যশোরের মধ্যমণি ‘মণিহার’
বর্তমানে যশোর শহরের একমাত্র সিনেমা হল মণিহার

ভাল সিনেমা, সিনেমা হলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় দর্শক খরায় যশোরের অধিকাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে স্ব-মহিমায় টিকে আছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম সিনেমা হল মণিহার। এবারের ঈদুল ফিতরের প্রদর্শিত হচ্ছে সিনেমা বাদশা দ্য ডন। ঈদের দ্বিতীয় সপ্তাহেও বাদশা দ্য ডনে বাজিমাত করছে। বিপুল দর্শক সমাগমে চলছে সিনেমাটি।


সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ ও দর্শকরা বলছেন, ভাল সিনেমা ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সিনেমা প্রেমীদের হলমুখী করা সম্ভব। টিকিটের টাকা উসুল করার মত রসদের সিনেমা দর্শকদের উপহার দিতে পারলে ব্যবসায় সফল হবে। দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে দর্শকের বিনোদনের মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছে মণিহার। লাইনে দাঁড়িয়ে সিনেমা হলে ঢোকার দৃশ্য বেশিরভাগ হলে দেখা মেলেনি। তবে মণিহারের এখন সিনেমা প্রেমীরা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশ করছেন ভিতরে। সিনেমার শুরু থেকে অবধি গ্যালারিতে বসে দর্শকের উন্মাদনায় রয়েছে চোখে পড়ার মতো।


জানাগেছে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে বর্তমানে যশোর জেলায় মাত্র পাঁচটি সিনেমা হল টিকে আছে। এরমধ্যে মণিরামপুরে দুটি, শার্শার বাগআঁচড়ায় একটি, অভয়নগরের নওয়াপাড়ায় একটি ও যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলটি। যশোরে তসবির মহল সিনেমা হলটি চালু ছিল। কিন্তু ঈদের মাত্র এক সপ্তাহ আগে পবিত্র রমজান মাসে অশ্লীল সিনেমা চালানোয় ভ্রাম্যমাণ আদালত এটি সিল করে দেয়। শুধুমাত্র মণিহার সিনেমা হলে জৌলুস আছে। বাকীগুলো টিকে আছে কোন রকমে।


দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথচলা জৌলুস হারায়নি মণিহার সিনেমা হল। সময়ের বিবর্তনে নানা টানাপোড়েনেও টিকে আছে সিনেমাপ্রেমীদের প্রিয় হলটি। ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কে (আরএন) হলটির উদ্বোধন করা হয়। পরদিন ৯ ডিসেম্বর সোহেল রানা ও ববিতার সাড়া জাগানো ‘জনি’ ছবিই ছিল মণিহারের প্রথম শো। সেই থেকে শুরু। নানা প্রতিবন্ধকতার পরও টিকে আছে সিনেমা হল।


বর্তমানে যশোর শহরের একমাত্র সিনেমা হল মণিহার। আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন চারতলা ভবনে মণিহার সিনেমা হলের অবস্থান। ভবনের প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা নিজের ছবি। এরপর উপরে উঠতে ঘোরানো পেঁচানো সিঁড়ি, আলোর ঝলকানি আর পানির ফোঁয়ার। ভিতরে ঢুকতে শরীরে ঠাণ্ডা অনুভব হবে। দেড় হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার হলটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সেটি ফোমের ঘোরানো চেয়ারে বসলেই বোঝা যাবে। সামনের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে ৪০ ফুট প্রস্থ ও ৩০ ফুট উঁচু বিশাল ডিজিটাল পর্দা। সেই পর্দায় ভেসে উঠবে নায়ক- নায়িকা ও সিনেমার কুশিলবদের চেহারা। আধুনিক সাজসজ্জার এই হলে একটি সিনেমা দেখার জন্য সারা দেশের পাশাপাশি বিদেশি দর্শকরাও এসেছেন বিভিন্ন সময়ে। দেশীয় সিনেমার দুর্দিনে কয়েক বছর দর্শক কমলেও বর্তমানে যৌথ প্রযোজনার সিনেমায় জৌলুস ফিরিয়েছে মণিহার।


