অলিম্পিক যাত্রী নড়াইল থেকে রিও
রিও অলিম্পিকের জন্য নিবিড় অনুশীলনে মগ্ন তিরন্দাজ শ্যামলী রায়। টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে

রিও অলিম্পিকের জন্য নিবিড় অনুশীলনে মগ্ন তিরন্দাজ শ্যামলী রায়। টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলোরিও ডি জেনিরো অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি সাত খেলোয়াড়। ৫ আগস্ট শুরু বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের নিয়ে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন। তিরন্দাজ শ্যামলী রায়কে নিয়ে আজকের সূচনাপর্ব—

একলব্যের গল্পটা জানা ছিল না শ্যামলী রায়ের। পৌরাণিক আখ্যানের শূদ্রবংশীয় বালক একলব্য গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে তির-ধনুক চালানো শিখতে পারেননি। কিন্তু এ যুগের শ্যামলী রায়ের জন্য একাধিক কোচের ব্যবস্থা করেছে আর্চারি ফেডারেশন।


শহরের কোলাহল থেকে দূরে টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামের নির্জনে ফেডারেশন তাঁকে সুযোগ করে দিয়েছে অনুশীলনের। ওয়াইল্ড কার্ড নিয়ে এবার রিও অলিম্পিকে যাচ্ছেন নড়াইলের তিরন্দাজ শ্যামলী।


অলিম্পিকে যাওয়ার খবরটা শুনে কিন্তু বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, ‘প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই অলিম্পিকে খেলার স্বপ্ন থাকে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি অলিম্পিকে যেতে পারব আশা করিনি। খবরটা শুনে মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি।’


খেলাধুলার উর্বরভূমি নড়াইল। ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা অনেক আগে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। ফুটবল, টেবিল টেনিস, হ্যান্ডবল, কাবাডিতেও ছেলেদের পাশাপাশি দাপট আছে নড়াইলের মেয়েদের। শ্যামলীর শুরুটা হয়েছিল হ্যান্ডবল দিয়ে। তবে খেলোয়াড় নয়, শ্যামলী হতে চেয়েছিলেন নৃত্যশিল্পী! ছোটবেলায় নিয়মিত নাচ শিখতেন।


বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের নামে প্রতিবছর নড়াইলে বসে ‘সুলতান মেলা।’ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সুলতান মেলায় নিয়মিত নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন শ্যামলী। কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁকে খেলায় টেনে আনেন স্কুলের এক শিক্ষিকা।


শ্যামলী তখন নড়াইলের রূপগঞ্জ শিবশঙ্কর বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। টঙ্গী স্টেডিয়ামে বসে বলছিলেন খেলার ভুবনে আসার ঘটনাটা, ‘একদিন পলি ম্যাডাম ডেকে বললেন, তুমি খেলার জগতে চলে এসো। আমি বললাম, ম্যাডাম খেলতে পারি না। ম্যাডাম বললেন সমস্যা নেই, শিখিয়ে দেব।’


কিছুদিন পর বিকেএসপি আর্চারির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের আয়োজন করে নড়াইলে। প্রথম দিনেই আনাড়ি শ্যামলী মারেন পারফেক্ট টেন! এক সপ্তাহর ক্যাম্প শেষে সেবার দেড় শ ছেলেমেয়ের মধ্যে হয়েছিলেন প্রথম। এরপর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসে আর্চারি ফেডারেশন। কিন্তু অসুস্থতার জন্য সেবার ক্যাম্প ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। মাঝে ২০১০ সালে একবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন। চার বছর পর আবারও ফেরেন আর্চারিতে। ফিরেই ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে ২০১৪ সালে রিকার্ভ বোয়ে সোনা। পরে ওই বছরে জাতীয় প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ জয়। বর্তমানে চুক্তি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হয়ে খেলছেন শ্যামলী।


বাবা গোবিন্দ রায় এলাকায় ট্রাক্টর ব্যবসায়ী। মেয়েকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে দেখার ইচ্ছা বেশি ছিল বাবারই। তবে এ নিয়ে এখন আর আফসোস নেই বাবার, ‘বাবা এখন আমাকে খেলাধুলাতেই বেশি উৎসাহ দেন। টঙ্গীর ক্যাম্পে থাকলে সারাক্ষণ বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা এখানে এসে আমাকে দেখে যান দু-এক মাস পরপর। ব্রাজিলের অলিম্পিকে খেলব, এই খবরটা শুনে বেশি খুশি হয়েছেন বাবাই।’


নড়াইলের পঙ্কবিলা গ্রামের মেয়ে শ্যামলী জাতীয় দলের ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজার বাড়ির পাশে নিয়মিত অনুশীলন করতেন। মাশরাফির মতোই বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চান শ্যামলী, ‘আমরা প্র্যাকটিস করতাম বয়েজ স্কুল মাঠের পাশে। ওই মাঠের পাশে মাশরাফি ভাইয়ের বাসা। উনি বাড়িতে থাকলে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। মাশরাফি ভাই নড়াইলকে তুলে ধরেছেন সারা বিশ্বের কাছে। আমি এবার ব্রাজিলে গিয়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই। নিজের সেরাটা দিয়ে খেলতে চাই অলিম্পিকে।’


বড় মঞ্চে এর আগেও গেছেন শ্যামলী। অংশ নিয়েছেন তুরস্ক ২০১৪ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, ব্যাংকক এশিয়া কাপ ও ইনচন এশিয়ান গেমসে। গত বছর খেলেছেন ডেনমার্ক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও ব্যাংকক এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। সর্বশেষ এ বছর ভারতে খেলেছেন এসএ গেমসে।


চিত্রা নদীর পারে নামের বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছিল ওই নদীর তীরেই তাঁদের বাড়ির সামনের জমিদারবাড়ির বাঁধা ঘাটে। চিত্রা নদীর পাড় থেকে উঠে আসা শ্যামলী এবার খেলবেন রিও ডি জেনিরোর আকারী নদীর পাড়ে।


ছোটবেলায় বাড়ির উঠোনে ধান শুকোতে দিলে পাখিগুলো ভীষণ জ্বালাত। শ্যামলীর বড় ভাই তখন পাটকাঠি দিয়ে তির-ধনুক বানিয়ে বলতেন, ‘ধনুক দিয়ে পাখিগুলো তাড়িয়ে দিবি।’ শ্যামলী ধনুক দিয়ে পাখি ওড়াতে ছিলেন ওস্তাদ। কে জানত সেই তির-ধনুকটাই একদিন হয়ে উঠবে তিরন্দাজ শ্যামলীর প্রিয় সহচর!


শ্যামলী রায়শ্যামলী রায়

আর্চারি

জন্ম

৫ এপ্রিল ১৯৯৪

জন্মস্থান

নড়াইল

সংস্থা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

ঘরোয়া সাফল্য


৬টি পদক (২ সোনা, ২ রুপা, ৩ ব্রোঞ্জ)


আন্তর্জাতিক সাফল্য


(১ ব্রোঞ্জ)


সেরা সাফল্য


ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপেরিকার্ভ বোয়ের ব্যক্তিগত ইভেন্টে সোনা।