অবিভক্ত যশোরে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস
ক্যালিগ্রাফি: মাহবুব মুর্শিদ

৬১০ খৃষ্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকেই ক্রমান্বয়ে মক্কার মানুষের কাছে ইসলামের কথা পৌছে। ৬২২ খৃষ্টাব্দে মহানবী (সঃ) মদিনায় হিজরত করেন। মদিনার হিজরত একটি নয়া দিগন্তের সূচনা করে। ৬২৮ খৃস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে মহানবী (সঃ) পারস্য রোমসহ বিভিন্ন দেশের রাজা, বাদাশাহ শাসনকর্তার কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র দেন। আর তখনই সারা দুনিয়ায় ইসলামের বাণী পৌছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) খিলাফত কাল থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকে। এই শতাব্দী যেতে না যেতেই অধিকাংশ জাহানে ইসলামের হুকুমাত কায়েম হয়।


বাংলাদেশে প্রাথমিক যুগেই ইসলামের বানী এসে পৌঁছে। ঐ একই সময় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল তথা যশোর-খুলনা এবং তৎকালীন ভারতভুক্ত ২৪ পরগণা অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। উল্লেখ্য যে পূর্বে খুলনা যশোর জেলারই অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৮৮১ সালের প্রথমে যশোর জেলা থেকে আলাদা করে খুলনা জেলার পত্তন করা হয়। এমনকি এক সময় ২৪ পরগনার বিরাট অংশ ছিল যশোর ভূক্ত।


যশোর অঞ্চলে ঠিক কোন সালে ইসলামের আবির্ভব ঘটে এবং কে বা কারা এখনে ইসলামের বাণী বহন করে আনেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা যায় ইসলামের প্রথম যুগেই এ অঞ্চলে ইসলামের আলো এসে পৌছায়। ১১২৯ খৃষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০১ খ্রীঃ) ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বংগ বিজয়ের বহু পূর্ব এমন কি মুহম্মদ বিন কাসিমেরর সিন্ধু বিজয়ের (৭১২ খ্রীঃ ও পূর্বে এ দেশে প্রায় পঁচিশটি ইসলাম প্রচারক কাফেলা আগমন করেন। সেগুলি মোমিন ইসলাম প্রচারক দল। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেয়ে ইসলামের শ্বাশতবাণী শুনাতেন। তাদের পরশে দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে আরো দশটি প্রচারক দলের আগমন ঘটে, যাদেরকে রাজনৈতিক গাজী ইসলামের প্রচার দল নামে অভিহিত করা হয়। এই গাজী দলসমূহের সদস্য সংখ্যা ছিলো অনেক। এই দলের কয়েকজন গাজী যেমন: জায়েদ গাজী, আহমদ গাজী, হুসায়নী গাজী, মুহম্মদ গাজী, মওদুদ গাজী, মুবাশ্বর গাজী, মমিন গাজী, আমজাদ গাজী, সাহেব গাজী ও আবদুল্লাহ প্রমুখদের নাম জানা যায়। এরা অধিকাংশই আরবদেশ থেকে এখানে আগমন করেন। অনেকেই যশোর খুলনা চব্বিশ পরগনা অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। যশোরের শ্রীপুর উপজেলা এলাকায় চারজন গাজীর আগমন ঘটে। বর্তমান দ্বারিয়াপুর ইউনিয়নে তাঁরা তাঁদের কর্মকেন্দ্র স্থাপন করে। এখানে গড়ে ওঠে এক নতুন জনপদ। গাজী সানাউল্লাহ ওরফে রণ গাজী এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে ইসলামের ব্যাপক প্রাচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন। গাজীদের প্রচার ও প্রভাবে এ অঞ্চলে হিন্দু-বৌদ্ধ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।


মুহম্মদ ইখতিয়ার উদ্দীন বিন বখতিয়ার খিলজীর বংগ বিজরেয় পরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দরবেশ দলের আগমন ঘটে। অন্যতম দরবেশ হযরত সৈয়দ শাহাদাত আলী গাজী যশোর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। এই দরবেশ পরিবারেই বাঁশের কেল্লার মহানায়ক শহীদ তিতুমীর ওরফে সৈয়দ নিছার আলী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিতুমীরের জিহাদে যশোর অঞ্চলের শত শত বীর মুজাহীদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রাক্ষণ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শরীক হয়ে অমর হয়ে রয়েছেন। যশোর শহরের এগারো মাইল উত্তরে ঢাকা সড়ক (এশিয়ান হাইওয়ে) এর পার্শ্বেই বারোবাজার গ্রাম ও রেল স্টেশন অবস্থিত। এই বারোবাজার বারো আওলিয়ার স্মৃতি বহন করছে। তুর্ক আফগান আমলে মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রস্থল গড়ে ওঠে। এখানেই গাজীকালু চম্পাবতী খ্যাত ঐতিহাসিক গাজীর কর্মস্থল ছিল বলে জানা যায়। গাজীর প্রকৃত নাম বরখান গাজী। তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য সুপরিচিত হয়ে রয়েছেন। তাকে নিয়ে সৃষ্ট হয়েছে নানা কিংবদন্তী। যশোর শহর থেকে ৪ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত গাজীর দরগা নামক স্থানটি ছাড়াও যশোরের বিভিন্ন স্থানে তাঁর স্মৃতি বহনকারী অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বর্তমান গাজীর দরগায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্টিত হয়েছে।


যশোর অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বৃহত্তর অবদান রাখার জন্য হযরত খাঁন জাহন আলী অমর হয়ে রয়েছেন। তাঁর প্রকৃত নাম উলুঘ খাঁন। খাঁন ই জাহান বা খাঁন জাহান তাঁর উপাধি। ১৩৯৯ খৃষ্টাব্দে তৈমুর লং এর আক্রমণের ফলে ভীত শন্ত্রস্ত হয়ে অসংখ্য আমীর উমরা ও অভিজাতবর্গ দিল্লী জৈনপুর প্রভৃতি অঞ্চল হতে পলায়ন করে। সম্ভবতঃ এই সময় জৈন পুর থেকে সেনাপতি খাঁন ই জাহান কিছু সংখ্যক সৈন্য সামন্ত ও বারোজন সুফী দরবেশকে সংগে নিয়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। বাংলাদেশে এসে তিনি যশোরের বারোবাজারে প্রথম খানকা স্থাপন করেন। এখানে তিনি একটি সুরম্য মসজিদও স্থাপন করেন। ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি এক বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর সুফীদের নেতৃত্বে তিনি কয়েকটি দল ইসলাম প্রচারের জন্য বিভিন্ন স্থান প্রেরণ করেন। জনগণের অভাব অভিযোগ পুরণের জন্য তিনি কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। সেচ ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানি যাতে জনসাধারণ পায় সেজন্য তিনি এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পুকুর ও দীঘি খনন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয় সুন্দর সুন্দর মসজিদ সরাইখানা ইত্যাদি তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ অঞ্চলের আপামর জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণ করে। খাঁন জাহান বারোবাজার থেকে এসে মুরলী ও পরে পায়গ্রাম কসবায় কিছুদিন অবস্থান করেন। মুরলীতে গড়ে উঠে এক সভ্য শহর। আধুনিক যশোর এখানেই অবস্থিত। এখানে তার দুজন সুফী সহচর হযরত শাহ গরীব ও শাহ বুরহানের মাযার রয়েছে। খান জাহান পরবর্তীকালে বাসুড়ী হয়ে বাগেরহাটে যেয়ে স্থায়ী আবাস স্থান করেন এবং প্রতিষ্ঠিত করেন এক নতুন রাজ্য। রাজ্যের নাম হয় খলিফাতাবাদ। বাগেরহাটের বেশ কয়েকটি সমজিদ বিশেষ করে ষাট গম্বুজ মসজিদ ও দরবার গৃহ কয়েকটি বিরাট দীঘি দরগা ভবন ইত্যাদি তার স্মৃতি অমর করে রেখেছে। খান জাহান ১৪৫৯ খৃষ্টাব্দের ২৫ অক্টোবর বাগের হাটে ইন্তেকাল করেন। খান জাহনের পরশে ও তার শিষ্যগণের প্রচার কর্মের ফলে এ অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে নবজীবন লাভ করে। গোবিন্দ ঠাকুর নামে জনৈক হিন্দু ব্রাক্ষণ ঠাকুর দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে ইসলাম প্রচার কার্যে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি পীর আলী নামে সুপরিচিত। তিনি খাঁন জাহানের প্রধান সহচরে পরিণত হয়েছিলেন। বাগেরহাটে খাঁন জাহানের মাজার গৃহের চত্বরেই তার মাজার বর্তমান রয়েছে। এই পীর আলীর নাম থেকে পীরালী ব্রাক্ষণ ও পীরালী মুসলামানের উৎপত্তি হয়েছে। পীরালী ব্রাক্ষণের সাথে রবীন্দ্রনাথের বংশ সূত্র রয়েছে বলে জানা যায়। অনেকেই মনে করেন যশোরের পেড়োইল গ্রামটি পীর আলী স্মৃতি বহন করছে। সুলতানী আমলে কেশবপুরের ভারত ভায়না গ্রামে একটি সুরম্য সমজিদ স্থাপিত হয়। কালের সাথে লড়াই করে আজও তা টিকে রয়েছে। হোসেন শাহী আমলে এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ব্যাপক তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। সুলতান নসরত শাহ শৈলকূপাতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যা আজও প্রায় অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। ইসলাম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি এখানে মওলানা সুফী মুহম্মদ আরব নামক একজন অলীয়ে কামেলকে নিয়োগ করেন। মওলানা মুহম্মদ আরব এখানে বাসস্থান স্থাপন করে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আন্তনিয়োগ করেন। তাঁর এবং তাঁর খলিফাবর্গ যেমনঃ সৈয়দ শাহ আবদুল কাদির বাগদাদী ও আবদুল হাকিম খাঁনের পরশে এসে এই অঞ্চলের মানুষ দলে দলে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়। মাগুরা মহম্মদপুর অঞ্চলটি হযরত সুফী মাহমুদ শাহের স্মৃতি বহন করছে। এই মহান সুফীর প্রতি রাজা সীতারাম রায়ের অকৃত্রিম আকর্ষণ ছিলো বলে জানা যায়। রাজা সীতারাম এই মহান সাধকের নামেই নিজের রাজধানীর নামকরণ করেন মাহমুদপুর বা মুহম্মদপুর এখানে এক সময়ে গৌড় বংগের একটি টাকশাল ছিলো বলে জানা যায়। মুঘল বাদশা আকবরের আমলে যশোর এলাকায় ইসলাম প্রাচারে বিশেষ বিশেষ অবদান রাখেন হযরত শাহ সুফী সুলতান আহমদ। তিনি রাজা মানসিংহের সাথে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে এখানে আগমন করেন। তিনি যশোরে ইসলাম প্রচারের জন্য থেকে যান। চাঁচড়ার রাজা শুকদেব সিংহরায় তাঁর বসবাসের জন্য রাজবাড়ির খিড়কীর দিকে বেশ কিছু লাখেরাজ (খাজনাবিহীন)সম্পত্তি প্রদান করেন। খিড়কী এলাকা পরে খড়কী এলাকায় পরিণত হয়। খড়কী যশোর শহরেই অবস্থিত। এই পরিবারের বুজুর্গগণ এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য সুপরিচিত হয়ে রয়েছেন। মওলানা শাহ মহম্মদ আবদুল করিম রচিত এরশাদে খালেকিয়া বা ”খোদা প্রাপ্তি তত্ত্ব” গ্রন্থ খানি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সর্বাধিক প্রাচীন প্রামান্য তাসাউফ গ্রন্থ হিসাবে সুপরিচিত। এখানে এই পরিবারের বুযর্গগণের মাযার রয়েছে।


হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রাঃ) এর উত্তর পুরষ হযরত শাহ হাফিজ অষ্টাদশ শতাব্দিতে ফরিদপুরের গির্দা নামক স্থান থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য মাগুরা এসে খানকা স্থাপন করেন। নলডাংগার মহারাজা তাঁর বসবাসের জন্য বেশ কিছু লাখেরাজ (খাজনাবিহীন) সম্পত্তি দেন। হযরত শাহ হাফিজের প্রপিতামহ হযরত শাহ আলী বাগদাদী পঞ্চদশ শতাব্দীতে দিল্লীর সৈয়দ সালতানাতের যুগে বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য ফরিদপুর অঞ্চলে এসে খানকা স্থাপন করেন। দিল্লী সুলতান তাঁকে ফরিদপুরের ঢোল সমুদ্র অঞ্চলে বারো হাজার বিঘা জমি লাখেরাজ (খাজনাবিহীন)দেন। তিনি সেখানে খানকা স্থাপন করেন সেই জায়গার নামকরণ হয় গির্দা। পরে তিনি ঢাকার মীরপুরে এসে এক বদ্ধ গৃহে গভীর মুরাকাবায় মগ্ন এবং এখানেই ইন্তেকাল করেন। (১৪৯৮ খৃঃ) যে গৃহে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। এখনও তাঁর মাযার শরীফে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তের ভীড় জমে। হযরত সৈয়দ শাহ হাফিজ যশোরের যে এলাকয় এসে ইসলামের আলো জ্বালিয়েছিলেন সেখানকার নামকরণ হয়ে যায় আলোকদিয়া। সৈয়দ শাহ হাফিজের বংশধরদের পারিবারিক ঐতিহ্য আজও অক্ষুন্ন রেখে চলেছেন তাঁর উত্তরসুরীরা।


