হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড
ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড

কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে ’সড়ক এ আজম’ তথা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড়ের ইতিহাস। চার শতাব্দীর পুরাতন এ সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৩টি দেশে তা ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। মুঘল আমলে যা এদেশেরও প্রধান সড়ক হিসেবে বিবেচিত হত। অথচ, সড়কটি চালু থাকলে ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দূরত্ব আরো অন্তত ৬০ কিশোমিটার কমে যেত।

১৫৩৭ সালে মুঘল স¤্রাট হুমায়ূনের সেনানায়ক হিসেবে শের শাহ বাংলা জয় করেন। এরপর ১৫৪০ সালে এ অঞ্চলে তিনি আফগান শুরি সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মাত্র পাঁচ বছরের শাসনামলে শের শাহ’র তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয় ’সড়ক এ আজম’। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে যশোর হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ও পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত এ সড়কটি। শের শাহ’র তত্ত্বাবধানে নির্মিত মোট ২৫শ’ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করেছে। ওই আমল থেকেই সড়কটি এতদাঞ্চলের মূল সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে মৌর্য সা¤্রাজ্যের রাজারা এর সংস্কার করেন। ১৮৩৩ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সড়কটির আরেক দফা সংস্কার করে বৃটিশরা। তখন তারা এর নামকরণ করে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এর আগে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন শাসকরা শাহ রাহে আজম, সড়কে আজম, বাদশাহি সড়ক ও উত্তর পথ হিসেবেও চিহ্ণিত করেছেন সড়কটিকে।

বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান শের শাহ’র নির্মিত এ সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এর চিত্র পুরোটাই উল্টো। এখানে যে অংশটুকু এখনও ঐতিহাসিক এই সড়কটির সাক্ষ্য বহন করে চলছে তার অবস্থা চরম শোচনীয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে সড়কটির অস্তিত্ব রয়েছে কেবলমাত্র যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায়। শের শাহ সড়ক নামে উপজেলার প্রবেশমুখ থেকে বিপরীত দিকের শেষ সীমানা পর্যন্ত মাত্র ৩৭ কিলোমিটার, বর্তমানে আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওই অঞ্চলের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, ব্রিটিশদের শেষ দশকেও বাংলাদেশে শের শাহ সড়কটি এতদাঞ্চলের স্থলপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ওই সময়ও এদেশের মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করত সড়কটি। পাকিস্তানি আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কারকালে বিকল্প একাধিক সড়ক নির্মাণ হলে ঐতিহ্য সংকটে পড়তে শুরু করে শের শাহ সড়ক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সময় শুরু হয় এর অস্তিত্বের লড়াই। বর্তমানে যা চরম আকার ধারণ করেছে।

যশোর সকরারি এমএম কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান নাসিম আরা বেগম জানান, নির্মাণের পর থেকে কয়েক শতাব্দী ধরে শের শাহ সড়কই ভারত উপমহাদেশের ভেতর স্থলপথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হত। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্থানে এ সড়কটি ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। তিনি বলেন, ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে ওই দেশগুলোর সরকার সময়ের সাথে সড়কটির সংস্কারের ধারা অব্যাহত রেখেছিল। ফলে সড়কটি সেখানে আজো শের শাহ’র নির্মাণ কীর্তিকে অমর করে রেখেছে। বাংলাদেশে অস্তিত্ব সংকটে পড়া সেই সড়কটিকে টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্পই নেই। কেননা, ইতোমধ্যেই এটি আঞ্চলিক সড়কে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বৃহৎ প্রকল্প। কেবলমাত্র যা বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই বাংলাদেশেও ’’মুঘল-ই-আজমের’’ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

এ ব্যাপারে আলাপকালে সড়কটির তত্ত্বাবধানকারী যশোর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মোঃ শাহরিয়ার জানান, সড়কটি ব্যবহার উপযোগী করা হলে ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দূরত্ব আরো অন্তত ৬০ কিলোমিটার কমে যেত। কিন্তু এ বিষয়ে কোন প্রকল্প নেই তাদের কাছে।