সাকিব আল-হাসান
সাকিব আল হাসান

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁর অভিযানপরিচালনার সময় (অনেকে বলেন দখল করার ইচ্ছায়) তারই,সেনাপতি সেলুকাস নিকেটারকেবলেছিলেন কি বিচিত্র এই দেশ সত্যি সেলুকাশ। আলেকজান্ডারের এই উক্তিটিপরবর্তীতে প্রবাদরুপে প্রচলিত হয়েছে। দেশে কোন অসংগতি লক্ষ্য করলেই আমাদের দেশেরমানুষ এই উক্তিটি করে থাকে। সাধারন মানুষকে আর দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা যখন দেখেউদয়াস্থ পরিশ্রম করার পরও দেশটি শুধু অসৎ মানুষের দখলে চলে যাচ্ছে, তখন তাদের এইপ্রবাদের আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। তাদের চোখের সামনেই মান-সন্মান এবংঅর্থ-বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যায় অসৎরা তখন তাদের এই উক্তির আশ্রয় নিতেই হয়। তারাদেশের কোন সেক্টরেই নিজেদের রোল মডেলকে খুঁজে পান না। তাই প্রশ্ন আসতে পারে দেশেরকোন ক্ষেত্রেই কি কোন সৎ এবং যোগ্য লোক নেই, যাকে রোল মডেল করে আমাদের এই দেশটিসামনের দিকে এগিয়ে যাবে। উত্তরে বলতে হয় অবশ্যই এমন মানুষ আছে বলেই আমাদের দেশটিএখনো এগিয়ে যাচ্ছে। এসব অসংখ্য মানুষের কাতারে সামনের সারিতেই আছেন আমাদের জাতীয়ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। যিনি আমাদের বাংলাদেশের ক্রীড়াপাগল লাখো-কোটিতরুন যুবকের রোল মডেল। যদিও তিনি যে খেলাটি খেলেন সেটিতেও কলঙ্কের ছাপ লেগেছে।কিন্তু সাকিব আল হাসান তার গায়ে এই ছোঁয়া লাগতে দেননি বলেই এই টাইগার ক্রিকেটারআমাদের কাছে রোল মডেল। ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল ছিলেন তিনি। মাগুরার মতো একটি কমপরিচিত জেলাকে আজ নিজ গুনেই আলোকিত করে ফেলেছেন এই দেশসেরা ক্রিকেটার। আজ যেক্রিকেটের জন্য তার এতো নাম-ডাক শৈশবে কিন্তু ক্রিকেট তার প্রথম পছন্দের খেলা ছিলনা। তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল ফুটবলকে ঘিরে। নিজে যেমন বড় ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন তেমনিতার বাবা মাশরুর রেজা কুটিল একই স্বপ্ন দেখতেন যে ছেলে বড় হয়ে দেশ সেরা ফুটবলারহবে। তার ফুটবলের যাদুতে মন্ত্র-মুগ্ধ হয়ে যাবে গ্যালারির লাখো দর্শক। হিসাবটাতিনি খুব একটা ভুল করেননি। দেশসেরা ফুটবলার না হলেও তার ছেলে আজ দেশসেরাক্রিকেটার। তবুও মনের কোনে কিছুটা আক্ষেপ তার পুষে রাখাই স্বাভাবিক। কারণ কৃষিব্যাংকের এই কর্মকর্তাটি নিজ যৌবনে মাগুরার জেলা দলের হয়ে নিয়মিত ফুটবল খেলেছেন।তার আক্ষেপের উপযুক্ত দাওয়াই বা ঔষধ তার ছেলে সাকিব নিজেই দিয়েছেন তার কর্ম দিয়ে।কারন ফয়সাল (সাকিব আল হাসানের ছদ্দ বা ডাক নাম) যে আজ শুধু দেশসেরা নন বিশ্বের একনম্বর অলরাউন্ডার ক্রিকেটারও ওডিআইতে। সাকিব এবং হাফিজ কিংবা ওয়াটসন এই তিনজনেরমধ্যেই এক নম্বর হওয়ার ইঁদুর দৌড় লেগে থাকে।

