হারিয়ে যাচ্ছে চিত্রা নদীর সৌন্দর্য
হারিয়ে যাচ্ছে চিত্রা নদীর সৌন্দর্য

নড়াইল শহরের পাশ ঘেঁষে চিত্রা নদীর প্রবাহ। অনেকেই বলেন এই নদীর দু’কূল চিত্র বা ছবির মতো সুন্দর ছিল বলেই এর নাম হয়েছে চিত্রা।

কিন্তু অবৈধ দখলের কারণে সেই সৌন্দর্য এখন বিলীন হতে চলেছে। নড়াইল শহরের পাশে অনেকই নদীর সীমানা দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে তুলেছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী আছে চিত্রা তার মধ্যে অন্যতম।

নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় বহু মানুষ এই নদী তীরে বসবাস করেন। তাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথেও এই চিত্রা নদী মিশে আছে।


স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলছেন যে যার মতো করে নদীর সীমানা দখল করছে এবং এটি নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথাও নেই।

তিনি বলেন,“এখানকার বাসিন্দা যারা তারাই তো দখল করছে। তারা যদি এই সম্পদ নষ্ট করে ফেলে আমরা তো কিছু বলতে পারবো না।”


নড়াইল শহরের বাঁধাঘাট এলাকা থেকে একটি নৌকা নিয়ে আমি উত্তর এবং দক্ষিণে বেশ কয়েকঘন্টা ঘুরে বেড়িয়েছি। নদী ঘুরে দেখা গেল অনেকে নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে তুলেছেন।

নদীর সীমানার মধ্যেই একতলা ভবন থেকে শুরু করে নানা ধরনের ঘর-বাড়ি এমনকি বহুতল ভবন পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। চিত্রা নদীতে এখন আর আগের মতো স্রোত নেই।


এই নদীতে তেমন কোন ভাঙা-গড়াও নেই। নদী যেহেতু ভাঙে না সে কারণে নদী পাড়ের বাসিন্দারা দখল করতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

চিত্রা নদীর সীমানা দখলের বিরুদ্ধে অনেকদিন ধরেই সোচ্চার স্থানীয় পরিবেশবাদী কাজী হাফিজুর রহমান।

তিনি মনে করেন প্রশাসন চাইলে খুব সহজেই এই নদীর তীর দখলমুক্ত করা সম্ভব। প্রশাসন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেই অনেকে নতুন করে নদীর তীর দখলে উৎসাহিত হচ্ছেন।

মি: রহমান বলেন, “আমি মনে করি নদী দখলমুক্ত হলে নদীর নাব্যতা যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে সেটি অন্তত কিছুকাল হলেও ধরে রাখা সম্ভব।”

চিত্রা নদীর উৎপত্তি চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুরহুদা উপজেলায়। প্রায় ১৩০ কি:মি: দৈর্ঘ্যের এই নদী চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-মাগুরা হয়ে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় নবগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।


এই চিত্রা নদী দেখতে নড়াইল শহর থেকে প্রায় ১০ কি:মি: দূরে ঘোড়াখালি এলাকায় গিয়েছিলাম। এই ঘোড়াখালি এলাকায় দুটো নদী একসাথে এসে মিশেছে। একটি চিত্রা অপরটি নবগঙ্গা।

চিত্রা নদী এখানে নবগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কিন্তু যে নদীটিকে চিত্রা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব নেই।

এটিকে এখন আর নদী বলা যায়না। ঘোড়াখালি এলাকায় চিত্রা নদী অনেকটা শুকনো খালের আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন বিভিন্ন জায়গায় নদী ভরাট হয়ে যাবার কারণেই চিত্রা নদীর এই করুণ দশা হয়েছে।

এই নদী পারেই জন্ম স্থানীয় বাসিন্দা সুবোধ কুমার বিশ্বাসের। চিত্রা নদীর করুণ দশা দেখে তার বুকে এখন শুধুই হাহাকার।

তিনি বলেন, “ চিত্রা নদীর অবস্থা কী আর বলবো? এখন তো কেরমেই (ক্রমেই) শুকায়ে যাচ্ছে।”


আরেকজন বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম জানালেন নদীতে পানি না থাকার কারণে এই অবস্থা হয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময়ে নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না।

তিনি বলেন, “মানুষের যে রকম পেটে ভাত না থাকিলে শরীরে বল থাকে না তেমনি নদীতে পানি না থাকিলে নদী মরে যায়। পানি থাকলে স্রোত থাকলে নদীর একটা যৌনতা থাকে।”

তিনি বলেন অনেকেই নদীর পার দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলেছে।

বিভিন্ন সময় চিত্রা পারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসন নানা পদক্ষেপ নিলেও সেটি স্থায়ী হয়নি।

নড়াইল জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন চিত্রা পারের অবৈধ স্থাপনার একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।


এই তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসনের কাছে দেয়া হবে। তিনি জানান অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কর্তৃত্ব জেলা প্রশাসনের হাতে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরিফ বলেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রাশাসন প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন উচ্ছেদ করতে গেলে আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

মামলা দায়ের না করে উচ্ছেদ করা যায়না বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেলা প্রশাসক বলেন মামলা দায়ের না করে উচ্ছেদ করেতে গেলে আইনগত বিপত্তি থেকে যায়।

সেজন্য অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে আইনগত প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ করা হবে বলে তিনি জানালেন।

অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর সেটিকে টিঁকিয়ে রাখতে জেলা প্রশাসন পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানালেন মি: শরিফ।


তিনি বলেন, “আমরা চাচ্ছি যে চিত্রার দুই পারে ওয়াকওয়ে (হাঁটার রাস্তা) তৈরি করে দেয়া হোক। এতে করে বিনোদনের জন্যও হবে বিষয়টা অন্যদিকে ওয়াকওয়ে তৈরি হলে দখলের বিষয়টি আর থাকবে না।”

তবে নড়াইল শহরে চিত্রা নদীর তীর দখলমুক্ত করা খুব একটা সহজ হবে না বলেও মনে করেন কর্মকর্তারা।

কারণ চিত্রা পারে যারা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তাদের মধ্যে স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন। সেজন্য উচ্ছেদ করতে হলে জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে।