁর পরিবার। তাই খায়রুন্নেছার মৃত্যুর আগে তাঁর পুত্রের বিচারও দেখে যেতে পারবেন না। দেখে যেতে পারবেন না বাড়িতে রাখা আছে শামছুর রহমানের রাখা একটা ছবি। ছোট মেয়ে প্রণতি রহমানের বয়স তখন আড়াই বছর তার তখন বোঝার কোন বয়স হয়নি। তাই তো বাবা মারা যাবার পর চারিদিকে দেয়ালে বাবার ছবি দেখে তার প্রশ্ন ছিল মা, বাবা আসছেন না, দেয়ালে কেন বাবার ছবি?


নাম : শামছুর রহমান,

পিতার নাম : মরহুম সোহরাব উদ্দিন, গ্রাম : শালকোনা, ডাকঘর : শালকোনা, থানা : শারশা ,জেলা : যশোর

জন্ম তারিখ : ৫ মে, ১৯৫৭

শিক্ষাগত যোগ্যতা :
এসএসসি-১৯৭২ , এইচএসসি-১৯৭৪, বিএ(অনার্স)-১৯৭৭ শিক্ষাবর্ষ (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) , এম.এ-১৯৭৮ শিক্ষাবর্ষ (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য)

পেশাগত বিবরণ :

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ঠিকানা (যশোর) ১৯৮০-৮১
নিজস্ব সংবাদদাতা, নোয়াপাড়া দৈনিক বাংলা ১৯৮২-৮৩
নিজস্ব সংবাদদাতা, যশোর-দৈনিক বাংলা ১৯৮৪-৮৬
স্টাফ রিপোর্টার ও সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার,দৈনিক বাংলা ৯৮৬(নভেম্বর)১৯৯৩
ব্যূরো প্রধান, দৈনিক বাংলা(যশোর)। দৈনিক বাংলায় নিয়মিত রাজনীতি,সমাজ,অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশ। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নিয়মিত রিপোর্ট ও বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশ। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আন্তর্জাতিক বিভাগে ভারতীয় রাজনীতির উপর পাঁচ শতাধিক লেখা প্রকাশ। এছাড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক গনশক্তি পত্রিকায় বিভিন্ন বিভাগে লেখা প্রকাশ। ১৯৯৭ সালের ১ লা জুলাই দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিনিধি (সিনিয়র রিপোর্টার) হন। পরে ১৯৯৯ সালের ১ নবেম্বর বিশেষ প্রতিনিধি হন।

প্রকাশনা :
ধূসর সীমান্তে (উপন্যাস)প্রকাশ-১৯৯২
রাজনীতির জ্যোতি বসু ( রাজনৈতিক জীবনী) প্রকাশ-১৯৯৫
একজন বড় মানুষের গল্প (শিশুতোষ জীবনীমালা) প্রকাশ-১৯৯৩

লেখক নাম: রেহমান শামস

শহীদ হন : ১৬ জুলাই-২০০০ জনকণ্ঠের যশোর অফিসে রাত ৮ টা ২০ মিনিটে।


সম্পাদনা: অনন্ত পলাশ