কেশবপুরে কালোমুখো হনুমানের দিনকাল
কালোমুখো হনুমানের দল আজ ভালো নেই

যশোর জেলা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের কেশবপুর উপজেলা সদরে বাসযোগে পৌছালে শহরেই মিলবে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান। রামায়ণের ”রামভক্ত হনুমান দলকে ঘিরে যশোরের কেশবপুর উপজেলা পৃথিবীর বুকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বদৌলতে আজ সুপরিচিত জনপদ। কিন্তু যাদের নিয়ে আজকের এ পরিচিতি সেই কালোমুখো হনুমানের দল আজ ভালো নেই। সরকারিভাবে খাদ্যের ব্যবস্থা করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়া, প্রয়োজনীয় অভয়ারণ্য না থাকায় তাদের বসবাস ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হনুমান দেখতে দর্শনার্থীরা এসে থাকেন। তারা নিজ হাতে এদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করে থাকেন।

মানুষের সাথে সখ্য ঃ খাদ্যের সন্ধানে এরা লোকালয়ে ঘুরে ফিরে মানুষের হাত থেকে খাদ্য চেয়ে নেওয়া, সুযোগ পেলে দোকান থেকে হাত বাড়িয়ে বিস্কুট, কলা, রুটি নিয়ে চলে যায়। তারপরও ব্যবসায়ীরা এদের উপর বিরক্ত হন না। কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের সাথে মানুষের রয়েছে বিশেষ সখ্য। কেশবপুর উপজেলা বন কর্মকর্তার অফিস সূত্র জানায়, কেশবপুরে সরকারি হিসেবে হনুমানের সংখ্যা সাড়ে ৩ শ। কিন্তু বাস্তবে কেশবপুরে সাড়ে ৫শ হনুমান রয়েছে। এরা ৯ থেকে ১০ টি গ্র“পে ভাগ হয়ে বিচরণ করে থাকে। মানুষের সাথে বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ করে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই কেশবপুরে এসে থাকেন কালোমুখো হনুমান দেখতে। তারা নিজ হাতে তাদেরকে বাদাম, বিস্কুট ও কলা খেতে দিয়ে আনন্দ পান। কেশবপুর পুরাতন বাস স্ট্যান্ডের সাধন টি স্টলের মালিক সাধন সাহা, ভানু চক্রবর্ত্তী জানান, হনুমানরা খাদ্য অন্বেষণে এসে ক্ষতি করলেও তাদের রয়েছে প্রচণ্ড অনুভুতি শক্তি।

হনুমানের দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা ঃ হনুমানের স্বভাবগত বৈশিষ্ট হচ্ছে এরা গ্র“প ভিত্তিক চলাফেরা করে থাকে। এক একটি গ্র“পের নেতৃত্ব দেয় একটি করে পুরুষ হনুমান। কেশবপুরের মানুষের মন্তব্য দলের প্রধান পুরুষ হনুমান অত্যন্ত বদমেজাজি। দলের মধ্যে যদি কোন মা হনুমান পুরুষ বাচ্চা প্রসব করে তাহলে আর রেহাই নেই। যে ভাবেই হোক সে বাচ্চাকে মেরে ফেলবে ওই পুরুষ হনুমানটি। আর এ ধরনের আচরণের কারণ আনুসন্ধানে জানা যায়, দলনেতা পুরুষ হনুমানটির বধ্যমূল ধারনা পুরুষ শাবকটি বড় হয়ে তার কর্র্তত্ব নিয়ে নিতে পারে, আর সে আশঙ্কায় এ ধরনের আচরণে করে থাকে দলনেতা। প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রজাতি সাধারণত ৫ বছর বয়স থেকে ৬ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে থাকে। এদের গড় আয়ু ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এক একটির ওজন ৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাত ও পায়ের পাতা মুখের মতোই কালো। শরীরে ধূসর বর্ণের রোম (লোম) দিয়ে আচ্ছাদিত। তবে পেটের দিকটা কিছুটা সাদা ও লালাভ। চলাফেরা করার সময় এরা লেজ উচু করে চলে।

হনুমানের বিচরণ এলাকা ঃ হনুমানের বিচরণ এলাকা মূলতঃ কেশবপুর উপজেলা পরিষদের সামনে, পশুসম্পদ কার্যালয়ের পিছনে, কেশবপুর খাদ্যগুদাম এলাকা, রামচন্দ্রপুর, ব্রম্মকাঠি, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, সাহাপাড়া, মুজগুন্নি, ব্রম্মকাঠি, ভোগতি গ্রাম এলাকা ও কেশবপুর প্রেসক্লাব এলাকা দিয়ে এরা স্বাভাবিক চলাফেরা করে থাকে।

