মহান মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র শহীদ এমএনএ
যশোর পৌর পার্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে উন্মোচন করা স্মৃতিসৌধ ফলক

‘তেমনি রক্তের ঋণ মশিয়ুর, ভরে রাখে স্মৃতির ভান্ডার’


বর্বর বেয়নটে ছিন্ন ভিন্ন দেহ যার

তার জন্য শোক নেই, খুজবোনা তাকে আর

যে শোনিতে দুঃখ মোছে,বন্দিনী বাংলার

তেমনি রক্তের ঋণ মশিয়ুর, ভরে রাখে স্মৃতির ভান্ডার।

১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর যশোর পৌর পার্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে উন্মোচন করা স্মৃতিসৌধ ফলকে এভাবেই বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মউৎসর্গকারী সূর্য সৈনিকদের অন্যতম যশোরের চৌগাছার কৃতিসন্তান তৎকালীন মেম্বর অব ন্যাশনাল এসেম্বলি (এমএনএ) মশিয়ুর রহমানকে স্মরণ করা হয়েছে।


মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনিই একমাত্র শহীদ এমএনএ। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি এদেশের মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে পালিয়ে যাননি। সাধারণ মানুষের সাথে নিয়ে সংগ্রামে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর শহীদ মশিয়ুর রহমান তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারে প্রাক্তন মন্ত্রী, প্রখ্যাত আইনজীবি ও জেলা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যেকটিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দেশের জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছেন। তাঁর দেশপ্রেম দেশের মানুষের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ৭১‘র ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকহানাদার বাহিনী যশোর শহরের নিজ বাসভবন থেকে তাকে যশোর সেনানিবাসে ধরে নিয়ে যায়। পাক সেনারা তাঁর উপর অমানবিক নির্যাতন করলেও তিনি দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। সেনানিবাসে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন করে ২৩ এপ্রিল হত্যা করে পাকসেনারা। তিনি একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এমএনএ (সংসদ সদস্য)। পাক জল্লাদের নির্মম নির্যাতনে শহীদ মশিয়ুর রহমানকে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরাহিত হিসেবে আখ্যায়িত করে ৪৪ বছর আগে যশোর পৌরপার্কের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন।


বিগত ৪৫ বছরে যশোরবাসী শহীদ মশিয়ুর রহমানের স্মৃতিরক্ষার্থে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও স্মৃতিলক উন্মোচন করেছে। এরমধ্যে অন্যতম ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর যশোর পৌর উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মশিয়ুর রহমানের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন। আর এই মহান মুক্তিযোদ্ধা ও তার স্মৃতিফলক সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের কোন ধারণা নেই।


মশিয়ুর রহমান ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ইসমাইল ও মাতার নাম ছৈয়দুন্নেছা। ১৯৩৬ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্টিক, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৩৮ সালে আইএ এবং বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে কলকাতা লর্ড রিপন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র জীবনেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল আন্দোলনে মশিয়ুর রহমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র থাকাকালীন তিনি তৎকালীন এশিয়ার শ্রেষ্ট ব্যারিস্টার হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর সহচর হিসেবে কাজ করেন। তারপর তিনি ১৯৪৯ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন । তারপর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটেন নির্বাচিত হন। তারপর প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় স্থানীয় সরকার এবং আইন ও বিচার বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজনৈতিক জীবনের আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি ও ৬৯‘র গণঅভ্যত্থানে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে এমএনএ নির্বাচিত হন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন সংগ্রমে মশিয়ুর রহমান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।