ইসলামের প্রচার ও রক্ষার ক্ষেত্রে এক বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। কর্মবীর হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ১৮৬১ খৃষ্টব্দের ২ শে ডিসেম্বর সোমবার যশোর জেলার বারোবাজারের নিকটবর্তী ঘোপ গ্রামে মাতুলালয়ের তিনি জন্মগ্রহণ করেন। খৃষ্টান মিশনারীরা যখন ইসলামরে বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে এবং নানা লোভ লালসা দেখিয়ে মুসলিম সমাজকে ধর্মচ্যুতি ঘটানোর প্রয়াসে লিপ্ত সেই সময় মুনশী মেহেরুল্লাহ ইসলাম দরদী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ”ভারত ইসলাম প্রচার সমিতি” গঠন করেন। ইসলাম প্রচারের মূল দায়িত্ব তাঁর উপরই অর্পিত হয়। তিনি পূনোর্দ্যমে সভা সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে এবং তর্ক যুদ্বের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের লিপ্ত হন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে বহু খৃষ্টান পাদরীও ইসলামে দীক্ষিত হয়। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। সমাজের মধ্যকার অন্যায় অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করেন। মওলানা আকরম খাঁ, মৌলভী শেখ ফজলুল করিম সাহিত্য বিশারদ এবং সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রমুখ মনীষী তাঁরই প্রেরণার ফসল। তাঁর অনল প্রবাহেরই প্রেরণায় জন্ম নেয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা। মুনসী মেহরুল্লাহ তাঁর যুগের দুজন মহান ব্যক্তিত্বের সাহচর্যে উদ্ভসিত ছিলেন। তাদের প্রথমজন হলেন ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দেদেজমান হযরত মওলানা শাহ সুফী আবু বকর সিদ্দীকী (রাঃ) এবং অন্যজন খড়কীর পীর হযরত মাওলানা শাহ সুফী মোহাম্মদ আবদুল করিম (রাঃ)। তিনি খড়কীর পীর মওলানা শাহ মোহাম্মদ আবদুল করিমের কাছে মুরীদ হয়েছিলেন। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে বিশেষ অবদান রাখেন গংগারামপুরের হযরত শাহসুফী, এনায়েত পুরের খাঁন বাহাদু, মওলানা আহমদ আলী এনায়েত পুরী ও ইরান থেকে আগত নওয়াপাড়ার পীর পরিবার।


যশোর অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে যারা ইসলামের প্রচার প্রসার ও সামাজিক সংস্কারে নিয়োজিত ছিলেন তাদের মধ্যে যারা স্মরণীয় মাগুরা গ্রামে পীর জয়ন্তী খানপুর ও বিদ্যানন্দকাঠি অঞ্চলে বুড়া খান তার পুত্র ফতেহ খান পীর সুজন শাহ মেহেরপুর অঞ্চলে পীর মহিউদ্দীন লোহগড়া অঞ্চলে দেওয়ান ভ্রাতৃদ্বয় প্রমুখ।


তৎকালীন যশোর অঞ্চলে প্রচুর ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা গড়ে উঠে যেমন, মাগুরা সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসা, যশোর আমিনীয়া মাদ্রাসা, যশোর রেলওয়ে মাদ্রাসা, লাউড়িয়া মাদ্রাসা, মাছানা মাদ্রাসা, শাহবাজপুর মাদ্রাসা, নওয়াপাড়া ও শাহবাদ মাদ্রাসা। সাম্প্রতিককালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর উদ্যোগে যশোর শহরে একটি ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও জেলার বিভিন্ন মসজিদে শতাধিক সমজিদ পাঠাগার স্থাপিত হয়েছে। যশোরের যে সমস্ত কবি সাহিত্যিক ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করে দেশে বিদেশে যশ কুড়িয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ডাক্তার লৎফর রহমান, শেখ হাবিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি ফররুখ আহম্মদ, কবি গোলাম হোসেন, কবি আশরাফ আলী খাঁন ফকির লালন শাহ, দুদু শাহ, পাঞ্জু শাহ, পাগলা কানাই এরা সবাই যশোরের সন্তান। বিশিষ্ট ইসলামিক দার্শনিক অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের পূর্ব পুরুষের বাস ছিল যশোরের পানাইল গ্রামে। মরমী কবি হাসন রাজার আদিবাস যশোরেই ছিল বলে জানা যায়।


যশোর শব্দের অর্থ সেতু তাই হয়ত ইসলামী চেতনার উন্মেষে কি একাল কি সেকাল-সব কালেই যশোর যেন সেতু বন্ধের কাজ করে চলেছে অন্ততঃ যশোরের ইতিহাস তো তাই বলে।


সম্পাদনা: অনন্ত পলাশ