অবৈধ দখলদার আর পলি জমার ফলে প্রমত্তা কপোতাক্ষ মরা খালে পরিণত
কপোতাক্ষ নদ অবৈধ দখলদার আর পলি জমার ফলে মরা খালে পরিণত হয়েছে

যশোরের চৌগাছার উপর দিয়ে বয়ে চলা মহাকবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের কপোতাক্ষ নদ অবৈধ দখলদার আর পলি জমার ফলে মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হলে কপোতা তার হারিয়ে যাওয়া যৌবন যেন ণিকের জন্য ফিরে পায়। কিন্তু খরা মৌসুমে তার বুকে চরে গরু-ছাগল, ছোটাছুটি করে শিশু কিশোররা। এমন এক পরিস্থিতিতে কপোতা নদকে খনন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। নদকে খনন করা হলে আবার আসবে জোয়ার-ভাটা, প্রকৃতি সাজবে অপরূপ সাজে, নদের বুকে চলবে পাল তোলা নৌকা, সৃষ্টি হবে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান। তাই কপোতাকে খনন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের হস্তপে কামনা করেছেন এ জনপদের লাখো জনতা।

সূত্র জানায়, যশোরের চৌগাছা সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা। ১১ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস। ২৬৮ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চৌগাছা উপজেলাকে কপোত নদ অঘোষিতভাবে দু’ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। সূদুর চুয়াডাঙ্গা জেলার মাথাভাঙ্গা থেকে উৎপত্তি কপোতা নদের। সাপের মত আঁকাবাঁকা হয়ে চৌগাছার বুকচিরে তা মিলে গেছে বঙ্গোপসাগরে, যার দূরত্ব প্রায় ৬৫ মাইল। সূত্র জানায়, এক সময়ের প্রমত্তা কপোতা নদ যুগযুগ ধরে খনন আর অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করতে না পারায় তা আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে। উপজেলার নারায়ণপুর, হাজরাখানা, পেটভরা, মাশিলা, দিঘলসিংহ, চৌগাছা সদরসহ কপোতারে বিস্তীর্ণ এলাকা চলে গেছে অবৈধ দখলদারদের কবলে। নদের পাড়ে তৈরি করা হয়েছে পুকুর। নদ ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়িঘর, আবার অনেকে নদের জায়গা দখলে নিয়ে করছেন চাষাবাদ। এ ছাড়া এলাকা বিশেষ নদের মাঝে পাটাতন দিয়ে নদের স্বাভাবিক স্রোতকে ব্যাহত করে মাছ চাষ করছে। এক কথায় নদকে যে যেমন ভাবে পারছে ব্যবহার করছে। ফলে দিন দিন কপোতা তার সকল সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। যুগযুগ ধরে কপোতা খনন না করার ফলে পলি জমে অনেক স্থানেই ভরাট হবার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে একটু বৃষ্টি হলেই পানি নদের পরিধি ছেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। চরম এক বেহালদশা বিরাজ করছে এক সময়ের প্রমত্তা কপোতা নদ। নদ পাড়ের বাসিন্দাসহ এলাকার সচেতন মহল চৌগাছার গৌরব ও অহংকার বলে খ্যাত মহাকবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের কপোতা নদকে খনন করার পাশাপাশি রণাবেণের জন্য সংশ্লিষ্টদের আশু হস্তপে কামনা করেছেন।

সূত্র জানায়, বৃটিশ শাসনামলে কপোত নদে চলেছে বিশাল আকৃতির জাহাজ। তখন কপোতারে ছিল ভরা যৌবন, নিয়মিত আসত জোয়ার-ভাটা। সে সময় বৃটিশ বণিকেরা বিশাল বিশাল জাহাজ নিয়ে বর্তমান উপজেলার খলশিবাজর নামক স্থানে তা নোঙর করতো। বৃটিশরা ওই দেশ থেকে জাহাজে করে নানা ধরনের পণ্য এনে খলশি বাজারের নিচে খালাশ করত। খালাশীরা (মুটে) জাহাজ থেকে এখানে মালামাল খালাশ করার কারণে এই স্থানকে সে সময় খালাশি বলে ডাকা হতো। পরবর্তীতে খালাশি থেকে স্থানটি খলশি নামে পরিচিতি লাভ করে। নদ পাড়ের একাধিক বয়োবৃদ্ধের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পরও কপোতা নদে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হত। পাল তোলা নৌকা নিয়ে মাঝি মনের সুখে গান গাইতে গাইতে আপন ঠিকানায় পৌছাতেন। ভরা যৌবনের কপোতারে অঢেল পানি আর জীব বৈচিত্রের কারণে কপোতা এক অপরূপ সৌন্দর্য বহন করত। সেই কপোতা নদ সময়ের ব্যবধানে আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদে এখন আর আগের মত পানি থাকে না, খরা মৌসুমে নদের বুকে শিশুরা খেলায় মেতে ওঠে। চরে হাঁস, মুরগি আর গরু ছাগল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কপোতা খনন করা হলে এর সুফল পাবে সকলেই। যখনই কপোতা খনন হবে তখন এখানে আবার ফিরে আসবে জোয়ার-ভাটা। চলবে বড় বড় পাল তোলা নৌকা। যাতায়াতের অন্যতম একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে কপোতা। কৃষিনির্ভর উপজেলা চৌগাছার মানুষ সব থেকে বেশি লাভবান হবে। বছরের বার মাসই যখন নদে পানি থাকবে তখন ব্যাপকভাবে বাড়বে কর্মসংস্থান। বহুলাংশে দূর হবে বেকারত্ব। নদে আবার ফিরে আসবে হরেক রকমের পাখপাখালি। সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে নদের, উপকৃত হবেন নদ পাড়ের হাজারও মানুষ। কথা হয় কপোতা পাড়ের বয়োবৃদ্ধ সুনিল কুমার দত্ত, অনিল, স্বপন কুমার, মশিয়ার রহমানের সাথে। তারা লোকসমাজকে জানান, কপোতা নদ মানুষ দেখানো নয় প্রকৃত খনন করা হলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। পাশাপাশি দেশ অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হবে। তাই কপোতা নদ খনন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।