যশোরের সুফী সাধক
জোড় মসজিদ, বারোবাজার, ঝিনাইদহ

আরবজাতি বহু শতাব্দী পূর্ব থেকেই সভ্যতার শীর্ষদেশে আরোহণ করেন এবং তাঁরা বিদেশ ভ্রমণে, ব্যবসায় বাণিজ্যে অভ্যস্ত ও উন্নত ছিলেন। অষ্টম শতাব্দীতে বহু আরব বণিক দলে দলে বাণিজ্যপোত ও নৌ চালনা করে বিভিন্ন দেশে গমনাগমন করতে থাকেন এবং এই ভাবে ভারতের সংগে তাঁদের ব্যবসায় বাণিজ্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাঁরা তাঁদের ব্যবসায় বাণিজ্য উপলক্ষে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল সমূহে উপনিবেশ গড়ে তোলেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। রাজশাহী জেলার অন্তর্গত পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তূপে আবিস্কৃত একটি প্রাচীন আরবী মুদ্রা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই মুদ্রাটি আরবাসীর খলিফা হারুণ উর রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রীঃ রাজত্বকাল) এর শাসনামলে ৭৮৮ খ্রীষ্টাব্দে (১৭২ হিজরী) আল মুহাম্মদীয়া টাকশালে মুদ্রিত হয়েছিলো। ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী যে সময় বংগ বিজয় করেন, তার অনেক কাল আগে অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীর গোড়াতে আরবের বণিক ও ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ঢাকা বিভাগের সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলে ইসলামের বাণী বহন করে আনেন। খ্রীষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম বন্দর আবর ব্যবসায়ী ও বণিকদের উপনিবেশে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে চট্টগ্রাম তৎসংলগ্ন অঞ্চলে আরবীয় বণিক ও ব্যবসায়ীদের প্রভাব প্রতিপত্তির ফলে যখন স্থানীয় লোকজন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় এবং এই ধর্ম এদেশের বহু অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়, তখন আরব ও মধ্য এশিয়ার বহু পীর, দরবেশ ও সুফী সাধক ইসলাম ধর্ম প্রচার কল্পে স্বদেশ পরিত্যাগ করে পূর্ববংগের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। অতঃপর তুর্কীগণের দ্বারা বাংলাদেশ বিজিত হলে বাংলাদেশের পীর দরবেশ ও সুফী সাধকগণ ধর্ম প্রচারের মহান ব্রত গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার ন্যায় যশোর জেলায় ও ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল।


যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত সুন্দরবনের বেদকাশী নামক স্থানে পীর খালস খাঁর প্রচার ক্ষেত্রে ছিল। তিনি এই জেলার একজন সুফী দরবেশ। এখানকার এক বিশাল দীঘির (খালাস খাঁ দীঘি) পাড়ে একটি প্রাচীন কালীমঞ্চের পার্শ্বে পীর অনন্ত নিদ্রায় শায়িত রয়েছেন। যতদূর জানা যায়, পাঠান আমলে তিনি ধর্ম প্রচার করেন।


যশোর জেলার বারবাজার নামক স্থান এই জেলার ইসলাম প্রচারের প্রাচীন কেন্দ্রস্থল। প্রবাদ আছে, বারজন পীরের দ্বারা এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিলো। বারজাবারের ভাংগাচোরা মসজিদ ও দীঘি এখনও ইসলাম প্রচারে সাক্ষ্য দান করেছে। প্রকৃত পক্ষে যশোর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও ইসলামী আদর্শ সম্প্রসারণের বেলায় যাঁর কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় তার নাম উলুঘ খাঁন ই জাহান এই জেলার জন সাধারণ মাত্রই এই পীরের কথা এখনও ভক্তিভরে উচ্চরণ করে থাকেন। এর ধর্ম প্রচারের বৃত্তান্ত বাংলাদেশের ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যশোর ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে শিষ্য ও সহচরদের প্রেরণ করে ইসলাম প্রচারের যে সুব্যবস্থা করেছিলেন তা প্রশংসনীয়। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ভৈরবকূলে মুরলী কসবায় গরীব শাহ ও এহরাম শাহ, খানপুর বিদ্যানন্দকাঠি, সরবাবাদ মীর্যাপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বুড়া খান ও তৎপুত্র ফতেহ খান, মেহেরপুর গ্রামে পীর সুজান শাহ, পয়গ্রাম কসবায় মুহম্মদ তাহির ইসলাম প্রচার করে লব্ধপ্রতিষ্ঠ হয়েছিলেন। খানপুর ও বিদ্যানন্দকাঠিতে বুড়া খাঁ ও ফতেহ খাঁর প্রচেষ্টার ফলে ঐ অঞ্চলে বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। যশোর জেলার মাগুরা নামক স্থানে পীর জয়ন্তী নামক এক নবদীক্ষিত মুসলমান বহু হিন্দু ও অসুসলমানকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দান করেছিলেন। তার দরগাহে এখনও অম্বুবাচীর সময়ে মেলা বসে। পয়গ্রাম কসবার মুহম্মদ তাহিরের (ওরফে পীর আলী) নাম বাংলায় সুপরিচিত । এই পীরের কর্ম তৎপরতায় বহু হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পূর্বক গোড়া ও নিষ্ঠাবান মুসলমান হয়ে উঠেছিলেন।


খাঁন জাহান আলী ইসলাম ধর্ম প্রচার ও জনহিতকর কার্যে বহুকাল নিযুক্ত থাকার পর শেষ জীবনে বংগের দক্ষিণ অঞ্চলের শাসনভার প্রাপ্ত হয়েছিলেন তার রাজধানি ছিলো পয়গ্রাম কসবায়। মৃত্যুর পূর্বে তার নিজের আদেশে তার সমাধি স্মৃতি ফলক উৎকীর্ণ হয়েছিল। এই স্মৃতিফলক অনুসারে জানা যায় যে, তিনি হিজরী ৮৬৩ সালে (১৪৫৯ খৃষ্টাব্দে) ২৬ শে জিলহ্জ্জ বুধবার চিরনিদ্রায় শায়িত হন।


সম্পাদনা: অনন্ত পলাশ