ভৈরব-কপোতাক্ষ নদের মরণদশা
ভৈরব-কপোতাক্ষ নদের মরণদশা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘতম নদ ভৈরব, যার অর্থ ভয়াবহ। পদ্মার প্রবাহে প্রমত্তা রূপ ধারণ করায় নদটির এ নাম হয়েছিল। প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদটির তীরেই গড়ে ওঠে যশোর-খুলনাসহ অসংখ্য শহর-নগর। চৌগাছার তাহেরপুরে ভৈরব থেকে দক্ষিণ দিকে কপোতাক্ষ নামে বের হয়েছে এ অঞ্চলের আরেকটি প্রধান নদ। এ দুই নদের তীরেই বিকশিত হয়েছিল আর্য সভ্যতা। দুই নদ থেকে বের হয়েছিল অসংখ্য শাখা নদী। যশোর অঞ্চলের প্রধান এ দুটি নদই আজ মৃতপ্রায়। বর্ষা মৌসুমে এ নদে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। আবার শুষ্ক মৌসুমে এর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। ওয়াকিবহাল সূত্রমতে, এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলোকে মানুষ কখনো কখনো নিজের ইচ্ছামতো প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। বেশি ফসল উত্পাদনের জন্য স্রোতেরও নিয়ন্ত্রণ করেছে। এসব প্রচেষ্টা সাময়িক সুফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দেয়নি। বরং নদীশাসনের ভয়াবহ রূপ দেখা গেছে যশোর-খুলনা এলাকার দুঃখ হিসেবে পরিচিত ভবদহ এলাকায়। জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৯৪ সালে কপোতাক্ষে বাঁধ দিয়ে ভৈরবে স্রোত প্রবাহিত করে যশোর শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন যশোরের ওই সময়ের কালেক্টর। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর নদীয়ার কালেক্টর শেক্সপিয়র দর্শনার কাছে মাথাভাঙ্গার বাঁক সোজা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ১৮৬২ সালে আসাম বেঙ্গল রেললাইন নির্মাণের সময় দর্শনায় ভৈরব নদের ওপর রেলব্রিজ নির্মিত হয়। এ ব্রিজ নির্মাণ করতে গিয়ে মেহেরপুরের উজানে আপার ভৈরব বেঁধে দেওয়া হয়। যে কারণে ভৈরবের পানিপ্রবাহ কমে যেতে থাকে। এরপর ১৯৩৮ সালে দর্শনায় ভৈরব নদের বড় ধরনের বাঁক ভরাট করে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকল স্থাপন করা হয়। এর ফলে ভৈরবে মিঠা পানি কমে যেতে থাকে। ভৈরব দ্রুত মরে বুড়ো ভৈরবে পরিণত হয়। সাগরের জোয়ার-ভাটায় কোনোরকমে টিকে থাকে লোয়ার ভৈরব। আপার ভৈরবে পানি না থাকায় মরণদশা হয় কপোতাক্ষের। একই দশা হয় কপোতাক্ষের শাখা-প্রশাখাগুলোরও। এরপর ষাটের দশকে বেশি ফসল উত্পাদনের জন্য সমুদ্রোপকূল অঞ্চলে অসংখ্য বাঁধ-পোল্ডার-স্লুইসগেট নির্মাণ করে সাগরের নোনা পানি ঠেকানো হয়। এ প্রকল্পের ব্যাপক সুফল পাওয়া যায় দেড় যুগ পর্যন্ত। যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরার উপকূল এলাকায় ব্যাপক ফসল ফলে। কিন্তু এরপরই দেখা যায় এ প্রকল্পের ভয়াবহ রূপ। নদ-নদীগুলোর একমুখী স্রোত সমুদ্র থেকে বিপুল পলি এনে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট করতে থাকে। দ্রুত মারাত্মক জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে পড়ে এ এলাকা। শত শত কোটি টাকা খরচ করেও এখন এ সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাচ্ছে না। ওয়াকিবহাল সূত্র জানায়, একসময় ভৈরব ও কপোতাক্ষের মধ্যবর্তী অঞ্চলের অতিরিক্ত পানি এ দুই নদের শাখা বেতনা, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, শ্রীনদী, টেকা, ভদ্রা, বুড়িভদ্রা, সালতা, শোলমারি, তেলিগাতি, হামকুড়ো, ময়ূর নদ-নদীতে নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু প্রধান দুই নদের অবস্থা মৃতপ্রায় হয়ে যাওয়ায় এ শাখা নদ-নদীগুলোর বেশির ভাগেরই আজ অস্তিত্ব নেই। ভৈরবের শাখা মুক্তেশ্বরী যশোর বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে পুলেরহাট, সতীঘাটা হয়ে মশিহাটিতে ভদ্রা নদীতে মিশত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মুক্তেশ্বরী নদীর পাশে যশোর বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। এ সময় মুক্তেশ্বরীর উজানের জলপ্রবাহ খাল কেটে কপোতাক্ষে প্রবাহিত করা হয়। উজানের পানি না পেয়ে মরে যায় মুক্তেশ্বরী। একসময়ের প্রমত্তা হরিহর নদ ঝিকরগাছার লাউজানী থেকে মনিরামপুর, কেশবপুর হয়ে ভদ্রায় মেশে। হরিহরের এক শাখা শ্রীনদী মনিরামপুরের বাজিতপুর, কাছারিবাড়ী ও কুমোরঘাটা হয়ে ফুলতলা উপজেলার ভিতর দিয়ে বিল ডাকাতিয়ায় পড়ত। ভৈরবের আরেক শাখা বোয়ালমারী থেকে নওয়াপাড়ার পুবপাশ দিয়ে চলিশিয়া হয়ে মিশত মুক্তেশ্বরীতে। পরে ভবদহের পুব দিকে মোড় নিয়ে সে শাখাটি জামিরার পশ্চিম পাশ দিয়ে বিল ডাকাতিয়ায় পড়ত। এরপর থুকড়ো, আমভিট হয়ে হামকুমড়ো নদীতে মিশত। ভৈরবের আরও একটি শাখা রাজঘাটা, ভুলোপাতা বিল হয়ে ধোপাখোলার মিলিত স্রোত নিয়ে ফুলতলা, পয়গ্রাম-কসবা এবং শিকিরহা থেকে বুড়োডাঙ্গি, দামোদর হয়ে নামত বিল ডাকাতিয়ার শোলমারিতে। পশ্চিমবাহী অন্য শাখাটি আমভিট, হামকুড়ো হয়ে মিশত ভদ্রায়। জালের মতো বিস্তৃৃত এসব নদ-নদী প্রাকৃতিকভাবেই এ এলাকার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করত। উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের আওতায় মুক্তেশ্বরীকে শ্রীনদীর সঙ্গে যুক্ত করে ক্রসবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর ফলে মরে যায় শ্রীনদীর সব শাখা। ১৯৯৫ সালে মরতে শুরু করে হামকুড়ো নদী। কপোতাক্ষের দুই শাখা হরিহর ও ভদ্রা। ভদ্রা কেশবপুর, গৌরিঘোনা, ভরতভায়না, ডুমুরিয়া হয়ে শিবসা ও পশুর নদে মিলত। এ যাত্রাপথে ভদ্রার ছিল বেশ কিছু শাখা-প্রশাখা। খর্নিয়া থেকে ভদ্রার এক শাখা তেলিগাতি নামে গ্যাংরাইল, হারিড়া নদী হয়ে শিবসায় পড়ত। এখন আর এগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। বেদখল হয়ে গেছে এসব নদ-নদীর বেশির ভাগ জায়গা।