টেস্টে সেটা জ্যাক কালিস এবং সাকিবেরমধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব বিশ্বসেরা ক্রিকেটারকে টক্কর দিতে পারেন বলেই তিনি আমাদেরটাইগার ক্রিকেটার সাকিব। এরই ফলসরূপ২০০৯ সালে উইজডেন কর্তৃক টেস্ট প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ারও নির্বাচিত হয়েছেন । কিন্তুতার এই পথচলা বা রোল মডেল হওয়ার পথটি কখনোই একেবারে মসৃন ছিল না। পূর্বেই বলাহয়েছে বাবা চেয়েছিলে ছেলে ফুটবলার হোক কিংবা সেটা না পারলে ডাক্তার হয়ে দেশে সেবাকরুক । গৃহিনী মা শিরিন রেজা একই রকম ইচ্ছে পোষন করতেন। একমাত্রছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌসরীতু জানতেন তার ভাইয়া বড় কিছুই হবেই। কিন্তুসাকিবের পড়াশোনায় মন ছিল না। ফুটবল নিয়েই পড়ে থাকতেন তার রাত-দিন। ১৯৯৭ সালে মনেহয় তার জন্য অন্যরকম বার্তা নিয়ে এসেছিল। সেবছরই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেনিয়াকেহারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয় করে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ লাভ করে এবং সাকিবের মনেওক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। বাবা-মা সাকিবের এই পরিবর্তনকে একজন কিশোর নানাখেলায় মত্ত থাকার মতো ভেবেছিলেন। তবে সেটা যেন তার লেখাপড়ার কোন ক্ষতি না করেএইব্যাপারেতার সচেতন ছিলেন। বাবা তার সাকিবের ছোটবেলায়স্মৃতিচারন করতে গিয়ে ছিলেন িকমতো লেখাপড়া না করা এবং একদিন সন্ধার আগে বাসায় না ফেরায়তাকে মেরেছিলাম। মামার কাছ থেকে উপহার পাওয়া তার ক্রিকেট ব্যাটটিও ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। মাগুরা ক্রিকেট একাডেমির কোচ,পরিচালক এবং প্রতিষ্ াতাসৈয়দ সাদ্দাম হোসেন গোর্কিকে সাকিব এই দুঃখ নিয়ে বলেছিলেন বাবা ব্যাটটা না ভেঙ্গে আমাকে আরো মারতো। এই গোর্কি শেষ পর্যন্তসাকিবের জীবনের বড় অংশ দখল করে নেন যেমন নিয়েছেন শচীন টেন্ডুলকারের ছোটবেলার কোচ রামাকান্তআরচেকার। ২০০০সালে মাগুরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে জীবনের প্রথম বড় কোন ক্রিকেটম্যাচ খেলতে নামেন সাকিব। মাগুরা জেলার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি সেদিন। তারপরজেলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ মাগুরা জেলা দলের হয়ে ঝিনাইদহের স্টেডিয়ামে খেলতে যান। ২০০১সালে বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষন কার্যক্রমেমাগুরা জেলার হয়ে নড়াইল ক্যাম্পের জন্য মনোনীত হন। নড়াইল ক্যাম্প থেকে ঢাকারসাভারেও মূল বিকেএসপিতে নিবিড় প্রশিক্ষ নেয়ার ২০ জনের দলে সাকিবও একজন হিসাবে অর্ন্তভুক্ত ছিলেন।