খেলাপাগল এক বাড়ির গল্প
পারিবারিক অর্জন গুলোর সামনে শফিকুজ্জামান। ছবি:এহসান-উদ-দৌলা।‘‘কবিতায় আর কি লিখব?

যখন বুকের রক্তে লিখেছি

একটি নাম

বাংলাদেশ।’’

খড়কির রেললাইন ঘেঁষা ‘শাহাদাৎ সঞ্চারি’ সড়ক থেকে কয়েক গজ এগোতেই চোখে পড়বে বাড়িটা। ছয়তলা ভবনের সিঁড়িতে ওঠার মুখে ডঃ মনিরুজ্জামানের পোট্রেট। এই বাড়ির ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মনিরুজ্জামানই লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘শহীদ স্মরণে’। মুক্তিযুদ্ধে মণিরামপুরে যুদ্ধে শহীদ হওয়া ছোট ভাই আসাদুজ্জামানকে নিয়ে ওই কবিতা। যশোরের এই পরিবারের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। খেলাধুলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চমৎকার মেলবন্ধন শাহাদৎ আলীর পরিবারে।

পাকিস্তান আমলের বডিবিল্ডার শাহাদাৎ আলী চাকরি করতেন কলকাতার জেলা বোর্ডে। বাড়িতেই ছিল শরীরচর্চার সব সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো একটা জিমনেসিয়াম। শাহাদাৎ আলীর নয় ছেলের মধ্যে সবার বড় মনিরুজ্জামান। অসংখ্য গান ও কবিতার রচয়িতা। আরেক ছেলে মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান বিখ্যাত গীতিকার।

‘সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পারে দাঁড়িয়ে, এক মধ্যবয়সী নারী এখনো রয়েছে হাত বাড়িয়ে..। খোকা ফিরবে, ঘরে ফিরবে;’—সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে অবিস্মরণীয় এই গানটির রচয়িতা রফিকুজ্জামান। গানটি লিখেছিলেন ছোট ভাই আসাদকে মনে রেখেই। মা সাজেদা খাতুন যে ‘খোকা’র ফেরার আশায় দাঁড়িয়ে থাকতেন বাড়ির পাশের রেললাইনের ধারে, তিনিই আসাদ।

শফিকুজ্জামান ছিলেন ফুটবলার। ১৯৬২ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত খেলেছেন ঢাকায় প্রথম বিভাগে খেলেছেন। প্রথমে বিজিপ্রেস, ইস্ট এন্ড ক্লাব, ইপিআরটিসিতে। স্বাধীনতার পরে খেলেছেন ওয়ান্ডারার্স ও বিজেএমসিতে। এনামুজ্জামান জেলা দলের হয়ে হকি খেলেছেন। শহীদ আসাদও হকি খেলেছেন স্কুল দলের হয়ে। সবার ছোট তারিকুজ্জামান নান্নু জাতীয় দলের সাবেক হকি খেলোয়াড়। মোহামেডানে খেলেছেন টানা ২০ বছর। শফিকুজ্জামানের ছেলে আশিকুজ্জামানও জাতীয় দলের সাবেক হকি খেলোয়াড়। এমনকি নাতি সামিউল আলম তায়কোয়ান্দোতে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন।

খড়কির বাড়িতে শোকেস ভর্তি বিভিন্ন পদক, ট্রফি, সম্মাননা স্মারক। এসব দেখিয়ে শফিকুজ্জামান বলছিলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন বডিবিল্ডার। আমাদের রক্তে ঢুকে গেছে খেলাধুলা। এ সব তারই স্মারক।’

ছোটবেলায় শফিকুজ্জামান বন্ধুদের নিয়ে তরুণ সংঘ নামে দল গঠন করেছিলেন। তখন মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। বাড়ির পাশেই ছিল খেলার মাঠ। সেখান থেকেই খেলাধুলার হাতেখড়ি। বিজি প্রেসে শফিকুজ্জামান খেলেছেন কায়কোবাদ, হাজী কাশেমদের সঙ্গে। যশোরের বড় ভাই সাবেক ফুটবলার ওয়াজেদ গাজী তৎকালীন ইপিআরটিসিতে (বর্তমান বিজেএমসি) খেলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

ক্যারিয়ারে লাল কার্ড দূরে থাক, কখনো নাকি হলুদ কার্ডও পাননি শফিকুজ্জামান! ছেলে শুধু খেলা নিয়ে মেতে থাকুক, এটা চাইতেন না বাবা। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শফিকুজ্জামানের মুখে হাসি, ‘যাতে মাঠে যেতে না পারি, এ জন্য বাবা একবার ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছিলেন। কিন্তু ওই দিন ছিল আমাদের খেলা। আব্বা অফিসে চলে যাওয়ার পর দাদি তালা খুলে দিয়ে বলেন, মাগরিবের আজানের সময় চলে আসিস। কিন্তু আমার আসতে দেরি হয়ে যায়। বাবা টের পেয়ে লাঠি দিয়ে অনেক মেরেছিলেন।’

খেলা ছেড়েছেন অনেক আগে। শিক্ষাবোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা এখনো যশোরের থানার সামনের চৌরাস্তার মধু সুইটসে বসে নিয়মিত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন। আড্ডাতেও উঠে আসে খেলাধুলা।

আসাদের নাম জড়িয়ে আছে যশোরে বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে। আসাদ ক্রিকেট একাডেমি, স্মৃতি সংঘ, ফুটবল একাদশ...। এক সময় যশোর জেলা ক্রিকেট লিগে দাপুটে দল চিল আসাদ ক্রীড়া সংঘ। আসাদের প্রসঙ্গ উঠতেই শফিকুজ্জামান বললেন, ‘ও খুব জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ও এমএম (মাইকেল মধুসূদন) কলেজের ভিপি ছিল।’

অতীতের স্মৃতিচারণা করতে করতেই আক্ষেপ ঝরে পড়ে শফিকুজ্জামানের কণ্ঠে। যশোরে বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপের প্রথম পর্ব হয়ে গেল। অথচ এক সময়ের নামী ফুটবলার ও সংগঠককে একটা সৌজন্য টিকিট দেওয়ার সৌজন্যও দেখাননি আয়োজকেরা।