সরেজমিনে মণিহার সিনেমা হলে গিয়ে দেখাগেছে, ঈদ উপলক্ষে দর্শক সমাগমে হলটিতে চলছে ‘বাদশা দ্য ডন’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন কলকাতার রাজেশ কুমার যাদব ও ঢাকার আব্দুল আজিজ। চিত্রনাট্য লিখেছেন আবদুল্লাহ জহির বাবু। সংগীত পরিচালনা করেছেন কলকাতার জিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের ইমন সাহা। জিৎ-ফারিয়া ছাড়াও অভিনয় করেছেন, ফেরদৌস, শ্রদ্ধা দাস। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমাটির কাহিনী, চিত্রনাট্য দর্শকের মনে বেশ সাড়া ফেলেছে। নারী পুরুষ শিশু সব বয়সী দর্শকে সিনেমা হলে টানতে পেরেছে সিনেমার কারিগররা।


ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও প্রতিদিন উপচেপড়া দর্শকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে সিনেমা হলটিতে। লম্বা লাইনে দাড়িয়ে নিতে হচ্ছে টিকিট। এরপর ভিতরে প্রবেশ করার জন্যও লম্ব লাইন। তবুও দর্শকদের মধ্যে কোন হইহুল্লোড় নেই। সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট হাতে হলের ভিতরে প্রবেশ করছেন। সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে দর্শক হাতে তালি দিচ্ছে, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। আবার অনেক সময় দর্শকের মধ্যে সুনশান নীরবতাও লক্ষ্য করা গেছে। অথ্যাৎ সিনেমার কাহিনীর সঙ্গে দর্শকেরও আনন্দ, কষ্ট প্রকাশ পায়। সব মিলিয়ে ভাল সিনেমা পেয়ে দর্শকরা খুশি বটে।


সত্তর টাকার টিকিট কেটে টাকা উসুল হয়েছে বলে জানালেন মনিরুল ইসলাম নামের একজন দর্শক। তিনি জানালেন একজন মানুষ দুটি কারণে হলমুখী হয়। একটি হলো সিনেমা হলের পরিবেশ নিশ্চিত ও দর্শকের টিকিটের টাকা উসুল করার মত উপাদান থাকতে হবে সুস্থধারার সিনেমায়। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে দর্শক অবশ্যই হলে যাবে। মণিহার সিনেমা হল এবং বাদশা দ্য ডন সিনেমায় সেই দুটি বিষয় রয়েছে। ফলে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।


হলের দর্শক কলেজ ছাত্র এমএ রাজা বলেন, ভাল সিনেমা আসলে বন্ধুরা মিলে দেখি। সিনেমার কাহিনী ও উপস্থাপন ভাল না হলে দর্শক কেন টাকা খরচ করে আসবে। বাদশা দ্য ডন সিনেমাটি ভাল লেগেছে। আফজাল হোসেন নামে আরেকজন দর্শক বলেন, সুস্থধারার সিনেমা দেখার জন্য মানুষ হলে আসছে। ভাল সিনেমার খরা অনেকদিন ছিল। যৌথ প্রযোজনার সিনেমা সেই খরা কাটিয়ে তুলছে। এজন্য দর্শক বাড়ছে দিনদিন।


মণিহার সিনেমা হলের ম্যানেজার মোল্লা ফারুক আহম্মেদ বলেন, সুস্থ ছবি ও ভালো পরিবেশ হওয়ার কারণে হয়তো মানুষ সিনেমা হলমুখি হচ্ছে। বিনোদন থেকে মানুষ সরে যায়নি। দীর্ঘদিন ভালো মানের সিনেমা তৈরি না হওয়ায় মধ্যবিত্তরা সিনেমা হলে যেত না। কিন্তু এবার রুচিসম্মত সিনেমা তৈরি হওয়ার কারণে মানুষ তা দেখতে হলে আসছে।

তিনি আরও বলেন, হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। দর্শকরা নির্ভয়ে সিনেমা দেখতে আসছেন।