বিকেএসপির তৎকালীন ক্রিকেট প্রশিক্ষন আশরাফুল ইসলাম বাপ্পী এবং সাকিবের হাতেখড়ি যেকোচের কাছে সেই সৈয়দ সাদ্দাম হোসেন গোর্কিও পরামর্শে সাকিবের বাবা সাকিবকেবিকেএসপির ক্রিকেট বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন। এরপর যেন স্বপ্নের মতো পথচলা শুরু হলো সাকিব আল হাসানের। বিকেএসপিতে ভর্তিহয়ে বাংলাদেশের জন্য বয়সভিক্তিক অনূ্‌ধ্ব-১৫,অনূধ্ব-১৭,অনূধ্ব-১৯ হয়ে খেলার সুযোগপান নৈপূন্য প্রদর্শন করেন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয় দলে ডাক আসে। ২০০৬ সালের আগস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারাতে তার ওয়ানডে অভিষেক হয়। অলরাউন্ডারহিসেবে সেই ম্যাচে খুব আহামরি কিছু না করলেও খুব একটা খারাপও করেননি সাকিব , যাতেনির্বাচকরা পরবর্তীতে তাকে তুড়ি মেরে দল থেকে বের করে দিতে পারে।বল করে ১ উইকেটের পাশাপাশি ব্যাটিং এর ৩০ রানতার মাঝে যে প্রতিভা আছে তার কিছুটা স্ফুরণ ঘটান সাকিব। ২০০৭ সালে ওয়েস্টবিশ্বকাপে সুযোগ পান সাকিব। ভারতের বিপক্ষে জয়ে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন তিনি।ব্যাট হাতে অর্ধশতকের পাশাপাশি বল হাতেও ইকোনোমিক স্পেল করে দলের জয় ভূমিকা রাখেন।ক্যারিবীয়াদের মাটিকে এবং ২০০৭ এরবিশ্বকাপকে নিজেকে প্রকাশের মঞ্চ যেন বানিয়ে ফেলেন সাকিব। এই বছর ৯টিওয়ানডে খেলে সাকিব করেন ২০২ রান ২৮.৮৫ গড়ে। কিন্তু তখনো টেস্ট খেলার স্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিলেন এই মাগুরার ক্রিকেটার । ভারত সেবছরেরমে মাসে বাংলাদেশ সফরে আসে ২টি টেস্ট এবং তিনটি ওয়ানডে খেলতে। ভারতের বিপক্ষে ১৮মে ২০০৭ সালে তার টেস্ট অভিষেক হয়। ব্যাট এবং বল হাতে বড় কিছু করতে পারেননি। ২৭রান করলেও কোন উইকেট লাভ করেননি।এর পর বাংলাদেশের সাফল্যের টুপিতে আরো একটি পালকযুক্ত করেন সাকিব আল হাসান। টি-২০ বিশ্বকাপ ২০০৭ দক্ষিন আফ্রিকায় বাংলাদেশেক্যালিপসোদের পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। এই ম্যাচে সাকিব ৪উইকেট নেন ৩৪ রানের বিনিময়ে। নিউজিল্যান্ডের প্রথম টেস্টে শিকার। ২০০৮ সালেসিরিজের প্রথম টেস্টোই সাত উইকেট নেন ৩৬ রানের বিনিময়। টেস্টে ক্রিকেটে এটা কোনবাংলাদেশী বোলারের সেরা বোলিং ফিগার।

