যশোরের বিখ্যাত নলেন গুড়ের সুনাম হারিয়ে যাওয়ার পথে

হারিয়ে যাওয়ার পথে যশোরের বিখ্যাত নলেন গুড়। যে রস বা গুড়ের জন্য বিখ্যাত এই জেলা তা কোনও রকমে টিকে আছে। খেজুর গাছের স্বল্পতা, জ্বালানির অভাব ও দক্ষ গাছি না থাকা এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে জানান স্থানীয়রা।

তবে খেজুর গাছের স্বল্পতায় সরকারিভাবে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কৃষি

সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে ।

নলেনগুড়, পাটালি ও ঝোলা গুড়ের জন্য বিখ্যাত যশোরের খাজুরা, এনায়েতপুর, লেবুতলা, পান্তাপাড়া, যাদবপুর, গোবরা, জহুরপুর, মাঝিয়ালি, মথুরাপুর, তেলকুপ, মির্জাপুর প্রভৃতি গ্রাম। দেশসেরা নলেন গুড় তৈরিতে বিশেষ ধরনের খেজুর রস ব্যবহার করা হয়।

যাকে নলেন রস বলে থাকে এ অঞ্চলের মানুষ। নলেন গুড় থেকে তৈরি হয় নলেন গুড়ের সন্দেশ, ক্ষীর ও পায়েস। এ গুড় মানুষের হাতে পৌছে দিতে আশ্বিনের শেষের দিকে এসব এলাকায় বিস্তৃত জমি জুড়ে থাকা সারি সারি খেজুরগাছ প্রস্তুত করতেন গাছিরা রসআহরণের জন্যে।

অথচ সেই গাছ, রস ও গুড়ের খ্যাতি ও গাছিদের ব্যস্ততা μমেই বিলীন হওয়ার

পথে। যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন বলেন, ‘আগে আমাদের ৪ পনেরও (১পন হলো ৮০টি) বেশি খেজুর গাছ ছিল। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ৬ ভাইয়ের মধ্যে গাছগুলো ভাগ হয়ে যাওয়ায় এখন আর তেমন গাছ তোলা (খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করা) হয় না। শুধু নিজেরা খাওয়ার জন্যে আর নলেন পাটালি গুড় একটু বেশি দামে বিμি হয় বলে সামান্য কিছু তৈরি করি।

একই এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান জানান, তাদের আগে ৩০০ থেকে ৪০০টি গাছ ছিল। এখন ৬০/৭০টির মতো গাছ আছে। তাও সব গাছ তোলা হয় না। শীতের সময়টা নলেন পাটালি বানিয়ে বিμি করি। বাজারে যাওয়া লাগে না, বাড়িতে এসে শহর থেকে

লোকজন বসে বানানো হলে নিয়ে যায়। দামটা ভাল পাই। কিন্তু যে গুড় তৈরি করি তা পূর্বের তুলনায় খুবই কম।

জহুরপুর হাইস্কুলের শিক্ষক ইন্তাজুল ইসলাম বলেন, যে খেজুরের রসেরকারণে এই খাজুরার এত নাম ডাক তা এখন সেইরকম নেই বললেই চলে। খেজুরের গাছ কেটে সেখানে অন্যগাছ লাগানো, মাঠগুলোতে ধান-সবজির আবাদ, রস জ্বালানোর কাঠের স্বল্পতা, পেশাদার গাছির অভাব ইত্যাদি কারণে এখন আর আগের মত গুড় পাটালির মৌ মৌ গন্ধ পাওয়া যায় না।

তিনি আরও জানান, এখন গুড় তৈরির খরচের সঙ্গে বিμয় মূল্যের বেশ তফাত। এ কারণে কৃষকরাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অধিক পরিমাণে গাছ লাগাতে তিনি সরকারের পৃষ্টপোষকতা দাবি করেন।

স্থানীয় ইউপি মেম্বর রবিউল ইসলাম জানান, শুনেছি সরকার যশোরে খেজুর গাছ রোপনে ব্যবস্থা করেছে। এটি কার্যকর হলে আশা করছি আমাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পাবো।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, একশ্রেণীর ব্যবসায়ী নলেনের সুনাম কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করছে। তারা আখের গাদ দিয়ে তৈরি মুচি, চিনি ও নারকেল দিয়ে গুড় তৈরি করে বাজারে বিμি করছে। অথচ ওই গুড়ে খেজুরের রসের নন্যুতম কোন উপস্থিতি নেই। তাদের এ প্রতারণার ব্যবসাও প্রকৃত গুড় তৈরিকারীদের সমস্যায় ফেলছে বলে জানান তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, খাজুরার গুড়ের যে সুখ্যাতি রয়েছে তাতে সরকারি পৃষ্টপোষকতা বৃদ্ধি করা হলে গুড় থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। যশোরে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ খেজুর গাছ রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৭

লাখ গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে সরকার দেশে তাল-খেজুর গাছ সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের অধীনে সরকারি রাস্তার পাশে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় এক হাজার, শার্শা, ঝিকরগাছা ও চৌগাছায় ৬০০ করে, বাঘারপাড়া ও কেশবপুরে ৫০০ করে এবং অভয়নগরে ৩০০ ও মণিরামপুরে ৯০০ গাছ রয়েছে।