খাদ্য অন্বেষণ ঃ সরকারিূূভাবে প্রতিদিন খাদ্য সরবরাহ করা হলেও বরাদ্দকৃত খাদ্য প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়া ও ঠিকাদারের দুর্নীতির কারণে খাদ্য অন্বেষণে হনুমান কলা বোঝাই ট্রাক, পিকআপযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। ইতিমধ্যে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ বিভিন্ন স্থানে হনুমান খাদ্য অন্বেষণে গিয়ে কেশবপুরে ফিরে আসেনি। অনেক স্থানে নির্যাতনে মৃত্যুও হয়েছে, যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

সরকারিভাবে ফেরৎ আনা হয় ঃ খাদ্য অন্বেষণে দেশের বিভিন্নস্থানে চলে যাওয়া হনুমানদের সেখানকার বন কর্মকর্তারা জানতে পারলে তারা পিআপযোগে কেশবপুরে এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বন কর্মকর্তার কাছে হনুমানটিকে হস্তান্তর করে থাকেন। এর পর নির্বাহী কর্মকর্তা পার্শ্ববর্তী বনে হনুমানটিকে অবমুক্ত করেন।

আন্দোলন-সংগ্রামী হনুমান ঃ কেশবপুর থানার পাশের এক ব্যক্তি হনুমানের লেজে কোপ দিয়ে জখম করায় হনুমানদল ঐক্যবদ্ধ হয়ে থানা কর্তার বাসভবন ঘেরাও করে বিচার প্রার্থনা করে। অগ্যতা সে ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করতে বাধ্য হয়। আটকের পর তারা থানা কম্পাউন্ড ত্যাগ করে। এদের মধ্যে রয়েছে দৃঢ় ঐক্য। এছাড়া ঢাকাগামী একটি পরিবহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে একটি হনুমানের মৃত্যু হলে তারা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনও করে থাকে। কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ সহিদুল ইসলাম ও ওসি তদন্ত শেখ মাসুদুর রহমান জানান, কেশবপুরের হনুমানদের নিয়ে অনেক কাহিনী তিনি শুনেছেন। তবে এরা অত্যন্ত বন্ধুসূলভ আচরণে অভ্যস্থ। এরা থানা কম্পাউন্ডে আসলে কলা, বিস্কুট দেয়া হয়। অনেক সময় তাদের খাদ্য দিতে একটু দেরি হলে অফিসের ভিতরে প্রবেশ করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হনুমান দেখতে দর্শনার্থীরা কেশবপুরে আসেন।

কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানদের রক্ষণাবেক্ষণে সরকারিভাবে তদারকি কমিটি ঃ কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান রক্ষায় সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাদ্য সঠিকভাবে ব্তিরণ করা হচ্ছে কিনা বা তাদের কোন সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের জন্য রক্ষণাবেক্ষণে তদারকি কমিটি রয়েছে। যার নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন কেশবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ রায়হান কবীর জানান, হনুমানদের জন্য সরকারিভাবে খাদ্য বরাদ্দ চলছে। তবে সরকারিভাবে মাঝে মধ্যে খাদ্য কিছুদিনের জন্য বরাদ্দের মেয়াদ শেষ হলে জেলা প্রশাসন থেকে তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হয়। ২০১৩ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সরকারের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও ইকোটুরিজম উন্নয়ন প্রকল্পে কেশবপুরের হনুমানের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নিরাপদ বিচরণে তাদের জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

হনুমানদের মৃত্যু ঃ খাদ্য অন্বেষণ ও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত এরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। কেশবপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশরাফ-উজ-জামান খান ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়দেব চক্রবর্ত্তী জানান, কেশবপুর প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে হনুমান রক্ষায় পল্ল¬¬ী বিদ্যুতের কভারযুক্ত তার ব্যবহারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। তারপরও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কভারযুক্ত তার ব্যবহার করেনি। হনুমানদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা। পর্যাপ্ত খাদ্য ও বনাঞ্চলের অভাবে হনুমানদের গর্ভকালীন নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। খাদ্য বৃদ্ধির দাবি আজ উপেক্ষিত হওয়ায় খাদ্য অন্বেষণ করতে গিয়ে গত ৯/১০ বছরে বিদ্যুতের কভারবিহীন তারে স্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ৪৫ টি হনুমানের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও কীটনাশক ছিটানো আমের মুকুল খেয়ে আরও ২০ টি হনুমানের মৃত্যু ঘটেছে।