মাটিচাপা ইতিহাস দিনের আলোয়
১৭৮১ সালে গঠিত ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোরের মানচিত্র।ছবি
মাটিচাপা পড়া ইতিহাস খুঁড়ে বের করেছেন প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম। ১৭৮১ সালে গঠিত ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোরের ছেঁড়াফাটা ঐতিহাসিক সেই মহামূল্যবান মানচিত্র খুঁজে পেয়েছেন তিনি। জরাজীর্ণ কাগজের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করেছেন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড প্রণীত শত বছর আগের সিলেবাস, বাধ্যতামূলক টিকা দেওয়ার নোটিশ। খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা চিঠি। এ ছাড়া তিনি দীর্ঘ দুই বছর ধরে দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেছেন জেলা পরিষদের মূল্যবান ছবি ও দলিল-দস্তাবেজ।
যশোর জেলা পরিষদ ভবনের শতবর্ষ ও সেবার ১২৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘শতবর্ষী’ নামের স্মরণিকায় এ বিষয়গুলো সংকলিত করে মূল্যবান এক ইতিহাসের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন নূরুল ইসলাম। ভূমিকা রেখেছেন দেশের জেলা পরিষদের নতুন উপাখ্যান রচনায়।
উনিশ শতকের কোনো মানচিত্র এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নূরুল ইসলাম ১৯১৭ সালের যশোর জেলার মানচিত্র বাংলাদেশ ও ভারতে খুঁজেছেন। আর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে তিনি যেন সাপের সন্ধান পেয়েছেন। যশোর জেলা পরিষদের রেকর্ড রুমেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন ১৭৮১ সালের ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোরের ঐতিহাসিক মানচিত্র। এই মানচিত্রে যশোর জেলার মধ্যে রয়েছে ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা ও কৃষ্ণনগর। স্মরণিকায় সংকলিত মানচিত্রটি ভৌগোলিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানচিত্রে এমন কিছু নদী-নালা ও খাল-বিল রয়েছে, যেগুলোর বর্তমানে কোনোই অস্তিত্ব নেই। ১৮৮৬ সালের ১ অক্টোবর অবিভক্ত বাংলায় যে ১৬টি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সঙ্গে যশোরকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ঘোষণা করা হয় সেই ইতিহাসও তিনি তুলে ধরেছেন।
মাটিচাপা ইতিহাস দিনের আলোয়ইতিহাসসমৃদ্ধ সংকলন হাতে নূরুল ইসলাম
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণে যশোর জেলা পরিষদ এক সভায় শোক প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান সাহেব মৌলবী লুৎফর রহমান এই শোক প্রস্তাবের কপি কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পাঠান। পরদিনই কবিপুত্র শোক প্রস্তাব গ্রহণের জন্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি পাঠান। নূরুল ইসলাম ঐতিহাসিক সেই চিঠি খুঁজে পেয়ে সংকলনে প্রকাশ করেছেন।
এক সময় জেলা পরিষদই প্রাইমারি স্কুলের সিলেবাস প্রণয়ন করত। ১৯২৪ সালের সেই সিলেবাসে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণির পাঠ্য ঈষান চন্দ্র ঘোষের ‘নতুন শিশুপাঠ’, কালী প্রসন্ন বিদ্যারত্নের ‘বর্ণ ও বানান বোধ’। হারিয়ে যাওয়া এ ইতিহাস খুঁজে বের করেছেন নূরুল ইসলাম।
এক সময় টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। টিকা না দিলে দুই আনা জরিমানা গুনতে হতো। ১৯২৩ সালে যশোর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড টিকা দেওয়ার জন্য ২২৫টি ডিপো খুলেছিল। চেয়ারম্যান বিজয় কৃষ্ণ মিত্র এ-সংক্রান্ত নোটিশ জারি করেছিলেন। সংকলনের মধ্য দিয়ে সেই নোটিশ তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৩৯ সালে জেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন শার্শার বাবু ভূধর চন্দ্র পাণ্ডে। বর্তমানে তাঁর পৌত্র ভারতের শিলিগুড়িতে থাকেন। নূরুল ইসলাম দীর্ঘ ছয় মাস চেষ্টা করে তাঁর ছবি সংগ্রহ করেছেন। ১৭৭ পৃষ্ঠার সংকলনে ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ছবি সংগ্রহ করে সংকলিত করেছেন। সংকলনটি বাংলাদেশ আর্কাইভসে ঠাঁই পেয়েছে। আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল বারী চৌধুরী গত ৫ মে সংকলনের সম্পাদক নূরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষও নূরুল ইসলামের কাজের প্রশংসা করে আরেকটি চিঠি দিয়েছে।
জানা যায়, নূরুল ইসলাম তাঁর কাজের ফাঁকে রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত ইতিহাস অন্বেষণের কাজ করেছেন। জেলা পরিষদের সব কাগজপত্র ঘেঁটে খাঁটি জহুরির মতো খুঁজে বের করেছেন মূল্যবান সব দলিল। এ জন্য সহকর্মীরা তাঁকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু নূরুল ইসলাম পিছপা হননি। তিনি ইতিহাসের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে গেছেন।

ইতিহাস অন্বেষী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘একজন প্রকৌশলী হলেও ইতিহাসের প্রতি আমার মমত্ববোধ রয়েছে। আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের প্রকৃত ইতিহাস জানার অধিকার রয়েছে। সঠিক ইতিহাস জানলে আমরা সামনে এগোতে পারব। এ জন্য আমি জেলা পরিষদের ২০০ বছরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস খুঁজে বের করেছি। তাতে নতুন প্রজন্মসহ অনেকেই উপকৃত হবে। আর্কাইভস প্রতিষ্ঠা করে এ ইতিহাস সংরক্ষণ করা হলে জাতি উপকৃত হবে।’