২০০৯ সালো ২২ শে জানুয়ারি আইসিসি কর্তৃক মাগুরার ইএ ক্রিকেটারকে বিশ্বসেরাঅলরাউন্ডার হিসেবে নিজেদের র‌্যাংকিং প্রকাশ করে। এবছরই সাকিব দলের সহাধিনায়কনির্বাটিত হন। যদিও নানা জটিলতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুল দলটি ছিলনা তা হলেও বাংলাদেশ২০০৯ সালে ক্যারিবীয়দের তাদের মাটিতেই শুভ্র ধৌত করে। মাশরাফি বিন মর্তুজা সেইসফেও অধিনায়কত্ব করার কথা ছিল কিন্তু প্রথম টেস্টে হাঁটুর ইনজুরির জন্য তিনি দলথেকে বাদ পড়ে যান। এবং মুলত পুরো সিরিজেই সাকিব নেতৃত্ব প্রদান করেন। সেবছরইবাংলাদেশের প্রথম কোন ক্রিকেটার হিসেবে কাউন্টি ক্লাব উস্টারশায়ার এর সাথে চুক্তিকরেন কাউন্টি চ্যাম্পিয়াশীপের ২য় বিভাগে খেলার জন্য। মিডলসেক্রর বিপক্ষে এক ম্যাচেসাত উইকেট নিয়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে নিজের জীবনের সেরা বোলিং ফিগারের দেখা পান।৮ম্যাচে সেবছর ২৫.৫৭ গড়ে করেন ৩৫৪ রান। ২২.৩৭ গড়ে নেন ৩৫ উইকেট। উস্টারশায়ারকেপ্রথম বিভাগে উন্নীত করার পেছনে তার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। ২০১১ সালে আইপিএলে কলকাতানাইট রাইডার্স এর হয়ে খেলার জন্য নিলামে তাকে কেনা হয় ৪২,৫০০০ মার্কিন ডলারে। ত্থতীয়বাংলাদেশী হিসেবে তিনি আইপিএলে খেলার সুযোগ পান। এর পূর্বে রাজ্জাক এবং মাশরাফিসুযোগ পেয়েছিলেন। ২০১২ সালে বিপিএলে খুলনা রয়েল বেঙ্গলস এ অধিনায়ক তাকে করা হয়। সেবছর ১০ম্যাচ খেলে ২৮০রান করেন এবং ১৫ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হন।২০১৩ সালে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্স তাকে পেতে খরচ কেও ৩৫,৫০০০ মার্কিন ডলার। ১২ ম্যাচে৩২৯ রান এবং ১৫ উইকেট নিয়ে আবারো ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হন। এরপর জীবনের আরেকটিঅধ্যায় শুরু করেন সাকিব আল হাসান। লন্ডন প্রবাসী উম্মে আহমেদ শিশিরকে বিয়ে করেনসাকিব। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে তারা দুজন পরিণয়সুত্রে আবদ্ধ হন। ২০১৩ তে আবার কাউন্টি ক্লাব লিচেস্টার এর হয়ে খেলার জন্য চুক্তিকরেন। তার এই কাউন্টি ক্রিকেট খেলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছু কালো অধ্যায়উম্মেচিত যা থেকে দূরেআছেন বলেই সাকিবনিয়ে আমাদে এতো গর্ব। এই পযন্ত এইটাইগার খেলোয়াড় ৩০ টি টেস্টে খেলেছেন রান করেছেন ১৯৮৪ যার মধ্যে তার সর্বোচ্চইনিংস ১৪৪ শতক করেছেন দুটি এবং অর্ধশতক তেরটি। টেস্ট তার ব্যাটিং গড় ৩৬.০৭। টেস্টেউইকেট নিয়েছেন ১০৬টি যার মধ্যে তার সেরা হল ৩৬ রানের বিনিময়ে সাত উইকেট। চার উইকেটপেয়েছেন চারবার এবং পাঁচ উইকেট নয় বার্‌ গড় তার ৩২.৭৯। ওয়ানডে খেলেছেন ১২৯ এবং রানকরেছেন ৩,৬৮৮। সেরা ১৩৪ রানে নটআউট। গড় তার ৩৫.১২। শতক করেছেন দুটি এবং অর্ধশতকপঁচিশ্‌ উইকেট নিয়েছেন ১৬১ এবং সেরা ষোল রানের বিনিময় চার উইকেট। চার উইকেটনিয়েছেন চার বার। গড়২৯.৩৭। টি-২০ খেলেছেন ২৬টি। তার এই ক্যারিয়ার দিন দিন আরো শোভাবর্ধন করুক এটাই সকল বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমীর কামনা।